
নওগাঁর মান্দায় সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রায় কোটি টাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পাকা সড়ক নির্মাণকাজে নিম্নমানের ইট ব্যবহারের গুরুতর অনিয়ম নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট মহল।
জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টাল আরটিভি অনলাইনে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর টনক নড়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের। সংবাদ প্রকাশের সুদূরপ্রসারী প্রভাবে ত্বরিত গতিতে নির্মাণাধীন ওই সড়ক থেকে নিম্নমানের ইটগুলো অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সকাল থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োজিত শ্রমিকদের অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে সড়ক প্রান্তর থেকে এসব নিম্নমানের ইট সরিয়ে নিতে দেখা যায়। এর আগে ২ অক্টোবর শুক্রবার ‘নিম্নমানের ইটে কোটি টাকার সড়ক নির্মাণ, সরানোর আশ্বাস ঠিকাদারের’ এই শিরোনামে আরটিভি অনলাইনের পোর্টালে একটি তথ্যবহুল প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জোরালো নজরদারি বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তীতে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মান্দা উপজেলার মান্দা ইউনিয়নের কোচড়া বাদলঘাটা হিন্দুপাড়া পাকা রাস্তা থেকে দক্ষিণ কোচড়া বাদলঘাটা পর্যন্ত ১ হাজার ৭৩০ মিটার দীর্ঘ একটি পাকা সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্থানীয় জনগণের যাতায়াত সহজ করার লক্ষ্যে এলজিইডির অধীনে বাস্তবায়িত এই সড়ক নির্মাণকাজে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। জনগুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটির নির্মাণকাজের ঠিকাদারি দায়িত্বে রয়েছে বরেন্দ্র কনস্ট্রাকশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
এদিকে, সংবাদ প্রকাশের পর সরেজমিনে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে ফেলে রাখা নিম্নমানের ইটগুলো শ্রমিকরা দ্রুত সরিয়ে নিচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সড়ক নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্যই এই ইটগুলো সাইটে নামানো হয়েছিল। তবে কাজের শুরু থেকেই ইটের মান নিয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষ তীব্র আপত্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, এ ধরনের নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে রাস্তা তৈরি হলে তা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাবে।
স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল, সরকারি প্রাক্কলন বা সিডিউল অনুযায়ী রাস্তা নির্মাণে এক নম্বর ইটের খোয়া ও মানসম্মত বালু ব্যবহারের কথা থাকলেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। এক নম্বর পাকা ইটের পরিবর্তে সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছিল নিম্নমানের এবং পোড়ামাটির মানহীন ইট।
এ ছাড়া সাব-বেস ও বেস টাইপের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রেও বালু ও খোয়ার সঠিক অনুপাত বজায় রাখা হচ্ছিল না, যা সড়কের স্থায়িত্বকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দেওয়ার উপক্রম করেছিল।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও বাসিন্দারা আরও জানান, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসন ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের টনক নড়ায় এবং নিম্নমানের ইটগুলো সরিয়ে নেওয়ায় তারা কিছুটা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
তবে তাদের মতে, কেবল ইট সরিয়ে নেওয়াটাই যথেষ্ট নয়; সড়কের পুরো নির্মাণকাজ সিডিউল ও নিয়ম মেনে সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কিনা, তা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্তৃপক্ষের সরেজমিনে কড়া নজরদারিতে যাচাই করা প্রয়োজন। সরকারি এত বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে নির্মিত এই সড়কের স্থায়ী ও টেকসই সুফল নিশ্চিত করতে মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের বিকল্প নেই বলে জোর দাবি জানান তারা।
অন্যদিকে, সড়ক নির্মাণকাজে নিম্নমানের ইট ব্যবহারের এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে সাফাই গেয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মোছা. পারুল দাবি করেন, এই সড়কটির কাজ করতে গিয়ে তিনি ইতোমধ্যে প্রায় ২৪ লাখ টাকার আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, বিতর্কিত ইটগুলো সাময়িকভাবে নির্মাণস্থলে আনা হয়েছিল এবং গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারের পর সেগুলো দ্রুত সরিয়ে ফেলা হবে। তার দেওয়া ওই আশ্বাসের বাস্তবায়ন হিসেবেই মূলত বুধবার সকাল থেকে সড়ক থেকে নিম্নমানের ওই ইটগুলো অপসারণের কাজ শুরু করা হয়।
এ বিষয়ে বুধবার বিকেলে মান্দা উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) আব্দুল কাদেরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আরটিভি অনলাইনকে জানান, নির্মাণাধীন সড়ক থেকে নিম্নমানের ইটগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সড়কটির পরবর্তী সব ধাপে সিডিউল অনুযায়ী মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের বিষয়টি কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হবে। এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না এবং কাজের মান রক্ষায় নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
উপজেলার সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, শুধু এই সড়কের ইট অপসারণই নয়, বরং মান্দা উপজেলার প্রতিটি উন্নয়নমূলক কাজে যেন পূর্ণ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মান বজায় রাখা হয়।
আরটিভি/এসএস


