
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা ইউনিয়নে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো একটি কুঠিবাড়ি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয়ভাবে এটি ক্যাসপার সাহেবের কুঠিবাড়ি নামে পরিচিত। প্রায় সোয়া ৯ একর জায়গাজুড়ে থাকা এই স্থাপনার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা, খাজনা আদায়, বিচারকার্য ও সোয়া হাতের জুতা দিয়ে শাস্তির ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। তবে সংরক্ষণের অভাবে এর বিভিন্ন স্থাপনা ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আঠারো শতকের গোড়ার দিকে ইংরেজ জমিদার এডওয়ার্ড প্যারি ক্যাসপার এখানে কুঠিবাড়ি নির্মাণ করেন। কথিত আছে, সাপলেজায় আসার পর স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তি ফরাজউল্লাহ তাকে জমি উপহার দেন। পরে সেখানে ক্যাসপারের জমিদারি সম্প্রসারিত হয়।
একসময় পৌষ মাসের শেষভাগে কুঠিবাড়িতে পুণ্যাহ উৎসব হতো। এ সময় খাজনা আদায়ের পাশাপাশি জাদু প্রদর্শনী, লোকগান, যাত্রা ও নিমাই সন্ন্যাস পালার আয়োজন করা হতো। এসব দেখতে আশপাশের এলাকা থেকে অনেক মানুষ আসতেন। খাজনা বকেয়া রাখা বা অন্য অপরাধের জন্য প্রজাদের শাস্তি দেওয়ার কথাও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। কথিত আছে, সোয়া হাত মাপের একজোড়া জুতা দিয়ে অপরাধী প্রজাদের পেটানো হতো।
কুঠিবাড়ির মূল ভবনটি ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত। চৌকোণাকৃতির ১৮টি খিলানের ওপর নির্মিত ভবনটি দোতলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর সঙ্গে ছিল আরও কয়েকটি স্থাপনা ও বড় একটি পুকুর। স্থানীয়দের দাবি, ভবনের ওপরের তলায় ক্যাসপারের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী ও তৈজসপত্র রাখা হতো।
কুঠিবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিলারগঞ্জ নামটিও। স্থানীয়দের ভাষ্য, ব্রিটিশ আমলের জমিদার শিলার সাহেবের নাম থেকে এলাকার নাম হয়েছিল শিলারগঞ্জ। তার ছেলে এডওয়ার্ড প্যারি ক্যাসপার এখানে কুঠিবাড়ি নির্মাণ করেন। পরে এলাকার নাম সাপলেজা হলেও ডাকঘরের নাম পরিবর্তন হয়নি। এখনো শিলারগঞ্জ পোস্ট অফিস নামটি চালু আছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নায়েব, পাইক-পেয়াদাদের থাকার জন্য আলাদা ভবন ছিল। একটি দ্বিতল ভবনের নিচতলায় অফিসে বসে খাজনা আদায় ও বিচারকার্য পরিচালনা করা হতো। ক্যাসপারের একটি বড় বোট ছিল বলেও তারা জানান। শীত মৌসুমে তৎকালীন চন্দ্রদ্বীপ, বর্তমান বরিশাল, থেকে তিনি ওই বোটে করে কুঠিবাড়িতে আসতেন।
শীতকালে থাকার কারণে ভবনটি উষ্ণ রাখার বিশেষ ব্যবস্থা ছিল বলেও স্থানীয়দের দাবি। তাদের ভাষ্য, মূল ভবনের নিচের চার কোণে কয়লার আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা ছিল। তবে কুঠিবাড়ির ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত লিখিত তথ্য পাওয়া যায় না। ফলে ক্যাসপারের ব্যক্তিজীবন, জমিদারি ও ভবন নির্মাণের নানা বিষয় এখনো অনেকটাই অজানা। স্থানীয়দের কাছে থাকা ক্যাসপারের ব্যবহৃত দুটি তরবারিসহ কিছু পুরোনো তৈজসপত্রও এখন আর পাওয়া যায় না।
বর্তমানে কুঠিবাড়ির তিনটি ভবনই সংস্কারের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শানবাঁধানো ঘাটসহ পুকুরটিরও আগের জৌলুশ নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি মালিকানায় গেলেও স্থাপনাটি সংরক্ষণে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
মঠবাড়িয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, অল্প কিছু বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিল। তা দিয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বরাদ্দ পাওয়া গেলে আরও ভালোভাবে সংস্কার করা হবে, যাতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসতে পারেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কুঠিবাড়িটি মঠবাড়িয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে দ্রুত স্থাপনাটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তা না হলে সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে দুই শতকের পুরোনো এই নিদর্শন।
আরটিভি/এমএম




