
শরীরজুড়ে গভীর ক্ষত। মাথায় একাধিক সেলাই। পিঠ ও দুই পায়েও আঘাতের চিহ্ন। কোথাও শুকিয়ে আসা রক্তের দাগ। দুর্বল শরীর নিয়ে ঠিকমতো উঠে বসার শক্তিটুকুও নেই ১১ বছরের এক শিশুর।
কখনো চোখ মেলে চারপাশে তাকাচ্ছে, আবার যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করে ফেলছে সে। ঢাকার একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ উঠেছে শিশুটির বিরুদ্ধে। বর্তমানে খাগড়াছড়ির আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে সে।
শিশুটির অভিযোগ, শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে তাকে। সামান্য ভুল হলেই মারধর করা হতো। ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হতো না। দিনের বেশির ভাগ সময় তাকে টয়লেটে আটকে রাখা হতো। এভাবে এক বছরের বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতিদিনই নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ শিশুটির।
শিশুটির বাড়ি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলায়। তার বাবা দিনমজুর। মা মারা গেছেন। অভাবের সংসারে কিছুটা স্বস্তি আনতে প্রায় দেড় বছর আগে মেয়েকে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠান বাবা। সে সময় শিশুটি মাদ্রাসার চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
শিশুটির বাবা জানান, মেয়েকে কোথায় নেওয়া হচ্ছে বা কার বাসায় রাখা হবে সেই ঠিকানাও তিনি জানতেন না। প্রতিবেশী তোফাজ্জল হোসেনের মাধ্যমে মেয়েকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। ওই ব্যক্তি তাকে বলেছিলেন, মেয়েটি ভালো থাকবে এবং কাজের ফাকে পড়াশোনার সুযোগও পাবে।
শিশুটির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তাকে ফেনী শহরের ট্রাংক রোড বড় মসজিদ-সংলগ্ন একটি বাসায় এক নারীর কাছে রাখা হয়। পরে ওই নারী তাকে ঢাকায় তার বোনের বাসায় পাঠান। ঢাকার মিরপুরের কাফরুল থানার পূর্ব শেওড়াপাড়ার ওই বাসায় যাওয়ার পর থেকেই নির্যাতন শুরু হয় বলে অভিযোগ শিশুটির।
শিশুটি জানায়, বাসার গৃহকর্তা রাসেল ও গৃহকর্ত্রী মোর্শেদা আক্তার ওরফে ছোটনের বাসায় তাকে রাখা হয়েছিল। গৃহকর্ত্রী ও তার মেয়ে রাফাতুল তাকে মারধর করত বলেও অভিযোগ করেছে সে। মারধরের পাশাপাশি গরম খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়া এবং দীর্ঘ সময় টয়লেটে আটকে রাখার অভিযোগও করেছে শিশুটি।
শিশুটির বাবা বলেন, মেয়েকে ঢাকায় পাঠানোর পর দীর্ঘ সময় তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি। মেয়ের ওপর নির্যাতন চলছে এ বিষয়েও তিনি কিছু জানতেন না। কয়েক দিন আগে মেয়ের মাথা ও থুতনিতে গুরুতর আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ। পরে তাকে ঢাকা থেকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।
খবর পেয়ে গত শুক্রবার ফেনীতে যান শিশুটির বাবা। পরে শুক্রবার দিবাগত রাত প্রায় তিনটার দিকে মেয়েকে নিয়ে খাগড়াছড়ির আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছান তিনি। হাসপাতালে শয্যা না পাওয়ায় মেঝেতেই শিশুটির চিকিৎসা চলছে।
খাগড়াছড়ির আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা (আরএমও) রিপল বাপ্পী চাকমা বলেন, শিশুটির শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। দীর্ঘদিন অভুক্ত থাকা ও নির্যাতনের কারণে তার শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। হাসপাতালের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
শিশুটিকে নির্যাতনের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানান অনেকে।
এরই মধ্যে শিশুটিকে নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত দম্পতি মোর্শেদা আক্তার (৩৮) ও তার স্বামী সাইফুদ্দিন রাসেলকে (৪৮) আটক করেছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকার কলাবাগানের গ্রিনরোড এলাকার একটি বাসায় আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।
কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ওসি জানান, শিশুটির বাবা বাদী হয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মামলা হলে অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরটিভি/এসকে



