
সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের ঘটনা দীর্ঘদিনের। কীটনাশক ও বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে মাছ ধরছে একটি অসাধু চক্র। সময়ের সঙ্গে বনের বিভিন্ন নদী ও খালে ছড়িয়ে পড়েছে তাদের তৎপরতা।
এতে একদিকে ধ্বংস হচ্ছে মৎস্যসম্পদ ও জলজ প্রাণী, অন্যদিকে ঝুঁকির মুখে পড়ছে বন বিভাগের টহল কার্যক্রম। সম্প্রতি বিষ দিয়ে মাছ শিকারের পাশাপাশি বনকর্মীদের কাজে বাধা এবং তাদের ওপর হামলার চেষ্টার অভিযোগও সামনে এসেছে।
বন বিভাগের ভাষায়, সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী এসব অপরাধী ‘বিষদস্যু’ হিসেবে পরিচিত। এতদিন এ ধরনের অপরাধে পুরুষদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেলেও এবার প্রথমবারের মতো বিষদস্যুদের তালিকায় দুই নারীর নাম এসেছে। বিষ দিয়ে মাছ শিকারের সময় বনকর্মীদের ওপর হামলার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
সোমবার দুপুরে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের জোংড়া টহল ফাঁড়ির আওতাধীন ছোট জোংড়া খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার সময় দুই নারী ও দুই পুরুষকে শনাক্ত করেন বনরক্ষীরা। তাদের বাধা দিতে গেলে নৌকার বৈঠা, লাঠি ও দা নিয়ে বনকর্মীদের ওপর চড়াও হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে বনকর্মীদের প্রতিরোধের মুখে নৌকা ও মাছ ধরার সরঞ্জাম ফেলে বনের ভেতরে পালিয়ে যান অভিযুক্তরা।
ঘটনাস্থল থেকে একটি নৌকা, খালপাটা জাল, বিষের খালি বোতল এবং বিষ প্রয়োগ করা কিছু মাছ উদ্ধার করেন বনকর্মীরা। এ ঘটনায় দুই নারী ও দুই পুরুষকে আসামি করে দাকোপ থানায় অভিযোগ দিয়েছে বন বিভাগ।
অভিযুক্তরা হলেন মোংলার জয়মনি এলাকার আব্বাস শেখের ছেলে মো. সোহেল শেখ, আজীম উদ্দীনের ছেলে ইউনুচ আলী এবং নুর আলী শেখের মেয়ে লাইজু বেগম ও কালাই খার মেয়ে নুপুর খা।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুরে ছোট জোংড়া খালে একটি নৌকার গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হয় জোংড়া টহল ফাঁড়ির কর্মীদের। নৌকাটিতে দুই পুরুষ ও দুই নারী ছিলেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ফাঁড়ির ছয় বনকর্মী দুই দলে ভাগ হয়ে অভিযান শুরু করেন। একদল হেঁটে এবং অন্য দল টহল ট্রলারে করে খালের দিকে এগিয়ে যান।
ঘটনাস্থলে গিয়ে বনকর্মীরা দেখতে পান, এক নারী খালের মধ্যে খালপাটা জাল পেতে বসে আছেন। এ সময় পানিতে মাছের অস্বাভাবিক লাফালাফি নজরে আসে তাদের। পরে ওই নারীর কাছে জাল পাতার কারণ এবং মাছের এমন আচরণের বিষয়ে জানতে চান বনকর্মীরা।
এর কিছুক্ষণ পর ইউনুচ আলী নামের এক ব্যক্তি বন থেকে নেমে নৌকায় ওঠেন। বনকর্মীরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং নৌকাটি টহল ট্রলারের সঙ্গে আটকানোর নির্দেশ দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এক ব্যক্তি দা দিয়ে বন বিভাগের এক কর্মীকে আঘাত করার চেষ্টা করেন। এ সময় বন বিভাগের ট্রলারেও কয়েকটি কোপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে নৌকায় থাকা নারী-পুরুষেরা বৈঠা নিয়ে বনকর্মীদের মারতে উদ্যত হন। নারীরাও বনকর্মীদের হেনস্তা এবং দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশংকায় নিজেদের নিরাপত্তার জন্য কিছুটা দূরে সরে যান বনকর্মীরা। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান। খবর পেয়ে সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) দীপন চন্দ্র দাস চাঁদপাই স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত জনবল নিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
