
চট্টগ্রামের অপরাধজগতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত নাম মোবারক হোসেন। তবে নিজের নামের চেয়ে তিনি বেশি পরিচিত ‘গলাকাটা মোবারক’ নামে। পুলিশের দাবি, একাধিক হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত মোবারক কথিত কিলিং স্কোয়াডের শুটার হিসেবেও কাজ করতেন। সম্প্রতি রুদ্ধদ্বার অভিযানের পর তাকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।
মোবারকের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকায়। পুলিশ বলছে, ২০১৫ সালে ফটিকছড়ির আজম খান বাবু হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘গলাকাটা’ বিশেষণ।
২০১৫ সালের ২ জুলাই রাতে নিখোঁজ হন ফটিকছড়ির বাসিন্দা আজম খান বাবু। পরদিন সকালে নাজিরহাট নতুন ব্রিজের পাশে হালদা নদীর পাড় থেকে তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতের গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্নসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম ছিল।
ওই ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে নগরের অক্সিজেন এলাকা থেকে মোবারক, হাসান ও সন্তোষ কুমারসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই মোবারকের নামের সঙ্গে ‘গলাকাটা’ পরিচিতিটি যুক্ত হয়। সময়ের সঙ্গে ফটিকছড়ির অপরাধজগতে তিনি ‘গলাকাটা মোবারক’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন।
জেলা পুলিশের দাবি, মোবারক বড় সাজ্জাদের নির্দেশনায় পরিচালিত কথিত অপরাধচক্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ডেভিড ইমন ও রায়হানের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই চক্রের কথিত কিলিং স্কোয়াডের অন্যতম শুটার হিসেবে তাকে ব্যবহার করা হতো।
গত ২৬ আগস্ট ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর কল্যাণপাড়া এলাকায় এক সহযোগীর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন মোবারক। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালায় জেলা পুলিশ। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘরের ভেতর থেকে গুলি ছোড়া হয় বলে দাবি পুলিশের।
পরে বাড়িটি ঘিরে ফেলা হলে পালানোর সুযোগ নেই বুঝতে পেরে মোবারক আত্মসমর্পণ করেন। এ সময় তাকে সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারের সময় চারজনের কাছ থেকে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি ৯ এমএম বিদেশি পিস্তল, একটি ৭ দশমিক ৬৫ এমএম বিদেশি পিস্তল, একটি বিদেশি রিভলবার এবং একটি দেশীয় তৈরি পিস্তল। পাশাপাশি উদ্ধার করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের গুলি, ম্যাগাজিন ও গুলির খোসা।
জেলা পুলিশের দাবি, উদ্ধার হওয়া ৯ এমএম পিস্তলটি ব্রাজিলের তৈরি। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া সরকারি অস্ত্রগুলোর একটি হতে পারে এটি।
সাম্প্রতিক সময়ে রাউজানের যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার তদন্তে মোবারকের নাম নতুন করে সামনে আসে। প্রকাশ্যে সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজে পাঁচ অস্ত্রধারীকে দেখা যায়। পুলিশের দাবি, তাদের মধ্যে মোবারকও ছিলেন এবং ফুটেজে তার দুই হাতে দুটি পিস্তল দেখা গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, মোবারক নিহত মাসুদুল হককে আগে থেকে চিনতেন না। হত্যাকাণ্ডের আগে রায়হান মোবাইল ফোনে মাসুদুলের ছবি পাঠিয়ে তাকে টার্গেট হিসেবে শনাক্ত করে দেন। এরপর প্রথম গুলি এবং পরে মাথায় গুলি করার ঘটনায় মোবারকের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া ফটিকছড়ির জামাল, সাদ্দাম ও বাবু হত্যা এবং নগরের সরোয়ার বাবলা হত্যা মামলাসহ একাধিক গুরুতর মামলায় মোবারকের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের বাসার সামনে গুলির ঘটনাতেও তার উপস্থিতির কথা জানিয়েছে পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে মোবারক পাহাড়ি ও নির্জন এলাকায় অবস্থান করতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর কল্যাণপাড়ায় এক সহযোগীর বাড়িতে তার অবস্থানের তথ্য পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর ২৭ আগস্ট অস্ত্র ও পুলিশের ওপর হামলার পৃথক দুই মামলায় মোবারকসহ চারজনের আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পুলিশ বলছে, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়ে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
আরটিভি/এসকে




