
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন খাতে সরকারি বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করে আত্মসাৎ, ভুয়া ভাউচার তৈরি, শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় এবং বিভিন্নভাবে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে সংসদ সদস্যের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন উপজেলার একদল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
অভিযোগপত্রে ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়নের কাছে চরফ্যাশন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আন্তঃইউনিয়ন ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৫-২৬ এবং আন্তঃইউনিয়ন প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার জন্য ১ লাখ ৫৫ হাজার ও ৮৪ হাজার টাকা ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রদান না করে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন ও আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এ ছাড়া, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভোটকেন্দ্র হিসেবে বরাদ্দ পাওয়া ৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের হয়রানি করে বিদ্যালয়প্রতি প্রায় ৯ হাজার টাকা করে গ্রহণ এবং নির্বাচনের প্রায় চার মাস পর ওই অর্থ উত্তোলনের ঘটনাও ঘটেছে।
প্রতিবন্ধী শিশুদের ডিভাইস ক্রয়ের জন্য বরাদ্দকৃত ৯০ হাজার টাকা ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগপত্রে ‘এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি’ খাতের বরাদ্দ নিয়েও বিস্তারিত অভিযোগ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়প্রতি ৩ লাখ টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে একটিতে ২ লাখ এবং আটটিতে ৩ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। এ ছাড়া, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পুনরায় ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলে বাস্তবে কোনো কাজ না করে ভাগ-বাঁটোয়ারার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, একই অর্থবছরে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে একাধিকবার ‘এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি’সহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এমনকি একই ব্যক্তির মাধ্যমে একাধিকবার বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া, প্রাক-প্রাথমিক খাতে বিদ্যালয়প্রতি বরাদ্দ করা ৭ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
কোনো কোনো বিদ্যালয়ে ওয়াই-ফাই না থাকা এবং নেট চালু না করার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কাছ থেকে যথাযথ প্রত্যয়ন গ্রহণ না করে কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে ১৮ লাখ ১৫ হাজার ২০০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, বিদ্যালয়ের কনটিনজেন্সি বই, পরিবহন, টিএ এবং বিভিন্ন দিবস পালনসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ করা অর্থ শিক্ষকদের ব্যক্তিগত/সংশ্লিষ্ট হিসাবে নিয়ে যথাযথভাবে টাকা প্রদান করা হয়নি। বাকি অর্থ নিজে চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করেন।
এ ছাড়া, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৯৬ জন শিক্ষককে চিত্তবিনোদন ভাতা প্রদান না করে কালক্ষেপণ এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, চরফ্যাশন উপজেলার মুজিবনগর ইউনিয়নের তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আকস্মিক পরিদর্শন করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রায় দুই মাস বন্ধ রাখেন এবং শিক্ষকপ্রতি ৫ হাজার টাকা করে নেওয়ার পর বিল ছাড় করেন।
এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ৭-৮ জন শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে প্রশিক্ষণ, সরকারি বরাদ্দ বণ্টন ও সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছামতো বণ্টন করেন। এবং বণ্টনের সময়ে শিক্ষকদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করেন।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব অনিয়ম ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর কারণে উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এতে বিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ও শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা। অভিযোগপত্রের অনুলিপি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়, জেলা প্রশাসক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানোর কথা উল্লেখ রয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, তারা যেসব অভিযোগ করেছে, আমার সবগুলোর অফিস ডকুমেন্টস আছে। যথাযথ নিয়মে খরচ হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, আমার কাছে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আসেনি। যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, তারা তদন্ত করে দেখবে। আমার কাছে এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরটিভি/টিআর


