
মালিকপক্ষ শর্ত ভঙ্গ করায় মন্ত্রীর নির্দেশে সাফারি পার্কে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে হাতি নিহার কলি ও সম্রাট বাহাদুরকে। চলতি মাসের ১২ আগস্ট গাজীপুর সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দুটি হাতি দুই ব্যক্তির জিম্মায় দেওয়া হয়েছিল। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান বলেন, সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে পাঁচ সদস্যের একটি দল সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এর মধ্যে একটি হাতি মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ভোর ৪টার দিকে সাফারি পার্কে এসে পৌঁছেছে এবং অপর হাতিটি কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছাবে বলে আশা করছি।
এর আগে সোমবার (২৪ আগস্ট) বন বিভাগের কর্মকর্তারা অভিযান পরিচালনা করে হাতি দুটি পুনরায় বন বিভাগের হেফাজতে নেন। মাদি হাতি নিহার কলিকে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বন থেকে এবং পুরুষ হাতি সম্রাট বাহাদুরকে জুড়ী উপজেলার শিলুয়া চা-বাগানসংলগ্ন এলাকা থেকে বন বিভাগের হেফাজতে নেওয়া হয়।
জিম্মা গ্রহণকারীরা নির্ধারিত শর্ত যথাযথভাবে প্রতিপালন না করায় বিষয়টি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর নজরে আসে। পরে তিনি হাতি দুটিকে হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ দেন। নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বন বিভাগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বর্তমানে হাতি দুটি বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে গাজীপুর সাফারি পার্কে নিয়ে আসা হচ্ছে।
জনসংযোগ কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন জানান, গাজীপুর সাফারি পার্কে পৌঁছানোর পর দায়িত্বপ্রাপ্ত ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ডের সদস্যদের মাধ্যমে দুটি হাতির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। পরবর্তীতে হাতির জন্য নির্ধারিত শেডে স্থানান্তর করে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।
সিলেট বন বিভাগের জুড়ীর রেঞ্জ কর্মকর্তা সাদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নির্দেশে সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে উপজেলার লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনের কাছে পুরুষ হাতি সম্রাটকে পাওয়া যায়। সেখানে তাকে দিয়ে গাছ টানার কাজ করানো হচ্ছিল। এ সময় হাতিটির মাথা ও শুঁড়ে একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। সাত-আট কিলোমিটার পথ হেঁটে আসায় হাতিটি ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছিল। পরে হাতিটিকে রেঞ্জ কার্যালয়ে রাখা হয়। নলকূপ থেকে পর্যাপ্ত পানি পান করার পর তাকে কলাগাছ খাওয়ানো হয়। গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানোর জন্য একটি ট্রাক ভাড়া করা হয়েছে।
লাঠিটিলা বিটের কর্মকর্তা সাজন বলেন, তিনি দেখেছেন, হাতিকে দিয়ে কাজ করানোর সময় কথা না শোনায় মাহুতরা লোহার ধারালো বস্তু দিয়ে হাতিটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করতে থাকেন। সম্রাটের শরীরেও এমন আঘাত করা হয়ে থাকতে পারে।
হাতি সম্রাটের দেখভালকারী মাহুত আবদুর রউফ বলেন, জঙ্গলে প্রবেশের সময় লেবুগাছের কাঁটা লেগে শরীরে ক্ষতচিহ্ন হয়েছে।
গত ৬ ও ৭ আগস্ট রাজা বাহাদুরসহ পার্কের হাতিশালায় দুটি হাতির মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ২৪ মে পার্কের হাতিশালায় শিকলে বাঁধা ১০ বছর বয়সী রাজু বাহাদুরের ওপর হামলা করে চার বছর বয়সী হাতি জয়িতা। আক্রমণে রাজু বাহাদুরের একটি পা ভেঙে যায়। হাতিটির চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয় এবং থাইল্যান্ড থেকে বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আনা হয়। পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার চিকিৎসকদের সঙ্গেও পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল। সব চেষ্টা সত্ত্বেও গত ৭ আগস্ট শুক্রবার হাতিটির মৃত্যু হয়। এরপর পার্কে হাতির সংখ্যা কমে দাঁড়ায় আটটিতে।
অপরদিকে, ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৬ আগস্ট গাজীপুর সাফারি পার্কের অপর একটি হাতির মৃত্যু হয়। এরপরই হাতি সম্রাট ও নিহার কলিকে শর্ত সাপেক্ষে তাদের মালিকের জিম্মায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জিম্মা গ্রহণকারীরা নির্ধারিত শর্ত ভঙ্গ করায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর নির্দেশে হাতি দুটিকে বন বিভাগের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বন বিভাগ গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার পোলসার গ্রামে হাতি সম্রাটের পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে মাহুত নজরুল ইসলামের মৃত্যু হয়। কুড়িগ্রামের নজরুল ইসলাম ও পটুয়াখালীর হাসানের বিরুদ্ধে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে হাতি দিয়ে টাকা তোলা এবং নির্যাতনের অভিযোগ ছিল। এ ঘটনার পর বন বিভাগ হাতিটিকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরে পুনর্বাসনের জন্য গাজীপুর সাফারি পার্কে আনা হয়। পরে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি মাসের ১২ আগস্ট বেশ কয়েকটি শর্ত জুড়ে মালিকদের কাছে হাতিটি বুঝিয়ে দেয় বন বিভাগ।
একই বছরের ৩১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ভুলতা এলাকা থেকে হাতি নিহার কলিকে উদ্ধার করা হয়। সেখানে এক ব্যক্তি হাতিটি দিয়ে রাস্তায় মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলতেন। এ ছাড়া হাতিটিকে লালন-পালনকারীদের লোকজন বেঁধে নির্যাতন করতেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল।
আরটিভি/টিআর


