
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নে ধরলা নদীতে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচকে ঘিরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। ফুলবাড়ী ধরলা সেতুর উত্তরে আয়োজিত এ নৌকা বাইচ দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন হাজারো দর্শনার্থী।
স্থানীয়দের উদ্যোগে আয়োজিত বিশাল এ নৌকা বাইচের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় গত ২৬ আগস্ট। সেই দিন থেকে স্থানীয়সহ দূর-দূরান্তের মোট ১২ টি বড় বড় নৌকাসহ বাইচালরা অংশ নেয়। এরপর থেকে খেলার দিন করে নির্ধারিত সময়ে ধরলা নদীতে জমে উঠেছে নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতা।
নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে নদীর পাড় পরিণত হয় মিলনমেলায়। কেউ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে, কেউবা নৌকায় কিংবা আশপাশের উঁচু স্থানে অবস্থান নিয়ে উপভোগ করছেন প্রতিযোগিতা।
বিশেষ করে নৌকা বাইচ শুরু হলে দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো ধরলা পাড়। প্রতিযোগী নৌকাগুলো ঢেউ কেটে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের করতালি, চিৎকার ও উৎসাহে সৃষ্টি হয় আনন্দঘন পরিবেশ।
স্থানীয়রা জানান, নৌকা বাইচ গ্রামবাংলার বহু পুরোনো ঐতিহ্য। একসময় নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হলেও বর্তমানে এমন আয়োজন তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। তাই ধরলা নদীতে এ আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।
আয়োজকরা বলেন, গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং মানুষের মাঝে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়াই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তারা।
নৌকা বাইচকে ঘিরে ধরলার পাড়ে বসেছে ছোট-বড় নানা ধরনের দোকানপাট। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বাড়তি বেচাকেনার সুযোগ পাচ্ছেন। সব মিলিয়ে নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে ফুলবাড়ীর ধরলা পাড়ে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
নৌকা বাইচ দেখতে আসা দর্শনার্থী অসীম কুমার রায়, ববিতা খাতুন ও রুবিন খাতুন জানান, তারা প্রত্যেকেই খেলার দিন করে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূর থেকে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ দেখতে এসেছেন। সড়ক থেকে ধরলা সেতু পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দর্শনার্থীদের ঢল নামে। উপচে পড়া ভিড় ও নানা ভোগান্তি উপেক্ষা করেও তারা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ মনোমুগ্ধকর খেলা উপভোগ করছেন।
নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হানিফ সরকার বলেন, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ খেলাটি সত্যিই আনন্দদায়ক। খেলা দেখতে হাজার হাজার দর্শনার্থীর উপচে পড়া ভিড় দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। নদীর ঢেউয়ের মতো এ খেলা মানুষের মনকে নির্মল আনন্দের স্রোতে ভাসিয়ে নেয়। আমাদের লোকজ সংস্কৃতির এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটি ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আয়োজকদের অনেক ধন্যবাদ জানাই।
নৌকা বাইচ কমিটির উপদেষ্টা ও খেলা পরিচালনাকারী শিমুলবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শরিফুল আলম সোহেল এবং সাবেক ছাত্রনেতা ও উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা সামচুজ্জামান হাসু জানান, নৌকা বাইচ গ্রামবাংলার একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী খেলা। সময়ের পরিক্রমায় খেলাটি অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। নৌকা বাইচ আয়োজনের মাধ্যমে একদিকে যেমন আমাদের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরে আসছে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের কাছেও এই ঐতিহ্যবাহী খেলার পরিচিতি বাড়ছে।
তারা আরও বলেন, নৌকা বাইচসহ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো যদি প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তরুণ ও যুবসমাজকে মাদকসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে। যেহেতু সেমিফাইনাল শেষ, আগামী দুই এক দিনের মধ্যে ভালো দিন দেখে ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত করা হবে। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে প্রতি বছর ধরলা নদীর তীরে নিয়মিত নৌকা বাইচ আয়োজন করা হবে।
আরটিভি/এসএস



