
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে (৩৮) পিটিয়ে হত্যার মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে (৪৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, গোপন সংবাদ ও প্রযুক্তির সহায়তায় আমিনীকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় তার নিজের মুঠোফোন সঙ্গে ছিল না। তিনি অন্য সিম ও মুঠোফোন ব্যবহার করছিলেন। ওই সিম দিয়ে নিজের পরিচয় প্রকাশ করে একজনের সঙ্গে কথা বলার সূত্র ধরে তাকে শনাক্ত করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এখনো উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তাকে আদালতে সোপর্দ করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হবে।
দেবহাটা সার্কেল, কালীগঞ্জ থানা, দেবহাটা থানা ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৬-এর সদস্যরা যৌথ অভিযান চালিয়ে আমিনীকে গ্রেপ্তার করেন।
গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দেবহাটায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে শামীমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের বাসিন্দা।
গত বৃহস্পতিবার রাতে নিহত শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। মামলায় আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ভোরে পুলিশ এজাহারভুক্ত ৫ ও ৬ নম্বর আসামি মোক্তার হোসেন খান (৫৩) ও আসাদুল ইসলাম মোল্যাকে (৪৬) গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। ওসি জানান, সিসিটিভি ফুটেজ ও মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
প্রধান আসামি গ্রেপ্তারের খবরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নিহত শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান। তিনি বলেন, “প্রধান আসামি গ্রেপ্তারের খবরে আমরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। এখন আমাদের একটাই চাওয়া, আমার ভাইয়ের সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে, রাষ্ট্র যেন তার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করে। প্রচলিত আইন ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হোক। পাশাপাশি আমার ভাইয়ের দুই এতিম সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে সরকার যেন তাদের পাশে দাঁড়ায়।”
মামলার অন্য আসামিদেরও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তাওসিফ। তিনি বলেন, ২ ও ৩ নম্বর আসামি কামরুল গাজী ও সাদিকুলকে গ্রেপ্তার করা হলে এ ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন এবং কারা মূল ভূমিকা পালন করেছেন, সে বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তার দাবি, কামরুল গাজী পুলিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি। তবে সাদিকুলের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে তারা নিশ্চিত নন।
এদিকে দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইমদাদুল হক বলেন, শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। জামায়াত এ ধরনের সহিংসতা সমর্থন করে না।
নিহত শামীমের পরিবার জানায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গত সোমবার (১২ অক্টোবর) শামীম ও তার স্ত্রীর বাগ্বিতণ্ডার একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য রয়েছে, এমন অভিযোগ ওঠার পর তার বাড়িতে হামলার চেষ্টা হয়। পরে স্থানীয় একটি বাজারে তাকে মারধর করা হয়। এরপর শামীম বিষপান করেন বলে জানিয়েছে পরিবার।
স্থানীয় পল্লিচিকিৎসক মো. সবুরের চেম্বারে তার চিকিৎসা চলাকালে পরদিন শতাধিক মানুষ জড়ো হন। তারা শামীমকে টেনেহিঁচড়ে বের করে মারধর করেন। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।
দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, হাসপাতালে ভর্তির পর শতাধিক ব্যক্তি ওয়ার্ডে ঢুকে শামীমকে আবার মারধর করেন। আনসার সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী ও হাসপাতালের কর্মীরা তাদের থামাতে ব্যর্থ হন। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
তিনি আরও জানান, হাসপাতালের কয়েকটি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সব ফুটেজ দেখা সম্ভব হয়নি। পুলিশ এখনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ফুটেজ চায়নি। তবে কর্তৃপক্ষ ফুটেজ সংরক্ষণের চেষ্টা করছে।
আরটিভি/ এসকেডি




