
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের কাছে পদ্মা নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচেছে মাত্র ২০ দিনের শিশু তানিশা। নৌকা ডুবে যাওয়ার পর প্রবল স্রোতে মায়ের হাত থেকে ছুটে পানিতে তলিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত আবার মায়ের কোলে ফিরেছে শিশুটি। প্রায় এক ঘণ্টা ২০ মিনিট পদ্মার স্রোতে ভেসে থাকার পর তানিশাসহ ১০ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেল পাঁচটার দিকে আলীমনগর ঘাট থেকে ১২ জন যাত্রী নিয়ে জহুরপুরটেক গ্রামের দিকে যাওয়ার পথে পদ্মা নদীতে নৌকাটি ডুবে যায়। এ ঘটনায় মো. ওয়াসিম (২৩) সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও মো. মোস্তফা (৬০) এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। বাকি ১০ জনকে ভারতীয় জলসীমা থেকে জীবিত উদ্ধার করে বিএসএফ।
তানিশা সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের জহুরপুর বেলপাড়া এলাকার মো. সোহেল ও তানিয়া খাতুন দম্পতির মেয়ে।
স্থানীয় সূত্র ও উদ্ধারকাজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নৌকাটি ডুবে যাওয়ার পর মুহূর্তেই যাত্রীরা পানিতে পড়ে যান। প্রবল স্রোত ও বাতাসের মধ্যে যে যার মতো করে ভেসে থাকার চেষ্টা করেন। কেউ নৌকার কাঠের পাটাতন, কেউ বস্তা, কেউ বৈঠা কিংবা ভাসমান জিনিস আঁকড়ে ধরে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন।
শিশু তানিশাকে শুরু থেকেই শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন তার মা তানিয়া খাতুন। কিন্তু স্রোতের তীব্রতায় একপর্যায়ে মায়ের হাত থেকে ছুটে যায় শিশুটি। পানিতে তলিয়ে গেলেও কিছুক্ষণ পর তানিয়া আবার তাকে খুঁজে পান। এরপর দুই পা দিয়ে শিশুটিকে আঁকড়ে ধরে পানির ওপর তুলে রাখেন তিনি।
নাতনিকে বাঁচাতে তানিশার নানা মো. ইব্রাহিমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সাঁতার জানা ইব্রাহিম এক হাত উঁচু করে তানিশাকে ধরে স্রোতের মধ্যে ভেসে থাকার চেষ্টা করেন। এ সময় অন্যরা নৌকার পাটাতন, বস্তা, বৈঠা ও অন্যান্য ভাসমান জিনিসের সাহায্যে নিজেদের টিকিয়ে রাখেন।
এভাবে প্রায় এক ঘণ্টা ২০ মিনিট স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাওয়ার পর তারা ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি চলে যান। পরে তাদের দেখতে পেয়ে বিএসএফের ৭১ ব্যাটালিয়নের খান্দুয়া ক্যাম্পের সদস্যরা স্পিডবোট নিয়ে উদ্ধার অভিযানে নামে।
বিএসএফ সদস্যরা তানিশাসহ ১০ জনকে উদ্ধার করে নদীর তীরে নিয়ে যান। সে সময় শিশুটির অবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে তানিশা প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। পরে বিএসএফ সদস্যরা তাকে স্থানীয় একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা শিশুটিকে সুস্থ বলে জানান।
উদ্ধারকাজে থাকা ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে বাখের আলী বিজিবি ক্যাম্পের সুবেদার শরিফুল ইসলাম বলেন, নৌকা ডোবার পর তানিশাকে তার মা শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। প্রবল স্রোতের মধ্যে তারা ভাসমান কাঠ, বৈঠা ও নৌকার বিভিন্ন অংশ ধরে থাকার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে শিশুটি মায়ের হাত থেকে ছুটে পানিতে তলিয়ে যায়। পরে তার মা আবার তাকে খুঁজে পান এবং শক্ত করে ধরে রাখেন।
ফরিদপুর বিওপির কোম্পানি কমান্ডার শহিদুল ইসলাম বলেন, তানিশার নানা সাঁতার জানতেন। তিনি শিশুটিকে এক হাত উঁচু করে ধরে স্রোতের মধ্যে ভেসে থাকার চেষ্টা করেন। অন্যরাও নৌকার পাটাতন, বস্তা ও বৈঠার মতো ভাসমান জিনিস ধরে ছিলেন।
নারায়ণপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রবিউল ইসলাম রবু বলেন, প্রবল স্রোতের মধ্যে তানিশাকে বাঁচিয়ে রাখাই ছিল পরিবারের সদস্যদের সবচেয়ে বড় চেষ্টা। শিশুটি একবার পানিতে তলিয়ে গেলেও তার মা তাকে উদ্ধার করে আবার বুকের কাছে তুলে নেন। পরে নানা এক হাত উঁচু করে শিশুটিকে ধরে রাখেন। এভাবেই তারা দীর্ঘ সময় পানিতে ভেসে ছিলেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৩ বিজিবি) সূত্রে জানা গেছে, নৌকাডুবির পর মো. ওয়াসিম সাঁতরে তীরে উঠে আসেন। অপর ১১ জন নিখোঁজ হন। পরে বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে বিএসএফের ৭১ ব্যাটালিয়নের খান্দুয়া ক্যাম্পের সদস্যরা ১০ বাংলাদেশিকে জীবিত উদ্ধার করেন। তাদের মধ্যে চারজন পুরুষ, তিনজন নারী ও তিনজন শিশু ছিলেন।
উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের দেশে ফেরাতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে যোগাযোগের পর রাতে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে ফরিদপুর বিওপি ও খান্দুয়া বিএসএফ ক্যাম্পের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে বিএসএফের উদ্ধার করা ১০ জনকে বাংলাদেশে ফেরত দেওয়া হয়। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে তাদের স্বজন মো. ইসমাইল হোসেনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বাংলাদেশে ফেরত আসা ব্যক্তিরা হলেন মো. রাসেল (২৬), মো. ইব্রাহিম (৫০), মো. সওদাগর (৪০), মো. ইব্রাহিম (৬০), সখিনা (৪৫), নিলুফা (৩৫), তানিয়া (২২), তার ২০ দিনের শিশু তানিশা, সানাউল্লাহ (৯) ও আল আমিন (৯)। তাদের সবার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের জহুরপুর বকরীপাড়া এলাকায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৩ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, পদ্মা নদীতে নৌকাডুবির পর বিএসএফের খান্দুয়া ক্যাম্পের সদস্যরা স্পিডবোট নিয়ে ১০ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করেন। পরে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশে ফেরত আনা হয়। উদ্ধার হওয়া সবাই বর্তমানে সুস্থ রয়েছেন।
নিখোঁজ মো. মোস্তফা (৬০) একই এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম মৃত আলতাব হোসেন। তাকে উদ্ধারে স্থানীয় লোকজন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
উত্তাল পদ্মার স্রোতে নৌকাডুবির পর ২০ দিনের তানিশার জীবিত ফিরে আসাকে বিরল সৌভাগ্য হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। মৃত্যুভয়, প্রবল স্রোত আর দীর্ঘ সময় পানিতে ভেসে থাকার পর মায়ের বুক ও নানার শক্ত হাতের আশ্রয়ে শেষ পর্যন্ত নিরাপদে ঘরে ফিরেছে নবজাতক এই শিশুটি।
আরটিভি/এমএম


