
কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে জান্নাতুল তাজমিন (১৫) নামের এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। উদ্ধারকালে মরদেহের পাশ থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সিএনজি চালক সুমনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে।
এদিকে এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেলেও; তিনি সুমন কি না, এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সুমনের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। তিনি কুমিল্লার বাগমারা দক্ষিণের জয়নগর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। প্রায় এক মাস আগে বসতঘর বিক্রি করে সেখান থেকে চলে যান তিনি। সুমন মাদকাসক্ত ছিলেন বলেও জানিয়েছে সূত্রটি।
সুমনকে আটকের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের উদ্দেশ্যে তার বোন, বোনের স্বামী ও খালা শাশুড়িকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হচ্ছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনাটি ঘটে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক সংলগ্ন পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর (মানুমুড়া) এলাকায়। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরবেলা স্থানীয়রা ধানক্ষেতে তাজমিনের মরদেহ এবং পাশে পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেয়। পরে লালমাই থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি উদ্ধার করে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জগতপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে যাওয়া নির্জন পাকা সড়কের দুই পাশে বিস্তৃত ফসলি জমি। সড়কের কাছাকাছি চার-পাঁচটি ধানক্ষেতে ধানগাছ এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। বিভিন্ন স্থানে দৌড়াদৌড়ি বা ধস্তাধস্তির মতো ঘটনা ঘটে থাকতে পারে—এমন চিহ্ন চোখে পড়ে। সড়কের এক পাশে ধানক্ষেতে পড়ে ছিল একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। পরে স্থানীয়রা সেটি টেনে সড়কের ওপর তুলে আনেন।
এদিকে তাজমিনের মৃত্যুর আগের রাতের চলাচলের একটি সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। ফুটেজে দেখা গেছে, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে নামে তাজমিন। এরপর হোটেলের পশ্চিম পাশে কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যায় সে। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে কথা বলে। এ সময় দোকানিকে তাকে কিছু একটা দেখাতে বা কোনো দিক নির্দেশ করতে দেখা যায়।
এতে আরও দেখা গেছে, দোকানের সামনে কিছু একটা দেখানোর পর তাজমিন সেখান থেকে সরে অন্য পাশে যায়। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে নূরজাহান হোটেল এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়। তবে এলাকা ছাড়ার পর তাজমীন কোন পথে গিয়েছিল, সে বিষয়ে এখনও কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তার চলাচলের পথ এবং সম্ভাব্য যাতায়াতের মাধ্যম নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ।
এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানায়, চারদিন আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে তাজনিম প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। পরদিন কুমিল্লায় ফিরে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়। ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয় তাজমিন। রাতে পদুয়ার বাজারে পৌঁছে নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে সে। সিসিটিভি ফুটেজে ওই এলাকায় তার অবস্থান ও দোকানির সঙ্গে কথা বলার দৃশ্য দেখা গেলেও সেখান থেকে চলে যাওয়ার পরদিন তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানান, বুধবার গভীর রাতে মেয়ের কাছ থেকে একটি বার্তা ও লাইভ লোকেশন পান তিনি। মেয়েটি তাকে সেখানে গিয়ে নিয়ে আসতে বলেছিল। তবে তখন ঘুমিয়ে থাকায় সঙ্গে সঙ্গে বার্তাটি দেখতে পারেননি তিনি। পরে লোকেশন দেখে সেখানে গিয়ে দেখতে পান তাজমিনের নিথর মরদেহ।
ঘটনাস্থলের কাছে পাওয়া যাওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভেতরে থাকা ভ্যানিটি ব্যাগ ও শার্ট তাজমিনের বলে শনাক্ত করেছেন তার বাবা।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, তাজমিনের মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রথমে মরদেহটির পরিচয় পাওয়া না গেলেও পরে তা শনাক্ত করা হয়। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
ওসি আরও জানান, সিএনজিচালক সুমন মুঠোফোন ব্যবহার করেন না এবং তার জাতীয় পরিচয়পত্রও (এনআইডি) নেই বলে জানা গেছে।
আরটিভি/টিআর




