
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার নদীবেষ্টিত চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের লালচর এলাকায় অসুস্থ হয়ে পাঁচটি মহিষের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও অন্তত ৩১টি মহিষ অসুস্থ অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয় মহিষ মালিকদের অভিযোগ, মাঠে চড়াতে যাওয়া ঘাসে বা খাদ্যে বিষাক্ত পদার্থ মিশিয়ে এই ‘নৃশংসতা’ চালানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর।
জানা গেছে, বাউফল উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চরাঞ্চলে সরকারি খাস জমিতে মহিষ চড়ান স্থানীয় খামারিরা। তারা এখানে কোনো প্রকার অর্থ ছাড়াই মহিষ চড়াতেন। হঠাৎ করে তৈরি হলো নতুন নিয়ম। চরের খাস জমিতে মহিষ চড়াতে গেলে মাসে চাঁদা হিসেবে খামারিদের দিতে হবে মহিষপ্রতি ২০০ টাকা। আর টাকা না দিলে মহিষগুলোকে ঘাস খাওয়াতে দেওয়া হয় না বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, বাধ্য হয়েই মাসে মহিষ প্রতি ২০০ টাকা করে দিতে হচ্ছে। এভাবে ৪৭৮টি মহিষের জন্য দিতে হচ্ছে মাসে ৯৫৬০০টাকা। এতে লোকসানে পড়ছেন খামারিরা। আর নতুন এই চাঁদা প্রথার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় মাইনুদ্দিন নামে এক সাবেক ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে।
এদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত সাবেক ছাত্রদল নেতা মাইনুদ্দিন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, জেলেদের মাছ ধরার চাই ভেঙে ফেলে মহিষগুলো। সেই জরিমানা হিসেবে টাকা নেওয়া হয়েছে; এ বিষয়ে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সালিশ বসেছে বলেও জানান মাইনুদ্দিন। সেখানে টাকাগুলো তার কাছেই জমা রাখা হয় এমনকি নিজের মহিষের জন্যও টাকা দিয়েছেন বলে দাবি তার।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, মাঠে চড়ানো শেষে মহিষগুলোকে বাড়িতে বা গোয়ালঘরে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর খাবার খাওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই কয়েকটি মহিষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে একে একে পাঁচটি মহিষ মারা যায়। আরও অন্তত ৩১টি মহিষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলে জানান তারা।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাবুল মৃধা, সুমন মাঝি, আসাদুল ফকির, নূর মোহাম্মদ, চান্দু মিয়া, বশির ফকির, মিরাজ ফকির, চান্দু খান, কবির, শাহজাহান, রিপন, শাহিন, সুজন ও জাহাঙ্গীরসহ কয়েকজন কৃষকের মহিষ এ ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছে। তাদের মহিষগুলো মাঠ থেকে গোয়ালঘরে ফেরার পর অসুস্থ হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
লালচরে মহিষের বিষক্রিয়ার ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। গত ২২ আগস্ট কেশবপুর ইউনিয়নের মমিনপুরের লালচর এলাকায় বিষক্রিয়ায় দুটি মহিষ মারা যায়। ওই ঘটনায় আরও একটি মহিষ অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং একটি মহিষের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এর কয়েক দিন পর, ২৮ আগস্ট একই এলাকায় ঘাস খেয়ে অন্তত ৩০টি মহিষ অসুস্থ হয়ে পড়ে বলে স্থানীয়রা জানান। ওই ঘটনায় তিনটি মহিষ মারা যায়। পরবর্তী ঘটনায় আরও মহিষ আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটায় বিষয়টি নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ে।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ শুভেন্দু সরকার বলেন, মহিষ অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়ার পর প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। কয়েকটি মহিষ চিকিৎসা দেওয়ার আগেই মারা যায়। অসুস্থ মহিষকে স্যালাইন দেওয়ার সময় তাদের রক্ত কালচে দেখা যায়। পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট এবং মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা পড়ার লক্ষণও ছিল। এসব লক্ষণ দেখে প্রাথমিকভাবে নাইট্রেট বিষক্রিয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আক্রান্ত মহিষগুলো যে ঘাস খেয়েছে, সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। মৃত মহিষের নমুনাও নেওয়া হয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে এসব নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকার কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে মহিষগুলো কী কারণে মারা গেছে।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘাসে অতিরিক্ত পরিমাণে নাইট্রেট জমে গেলেও গবাদিপশু বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। তবে লালচরের বর্তমান ঘটনায় ঘাসে নাইট্রেটের মাত্রা বেশি ছিল কি না, নাকি অন্য কোনো বিষাক্ত পদার্থের কারণে মহিষগুলো অসুস্থ হয়েছে- তা এখনই নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পরীক্ষার ফলাফলের পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
এদিকে বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঘাস বা খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঘটনায় কোনো অসাধু চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
তবে মহিষের খাদ্য বা চারণভূমির ঘাসে কে বা কারা বিষাক্ত পদার্থ প্রয়োগ করেছে- এ বিষয়ে এখনও কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে চাঁদা দাবির অভিযোগের সঙ্গে মহিষের মৃত্যু বা অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও এখনও তদন্ত ও পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আরটিভি/এমএ


