
মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল ১৩ বছরের অপ্রতিম। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে। নিখোঁজের একদিন পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণে লালমাই পাহাড়ের গভীরে মিলেছে তার মরদেহ। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত তুহিন, ফাহিম ও আনাস নামে তিনজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ১২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন তারা।
অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার দম্পতির একমাত্র ছেলে। সে কোটবাড়ি বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে কুমিল্লার কোটবাড়ির বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। এরপর আর বাসায় ফেরেনি সে। দীর্ঘ সময় পার হলেও তার কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। ছেলেকে খুঁজে পেতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবার সহযোগিতা চান তার মা ড. নাহিদা বেগম।
রাত পেরিয়ে দিন হলেও সন্ধান মেলেনি অপ্রতিমের। পরে শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণে লালমাই পাহাড়ের গভীরে তার মরদেহ দেখতে পান জিলানি নামে এক কৃষক। তিনি জানান, মরদেহটি নিয়ে শিয়াল টানাটানি করছিল।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ডিবি ও সিআইডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঘটনাস্থল থেকে অপ্রতিমের মানিব্যাগ পাওয়া গেলেও তার সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটি পাওয়া যায়নি। আইফোনটির সন্ধানসহ অপ্রতিমের মৃত্যুর কারণ ও পুরো ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এ ঘটনায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তুহিন নামে একজনকে আটক করা হয়। পরে ফাহিম ও আনাস নামের আরও দুজনকে আটক করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত তিনজন তুহিন, ফাহিম ও আনাস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে বা কী কারণে তাদের আটক করা হয়েছে, তদন্তের স্বার্থে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি পুলিশ।
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তাল হয়ে ওঠে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিল থেকে অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানানো হয়।
শিক্ষার্থীরা বলেন, অপ্রতিম কেবল একজন শিক্ষকের সন্তান নয়, সে এই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারেরও একজন। তার এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এ সময় তারা জড়িতদের গ্রেপ্তারে ১২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন তারা।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম ঘটনাস্থলে গিয়ে অপ্রতিমের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, অপ্রতিমকে খুঁজে বের করতে গতকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবাই চেষ্টা করেছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।’
এদিকে অপ্রতিমের মৃত্যুর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে তিন মাসের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার নিজ এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রিয় শিক্ষকের একমাত্র সন্তানের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তার ও ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
আরটিভি/ এসকেডি




