ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩

এবার পুকুরের মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

এবার বাংলাদেশের মিঠাপানির মাছ চাষের পুকুরের পলি এবং মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। এই গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ পুকুরের তলদেশের পলিতে মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার দূষণ রয়েছে। এর আগে নদী, সমুদ্র এবং এমনকি ইলিশ মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল, তবে চাষের পুকুরে এ ধরনের সমন্বিত গবেষণা এবারই প্রথম।

গবেষকদের মতে, এই তথ্যগুলো জলজ খাদ্যশৃঙ্খলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রবেশ প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় এই গবেষণাটিতে দেখা যায়— নির্বাচিত ২৫টি পুকুরের প্রতিটি পলির নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। মাছের নমুনায়ও এই ক্ষুদ্র কণাগুলোর উপস্থিতি মিলেছে, যা মৎস্যসম্পদ, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

গবেষণাটির শিরোনাম ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার: এভিডেন্স অব সেডিমেন্ট–ফিশ ট্রান্সফার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটেড ইকোলজিক্যাল রিস্ক ইন বাংলাদেশ’। চলতি মাসে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন-এ এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষকদের দাবি, মিঠাপানির চাষের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে এ ধরনের গবেষণা এই প্রথম, যা দেশের মৎস্যসম্পদের সম্ভাব্য ক্ষতি নিরূপণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

মিঠাপানির মাছ চাষের অন্যতম প্রধান অঞ্চল ময়মনসিংহের ত্রিশাল। এখানে নিবিড় ও আধা নিবিড় পদ্ধতিতে বাণিজ্যিকভাবে মাছ উৎপাদন করা হয়। শীতকালে ২৫টি খামার থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক বদিউজ্জামান খান এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন।

তিনি বলেন, মিঠাপানির চাষের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে এ ধরনের গবেষণা এই প্রথম। এটি দেশের মৎস্যসম্পদের সম্ভাব্য ক্ষতি নিরূপণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

অধ্যাপক বদিউজ্জামান জানান, গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল পুকুরের তলদেশের পলি ও মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করা। সেই সঙ্গে মাছের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের সম্পর্ক, প্লাস্টিকের রাসায়নিক গঠন এবং পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন করা ছিল এর লক্ষ্য।

সাধারণত পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। প্লাস্টিক ব্যাগ, মোড়ক, দড়ি, মাছ ধরার জাল এবং বিভিন্ন বর্জ্য সামগ্রী ভেঙে এই ক্ষুদ্র কণা তৈরি হয় এবং পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।

ত্রিশালের ২৫টি পুকুরের গবেষণায় দেখা গেছে, তলদেশের পলিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ১১ দশমিক ০৪টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। পলিউশন লোড ইনডেক্স বা দূষণভার সূচকের মান ১ থেকে ৪ দশমিক ৫ এর মধ্যে পাওয়া গেছে, যার ভিত্তিতে অধিকাংশ স্থানকে মাঝারি থেকে উচ্চ দূষণযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রবহমান নদীর তুলনায় পুকুরে পানির বিনিময় সীমিত হওয়ায় তলদেশে এই কণাগুলো দীর্ঘ সময় জমে থাকার সুযোগ পায়। ফলে তলদেশে খাবার খোঁজা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর এই কণা গ্রহণের ঝুঁকি বেশি থাকে। তবে প্রজাতি, খাদ্য অভ্যাস এবং পুকুরের পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে কণা গ্রহণের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।

গবেষকেরা ছয় প্রজাতির মোট ১৫০টি মাছ পরীক্ষা করে মোট ৯০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেছেন। প্রতিটি মাছে গড় কণার সংখ্যা ছিল শূন্য দশমিক ৬০। প্রজাতিভেদে এই পার্থক্য ছিল লক্ষণীয়; সরপুঁটি মাছে প্রতিটি মাছে গড়ে ১ দশমিক ২০টি কণা পাওয়া গেছে, আর রুই ও মৃগেলের ক্ষেত্রে এই গড় ছিল শূন্য দশমিক ৬৮। অন্যদিকে কাতলা, কমন কার্প ও পাঙাশ মাছে তুলনামূলক কম কণা পাওয়া গেছে।

বসবাসের স্তর অনুযায়ী, তলদেশে বসবাসকারী মাছের মধ্যে মোট শনাক্ত কণার ৫২ শতাংশ পাওয়া গেছে। মধ্যবর্তী স্তরের মাছের ক্ষেত্রে এই হার ৩৫ শতাংশ এবং উপরিভাগের মাছের ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ। অধ্যাপক বদিউজ্জামান খান বলেন, মাছকে প্রচুর ফিড খাওয়ানো হয়। সব ফিড যে খারাপ, তা বলছি না। তবে কিছু ফিডে এসব থাকে। অনেক সময় বন্যার পানিতে অন্য স্থানের মাইক্রোপ্লাস্টিক পুকুরে চলে আসে। মাছের পরিপাকতন্ত্রে আমরা মূলত এর উপস্থিতি দেখেছি।

