
দেশে বিদ্যুতের সংকট চলছে। সরকার বিদ্যুৎ অপচয় রোধে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা, রাত আটটায় মার্কেট বন্ধসহ সংকট মোকাবিলায় নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে পটুয়াখালীর আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে (বিএফডিসি মার্কেটে) চলছে তার উল্টোটা। খোদ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ম্যানেজার শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি মিটার থেকে অটোভ্যান চার্জ ও সাবমিটার বাণিজ্যের মাধ্যমে মাসে প্রায় লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনেও এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের সরকারি মিটার থেকে অবৈধভাবে লাইন দিয়ে রাত-দিন মিলে প্রতিদিন গড়ে অর্ধশত ব্যাটারিচালিত অটোভ্যান চার্জ দেওয়া হয়। প্রতিটি অটোভ্যান থেকে মাসে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়।
অপরদিকে, মার্কেটে প্রায় অর্ধশতাধিক মাছের আড়ত রয়েছে। প্রতিটি আড়তে একটি করে সাবমিটার রয়েছে। এসব সাবমিটার ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে বাণিজ্যিক হারে বিল নেওয়া হয়।
অথচ বিএফডিসি মার্কেটটি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সর্বনিম্ন হারে বিদ্যুৎ বিল নেওয়া হয়। আর এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম অটোভ্যান চার্জের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে আসছেন গত তিন বছর ধরে—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
বিএফডিসি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্ট মাসে বিএফডিসি মার্কেটে ১৬ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে। অথচ অটোভ্যান ও সাবমিটার থেকে মাসে প্রায় লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। উত্তোলনকৃত এসব টাকার কোনো রশিদ কিংবা হিসাব নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম দাবি করেন, মার্কেটের শুরু থেকেই চার্জ বাণিজ্য চলে আসছে। এ থেকে পাঁচ বছরে প্রায় অর্ধকোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ গভীর রাতে আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে অবস্থিত বিএফডিসি মার্কেটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ৩৫ থেকে ৪০টি অটোভ্যান চার্জ দেওয়া হচ্ছে। ৯ সেপ্টেম্বর বিকেলেও গিয়ে দেখা গেছে, ১৫-২০টি অটোভ্যান চার্জ দেওয়া রয়েছে।
মার্কেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে মাছ আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত ৫০-৬০টি অটোভ্যান দিন-রাত চার্জ দেওয়া হয়। অটোভ্যান চার্জের টাকা রাজস্ব খাতে জমা না দিয়ে ম্যানেজার, হিসাবরক্ষকসহ কর্মকর্তারা ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ তাদের।
অটোভ্যান চার্জ বাণিজ্য, সাবমিটার বাণিজ্য, আড়তগুলোর রাজস্বে শুভঙ্করের ফাঁকি, নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএফডিসি মার্কেটের ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম অটোভ্যান চার্জ দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও এ বিষয়ে লিখিত বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।
তিনি এ সময় দাবি করেন, ব্যবসায়ীদের অনুরোধে অটোভ্যান চার্জ দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। এ টাকা সরকারি খাতে জমা হয় কি না—এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে না পেরে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে মার্কেটের ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে ফোন দিয়ে তার অফিসে জড়ো করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রথমে বিএফডিসি মার্কেটের শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি সালাউদ্দিন, এর কিছুক্ষণ পরে লতাচাপলী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মহিউদ্দিন মুসুল্লী সুলতান, লতাচাপলী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক দলের মহিপুর থানার সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান মিলন, আলীপুর বাজার ব্যবসায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, প্রভাবশালী মৎস্য ব্যবসায়ী আবুল হোসেন কাজীসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী সেখানে আসেন।
এসব ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে বিএফডিসি মার্কেটের অন্যান্য কর্মকর্তারা ট্রলিংয়ের মাছ টানতে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে উসকানি দেওয়া হয়। তাদের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে আগত ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অনেকেই তাতে সাড়া দেননি।
এ সময় বিএনপির সভাপতি সাংবাদিকদের বলেন, ম্যানেজার অটোভ্যান চার্জ দিয়ে সরকারি বিল পরিশোধ করে, যা থাকে তাতে ওনার পকেট খরচ চলে। তাতে আপনাদের কী?
এ সময় তিনি আরও বলেন, তার কাছে জিজ্ঞেস করে এখানে রিপোর্ট করতে আসতে হবে—এমন কথা বলে সাংবাদিকদের ওপর প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। এ সময় কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি মিজানুর রহমানও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম তার নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ধামাচাপা দিতে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে ভোরের কাগজের কুয়াকাটা প্রতিনিধি, কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন আনু এবং তার সহযোগী তৃতীয় মাত্রার কুয়াকাটা প্রতিনিধি রুমী শরীফকে মব সৃষ্টি করে হেনস্তার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন—এমন অভিযোগ করা হয়েছে।
বিএফডিসি মার্কেটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, মার্কেটে প্রায় অর্ধশত আড়ত রয়েছে। এসব আড়তে গভীর সমুদ্র থেকে মাছ শিকার করে নিয়ে এসে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়। গভীর সমুদ্রের কোনো কোনো ট্রলারে দেড়শ থেকে দুইশ মণ ইলিশ নিয়ে এসে আড়তে ৩০-৪০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে। এসব মাছ থেকে আসা সরকারি রাজস্বের হিসাবেও ব্যাপক গরমিল রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দেড়শ মণ ইলিশ বিক্রির বড় অঙ্কের মাছের রাজস্বের হিসাব নেই। আড়তদারদের সঙ্গে আঁতাত করে নামমাত্র রাজস্ব দেখিয়ে আসা হচ্ছে। বড় অংশই চলে যায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটে—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়রা জানান, আলীপুর বিএফডিসি মার্কেট ও মহিপুর মাছের আড়ত থেকে গত পাঁচ বছরে লাখ লাখ টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) মার্কেট তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে প্রতি বছর সরকারকে ব্যাপক টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিএফডিসি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে অবৈধভাবে ব্যাটারিচালিত অটোভ্যান চার্জ, সাবমিটার বাণিজ্য এবং মাছ বেচাকেনায় রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সরকারি সাইনবোর্ড ব্যবহার করে লাখ লাখ টাকা নানা উপায়ে লোপাট করে আসছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বন্ধ না হলে এই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি কখনো লাভের মুখ দেখবে না।
এ বিষয়ে কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম সম্রাট খান সাংবাদিকদের জানান, বিএফডিসি মার্কেটে অবৈধভাবে অটোভ্যান চার্জের বিষয়ে তিনি অবগত নন। এমনটা হয়ে থাকলে লাইন কেটে দেওয়া হবে।
আরটিভি/টিআর