স্টেশন কর্মকর্তা ও তার সঙ্গে থাকা টহল দল সেখানে পৌঁছালে তাঁদের ওপরও হামলার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ বন বিভাগের। পরে বনকর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে নৌকা, জাল, বিষের খালি বোতল ও বিষ প্রয়োগ করা মাছ জব্দ করে ফাঁড়িতে ফিরে আসেন।
সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার ক্ষতি শুধু মাছের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো জলজ পরিবেশের ওপর। নদী ও খালে ছড়িয়ে পড়া বিষে মাছের পাশাপাশি মারা যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ, পোনা, চিংড়ি ও অন্যান্য জলজ প্রাণী। এর প্রভাব খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে বনের অন্যান্য প্রাণীর ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাধারণত বিষ প্রয়োগের পর পানিতে থাকা মাছ দুর্বল হয়ে ওপরে ভেসে ওঠে। তখন সহজেই জাল দিয়ে সেগুলো সংগ্রহ করেন অসাধু জেলেরা। এতে অল্প সময়ে বেশি মাছ পাওয়া গেলেও ধ্বংস হয় মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারের স্বাভাবিক পরিবেশ।
বিষের প্রভাবে আক্রান্ত কিংবা মারা যাওয়া অনেক জলজ প্রাণী পানির নিচে ও খালের বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকে। ফলে পরিবেশের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
সুন্দরবনের নদী-খাল শুধু মাছের আবাসস্থল নয়, বনের অসংখ্য প্রাণীর খাদ্য ও জীবনধারণের অন্যতম উৎস। এসব জলাশয়ে বিষ প্রয়োগের কারণে মাছের পোনা ও ছোট জলজ প্রাণী ধ্বংস হলে ভবিষ্যতে মৎস্য উৎপাদনেও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে হরিণ শিকারসহ বিভিন্ন ধরনের বন্য প্রাণী শিকার ও বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অবৈধ শিকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, ফাঁদ উদ্ধার এবং টহল জোরদারের মাধ্যমে এসব অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি বন বিভাগের।
তবে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বনের দুর্গম নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ, বনকর্মীদের দায়িত্ব পালনে বাধা এবং হামলার চেষ্টার কারণে নিয়মিত টহল কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিষদস্যুদের তৎপরতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবারের ঘটনায় দুই নারীর নাম আসায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের ঘটনায় এর আগে নারীদের এমন সম্পৃক্ততার তথ্য তাদের কাছে ছিল না।
জোংড়া টহল ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমান বলেন, সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে এবারই প্রথম নারী বিষদস্যুর সন্ধান পেয়েছেন তারা। দুই নারী ও দুই পুরুষ মিলে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের সময় বনকর্মীরা বাধা দিলে তারা হামলার চেষ্টা করেন। পরে ঘটনাস্থল থেকে নৌকা, জাল ও বিষের বোতলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, বিষদস্যুদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড এবং বনকর্মীদের ওপর আক্রমণাত্মক আচরণ সুন্দরবন সংরক্ষণের কাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বন বিভাগের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু অভিযান ও মামলা করে এ অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ডিএফওর মতে, সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বিষ ও রাসায়নিক দ্রব্যের উৎস শনাক্ত করে সরবরাহ বন্ধ করা জরুরি। একই সঙ্গে অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা, স্থানীয় জেলে ও বনজীবীদের সম্পৃক্ত করে নজরদারি বাড়ানো এবং বনকর্মীদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবল নিশ্চিত করতে হবে।
আরটিভি/এসএস