গবেষণায় প্রধানত পলিথিন (পিই) ও পলিপ্রপিলিন (পিপি) পলিমার শনাক্ত হয়েছে। পলিথিন সাধারণত ব্যাগ ও প্যাকেজিংয়ে এবং পলিপ্রপিলিন পাত্র, দড়ি ও প্লাস্টিক পণ্যে ব্যবহৃত হয়। গবেষকদের মতে, মাছের খাদ্য, বস্তা, মোড়ক, মাছ ধরার সরঞ্জাম, পানির পাইপ এবং গৃহস্থালি বর্জ্য এর সম্ভাব্য উৎস হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট উৎস নিশ্চিত করতে আরও পৃথক নমুনা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

ত্রিশাল উপজেলায় প্রায় ২২ হাজার পুকুরে মাছ চাষ হয় এবং বছরে উৎপাদিত হয় ৭২ হাজার মেট্রিক টন মাছ। জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহানা নাজনীন জানান, পুকুরের পাড়ে পোল্ট্রি খামারের কারণে দূষণ ঘটতে পারে। তিনি বলেন, মাছের পুকুরের পাড়ে পোলট্রির জন্য মাছ চাষে দূষণের ঘটনা ঘটতে পারে। এ নিয়ে আমরা ইতিমধ্যে অভিযান শুরু করেছি। ইতিমধ্যে একটি পুকুরের পাশ থেকে মুরগির খামার তুলে দেওয়া হয়েছে।

গবেষকরা বলেন, পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। এটা কোথায় ফেলা হবে, এর কোনো সঠিক জায়গা নেই। প্রক্রিয়াজাত প্রায় হচ্ছেই না। মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আমরা দেখেছি। মাছ থেকে তাই এটি মানুষের শরীরে পৌঁছাবে না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।

তারা জানান, পলিথিন অসংখ্য অণুর সমন্বয়ে গঠিত হওয়ায় রান্নার তাপে এটি সহজে নষ্ট হয় না। ফলে মাছের মাধ্যমে এটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে যকৃত ও কিডনির কার্যক্রমে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
মোংলা বন্দরের কার্যক্রম ঘুরে দেখলেন প্রধানমন্ত্রী
মোংলা বন্দরের জেটিতে পৌঁছে সব কার্যক্রম সরেজমিনে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিনি বন্দরের অন্যান্য কার্যক্রমও পরিদর্শন করেন।
মোংলা বন্দরের কার্যক্রম ঘুরে দেখলেন প্রধানমন্ত্রী
আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে যুক্ত হচ্ছে সুন্দরবনের ৭ জলজ প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের জলজ ভাণ্ডারে যুক্ত হলো এক নতুন ও ঐতিহাসিক মাইলফলক। সুন্দরবনের পানিতে নতুন করে পাওয়া ৫ প্রজাতির মাছ ও ২ প্রজাতির চিংড়ির ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে যুক্ত হতে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে যুক্ত হচ্ছে সুন্দরবনের ৭ জলজ প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি মন্ত্রী আব্দুল মঈন খান
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান।
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি মন্ত্রী আব্দুল মঈন খান
জমির নামজারির নিয়মে বড় পরিবর্তন, যেভাবে করবেন আবেদন
জমি কেনার পর কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির মালিকানা-সংক্রান্ত তথ্য সরকারি ভূমি রেকর্ডে হালনাগাদ করতে নামজারি করা জরুরি। তবে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারির নিয়মে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
জমির নামজারির নিয়মে বড় পরিবর্তন, যেভাবে করবেন আবেদন
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ, প্রজননস্থল ধ্বংসে জোর বিশেষজ্ঞদের
অক্টোবর ও নভেম্বর মাসেও ডেঙ্গুর পরিস্থিতি উদ্বেগজনক থাকতে পারে। নভেম্বর মাসে প্রকোপ কিছুটা কমলেও উল্লেখযোগ্য উন্নতির জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ, প্রজননস্থল ধ্বংসে জোর বিশেষজ্ঞদের
আরও পড়ুন
রাতে চোখে ঘুম লেগে আসে পাহারাদারের, এই সুযোগেই ঘটে ‘সর্বনাশ’
মাছ ধরতে গিয়ে কুমিরের হামলা, প্রাণ গেল ৭১ বছরের বৃদ্ধের
জেলের জালে ৯০ কেজির বাঘাইড়, দাম আকাশ ছোঁয়া
সুন্দরবনে মিলল নতুন ৭ প্রজাতির মাছের সন্ধান