
ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুনাল গাইবান্ধায় প্রায় আড়ইমাস ধরে স্থায়ী বিচারক নেই। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো বিচারপ্রার্থী। চলতি বছরের ৭ জুলাই এই আদালতের বিচারক মোঃ তোফাজ্জল হোসেন যুগ্ন জেলা জজ হিসেবে কুড়িগ্রাম জেলায় বদলি হওয়ার পর থেকেই এ সংকটের সৃষ্টি।
বর্তমানে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুনালে ভূমির রেকর্ড সংশোধন সংক্রান্ত প্রায় ৯ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন আদালত সংশ্লিষ্ট ও আইনজীবীরা। বিচারক সংকটে এসব মামলার অধিকাংশের কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। নির্ধারিত তারিখে আদালতে এসে অনেক বাদী-বিবাদীকে শুধু হাজিরা ও প্রয়োজনীয় পিটিশন দিয়ে পরবর্তী তারিখ নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। এতে মামলার দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি বাড়ছে সময়, অর্থ ও মানসিক ভোগান্তি।
আদালত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বর্তমানে বিচারকের পদ শূন্য থাকলেও স্থায়ীভাবে বিচারক নিয়োগে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। অতিরিক্ত দায়িত্বে বিচারক থাকলেও নিজ আদালতের কাজের চাপ থাকায় ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুনালের মামলাগুলোর নিয়মিত শুনানি ও নিষ্পত্তি ব্যাহত হচ্ছে।
আদালত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনের কার্যতালিকায় 75 থেকে ৮০টি পর্যন্ত মামলার শুনানি নির্ধারিত থাকে। এসব মামলার মধ্যে সমন, সাক্ষ্য গ্রহণ, যুক্তিতর্ক, রায় প্রকাশ, দরখাস্ত শুনানি, বিবাদি পক্ষের জবাব ও তদবির রয়েছে। কিন্তু স্থায়ী বিচারক না থাকায় অনেক মামলায় কার্যকর শুনানি না হয়ে হাজিরা, পিটিশন গ্রহণ ও পরবর্তী তারিখ নির্ধারণের মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকছে। ফলে সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে থাকা মামলা সেখানেই পড়ে থাকছে, যুক্তিতর্কের মামলাতেও শুনানি এগোচ্ছে না।
মামলার অগ্রগতি হচ্ছে না
আদালতে আসা বিচারপ্রত্যাশী গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার তালুককানুপুর ইউনিয়নের বেড়ামালঞ্চ গ্রামের মতিয়ার রহমান প্রায় চার বছর আগে ভুমির রেকর্ড সংশোধনের জন্য এ আদালতে মামলা করেন(মামলা নম্বর-৬৪৫/২২)। তিনি বলেন,‘মামলা শুরুর দিকে বিচারক থাকায় কার্যক্রম এগিয়েছিল। ১৫ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন ধার্য় ছিলো।
মতিয়ার রহমান বলেন, ‘মামলা নিয়ে আদালতে আসছি, হাজিরা দিছি, আবার পরবর্তী তারিখ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবার আসতে যাতায়াত ও আইনজীবীর পেছনে টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু মামলার কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।’
রেকর্ড সংশোধনের মামলার বিবাদী আরেক ভুক্তভোগী জহুরুল ইসলাম জানান, সাক্ষীর তারিখ ৪টি চলে গেল। আজ (১৫/০৯/২০২৬) সাক্ষী নিয়ে আসলাম। কিন্তুবিচারক না থাকায় সাক্ষী হলো না।
তিনি বলেন, মামলার তারিখে আদালতে আসি। কিন্তু বিচারক না থাকায় শুধু হাজিরা দিয়ে বাড়ি ফিরে যাই। নতুন বিচারক বসছেন না। দ্রুত বিচারক নিয়োগ করা হলে আমাদের মতো বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি অনেকটা কমবে।’
ভুমি রেকর্ড সংশোধন সংক্রান্ত একটি মামলার(১২১/২১) বাদীপক্ষের ভুক্তভোগী আনিছুর রহমান। তার অভিযোগ, বাদিকে জেরার জন্য আজ (১৫/০৯/২০২৬) সহ চারটি ধার্য় তারিখ দিনান্তর করা হয়। কিন্তু বিচারক না থাকায় বাদিকে জেরার কার্যক্রম এগোয়নি। একটি মামলার পেছনে পাঁচ বছর আদালতে ঘুরতে হচ্ছে।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দরবস্ত ইউনিয়নের বিষুবাড়ী গ্রামের লুৎফর রহমান ভুমির রেকর্ড সংশোধনের জন্য মামলা করেন(২২/২৩)। আজ (১৫/০৯/২০২৬) একতরফা শুনানীর দিন ধার্য় ছিলো। কিন্তু বিচারক না থাকায় তারিখ দিনান্তর করা হয়।
আদালত সংশ্লিষ্টরা জানান, গাইবান্ধা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুনালে জেলার সাঘাটা, ফুলছড়ি সদর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র, তিন্তা ও যমুনা বেষ্টিত চরাঞ্চলের ভুমি রেকর্ড সংক্রান্ত মামলা সবচেয়ে বেশি। এসব মামলা নিস্পত্তিতে নিয়মিত/স্থায়ী বিচারক ছাড়া ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিয়ে শুধুমাত্র মামলা গ্রহন ও দিনান্তর ছাড়া কোন কাজ করা সম্ভব হয় না।
বিচারক সংকটে আইনজীবীরাও বিব্রত
গাইবান্ধা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুনালে বিচারক সংকটে শুধু বিচারপ্রার্থী নন, আইনজীবীরাও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আদালতের জিপি রফিকুল ইসলাম বুলু বলেন, ভুমি রেকর্ড সংশোধন মামলার মধ্যে সমন, সাক্ষ্য গ্রহণ, যুক্তিতর্ক, দরখাস্ত শুনানি, বিবাদি পক্ষের জবাব, তদবির ও রায় প্রকাশ সংক্রান্ত বিষয় গুলোর জন্য বাদি-বিবাদিরা আদালতে আসছেন। কিন্ত আড়াইমাস ধরে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুনালে বিচারক না থাকায় বিচার প্রার্থীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। আদালতে নিয়মিত বিচারক না থাকায় সাক্ষ্য গ্রহণ, যুক্তিতর্ক ও রায় ঘোষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।’
আদালতের জিপি রফিকুল ইসলাম বুলু বলেন, নতুন বিচারক নিয়োগ করা হলে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি অনেকটা কমবে।’
আরটিভি/ এসকেডি


