
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় মাত্র এক রাতের ব্যবধানে পাঁচটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে। আর এই চুরির খেসারত হিসেবে রঘুনাথপুর ইউনিয়নের সব এলাকার ভুক্তভোগী সাধারণ গ্রাহক ও কৃষকদের পকেট থেকেই বিপুল অঙ্কের টাকা মাশুল আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
শ্রীফলতলা লস্কর পাড়ার ভুক্তভোগী গ্রাহক নাজমুল হোসেইন জানান, নতুন ট্রান্সফরমার ও সংযোগের জন্য তাদের ৪৩ হাজার টাকা এবং পরিবহন খরচ বাবদ আরও ২ হাজার টাকাসহ সর্বমোট ৪৫ হাজার টাকা মাশুল দিতে হয়েছে। ওই এলাকার মোট ১৮ জন গ্রাহক মিলে এই টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হয়েছেন।
এদিকে অপর একটি স্পটের ভুক্তভোগী গ্রাহক দেলওয়ার হোসাইন মাস্টার জানিয়েছেন, তাদের ওখানকার নতুন ট্রান্সফরমার ও সংযোগ বাবদ ২২ জন গ্রাহককে মোট ৪৫০৫৩ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। একইভাবে নিত্যানন্দপুর মাঠ পাড়াসহ চুরির ঘটনা ঘটা বাকি সব এলাকাতেই একই অবস্থা বিরাজ করছে এবং প্রতিটি স্পটেই গ্রাহকদের কাছ থেকে সমপরিমাণ টাকা আদায় করা হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের এমন একতরফা ও অন্যায্য সিদ্ধান্তের কারণে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর উপজেলার রঘুনাথপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠে ও এলাকায় এই চুরির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে শ্রীফলতলা, লস্কর পাড়ায় সোহরাব মাস্টারের বাড়ির সংলগ্ন মাঠ থেকে ১টি, বড় শ্রীফলতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা থেকে ১টি, এবং নিত্যানন্দপুর মাঠ পাড়া এলাকা থেকে ২টি সড়াবাড়িয়া থেকে ১টি মোট ৫টি ট্রান্সফরমার। চোরেরা গভীর রাতে ট্রান্সফরমারগুলো থেকে ভেতরের মূল্যবান তামার তার ও কয়েল লুটে নেয় এবং খালি বডিগুলো ফেলে রেখে যায়।
এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় ভুক্তভোগী কৃষক নজরুল লস্কর শাহাবুদ্দীন ও আজিজ লস্কর বলেন, ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে রাতের আঁধারে, এটা সম্পূর্ণ প্রশাসনের ব্যর্থতা। অথচ সেই ব্যর্থতার দায়ভার আমাদের মতো খেটে খাওয়া কৃষক শ্রেণির মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। চোরের শাস্তি ও জরিমানা ভোগ করতে হচ্ছে আমাদের। এই বিপুল পরিমাণ টাকা জোগাড় করতে গিয়ে আমরা দরিদ্র কৃষকরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঋণী হয়ে পড়ছি।
তারা জানান, হঠাৎ করে এই বড় অঙ্কের আর্থিক খেসারত দিতে গিয়ে অনেক প্রান্তিক চাষি চরম বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে সেচ পাম্পের ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ায় ফসলের মাঠে পানি সেচ ব্যাহত হচ্ছে, যা চাষিদের আরও বড় চাষাবাদজনিত লোকসানের মুখে ফেলেছে।
আইনি বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের প্রচলিত ‘বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮’ এর ৩৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বা ট্রান্সফরমার চুরি ও বিনষ্ট করা একটি মারাত্মক এবং জামিনঅযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধের জন্য অন্যূন ২ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রীয় এই আইনে চোরকে শাস্তির স্পষ্ট নির্দেশ থাকলেও, গ্রাহকদের কাছ থেকে জরিমানা আদায়ের কোনো বিধান নেই। অথচ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ‘গ্রাহক সেবা নির্দেশিকা’র দোহাই দিয়ে মাঠের পাহারার দায় কৃষকদের ওপর চাপাচ্ছে এবং নতুন ট্রান্সফরমারের মূল্যের ৫০ শতাংশ ও পরিবহন খরচ বাবদ বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে— যা প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে ঝিনাইদহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির হরিণাকুণ্ডু জোনাল অফিসের এজিএম মো. শাহরিয়ার পল্লব জানান, গ্রাহকদের কাছ থেকে কোনো অতিরিক্ত বা নিয়মবহির্ভূত টাকা নেওয়া হয়নি। ঝিনাইদহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) নির্দেশনা ১০০-৩৫ এর সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ীই সম্পূর্ণ বৈধ রশিদের মাধ্যমে এই টাকা সরকারি কোষাগারে নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (BREB) নীতিমালায় মাঠপর্যায়ের বা সেচ পাম্পের ট্রান্সফরমার পাহারার মূল দায়িত্ব স্থানীয় গ্রাহকদের ওপর থাকে এবং প্রথমবার চুরি হলে ট্রান্সফরমার মূল্যের ৫০ শতাংশ টাকা গ্রাহকদের বহন করার নিয়ম রয়েছে।
এ বিষয়ে হরিণাকুণ্ডু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুম খান জানান, এই চুরির ঘটনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা করা হয়নি। তবে এলাকার কৃষকদের আইনি সহায়তা দিতে এবং নতুন করে চুরি রোধ করতে টহল পুলিশকে আরও সক্রিয় থাকার ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস কর্তৃক কৃষকদের কাছ থেকে চুরির ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়ে তিনি ভুক্তভোগীদের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
আরটিভি/এমএইচজে


