
ফেনী শহরের ফুসফুসখ্যাত ঐতিহাসিক রাজাঝির দিঘির পাড় দখল করে বছরের পর বছর ধরে চলছে অবৈধ বাণিজ্য। ফলে দিঘির চারপাশে সড়ক থাকলেও যান চলাচল তো দূরের কথা, পথচারীদের পায়ে হেঁটে চলাও দায় হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ের বড় অংশজুড়ে জবরদখল করে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে পাঁচ শতাধিক দোকান। এসব দোকানের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে দিঘিতে। ফলে দখল ও দূষণে বিবর্ণ হয়ে পড়েছে ফেনী শহরের ‘জন্মসাক্ষী’ এ দিঘি। পুরো এলাকাই এখন ভয়াবহ দখল ও দূষণের কবলে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ত্রিপুরার মানিক্য রাজবংশের জনৈক রাজা তার অন্ধ কন্যার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে ১০ দশমিক ৩২ একর জায়গাজুড়ে এ দিঘি খনন করেন। সেখান থেকেই দিঘিটির নাম হয় রাজাঝির দিঘি বা রাজনন্দিনীর দিঘি। ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্র ট্রাংক রোডের পাশে এ দিঘির অবস্থান। আগে ফেনীতে কেউ বেড়াতে এলে প্রথমেই ছুটে যেতেন রাজাঝির দিঘির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করতে। এখানকার নির্মল জলরাশি আর মুক্ত বাতাসে প্রাণ খুলে শ্বাস নিতেন দর্শনার্থীরা।
এ রাজাঝির দিঘিকে ঘিরেই ১৮৭৫ সালে ফেনী মহকুমার সদর দপ্তর গড়ে তোলা হয়। জেলায় উন্নীত হওয়ার পরও দিঘির পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে জেলা ও দায়রা জজ আদালত, অফিসার্স ক্লাব, কোর্ট মসজিদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও বাসভবন, ফেনী মডেল থানা এবং উত্তর-পশ্চিম কোণে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ছিল। উত্তর পাড়ে ছিল সড়ক ও জনপথ বিভাগের ডাকবাংলো। পরে জেলা সদর দপ্তর অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও আদালত সেখানে স্থানান্তর করা হয়। এ দিঘিকে কেন্দ্র করেই ফেনী মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
কিন্তু এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি সত্ত্বেও দখল ও দূষণে দিঘি এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অবৈধ দখল ও দূষণে এখন দিঘিটির প্রাণ যায় যায় অবস্থা। অন্যদিকে, পথচারীদের চলাচলের জায়গা দখল করে অবৈধ দোকানপাট গড়ে ওঠায় সেখানে মাদকসেবী ও ইভ টিজারদের আনাগোনা বেড়েছে। দোকানপাটের আড়ালে মাদকের রমরমা কারবার চলে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের দাপট। এ ছাড়া শহরের প্রাণকেন্দ্রের এ দিঘি থেকে সম্প্রতি দুটি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
দিঘির পূর্ব ও দক্ষিণ পাড়ে জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ফেনী পৌরসভা দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করলেও অবৈধ স্থাপনাগুলো এবং কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতের কারণে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। এসব স্থাপনা উচ্ছেদে প্রশাসন বারবার ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এর আগে কয়েক দফা উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কিছুদিন পর আবার পুরোনো চেহারায় ফিরে যায় দিঘির পাড়।
২০১৬ সালের ডিসেম্বর, ২০১৭ সালের এপ্রিল ও ২০১৯ সালের মার্চে দিঘির পাড় অবৈধ দখলমুক্ত করেছিল ফেনী জেলা প্রশাসন ও ফেনী পৌরসভা। তখন ফেনী পৌরসভা কর্তৃপক্ষ দোকান সরিয়ে নিতে মাইকিং করলেও তাতে কর্ণপাত করেননি দোকানিরা। সে সময় বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ অভিযান চালানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। একটি প্রভাবশালী মহল এখানকার ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করে বলে জানা যায়। তাদের ছত্রচ্ছায়াতেই ব্যবসায়ীরা এখানে ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, এ ব্যবসা তারা নিয়ন্ত্রণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করে দিঘির প্রাণ-প্রকৃতি ফিরিয়ে আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয়রা বলেন, সরকারি জায়গা জবরদখল করে অবৈধ দোকান নির্মাণের মাধ্যমে বছরের পর বছর অবৈধ বাণিজ্য চলছে। বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের নেতারা এ থেকে ভাগ পেলেও ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী এবং প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তা এ থেকে অবৈধ সুবিধা ভোগ করছেন বলে তাদের অভিযোগ। এসব কাজে ইলিয়াস নামের এক ব্যক্তি সহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয়রা আরও বলেন, একজন ব্যবসায়ীকে দোকানে বিদ্যুৎ-সংযোগ নিতে জমির কাগজসহ আনুষঙ্গিক কাগজপত্র জমা দিতে হয়। সেখানে পিডিবি কীভাবে এসব দোকানে বিদ্যুৎ-সংযোগ দিল? জেলা শহরের ফুসফুসখ্যাত এ দিঘির সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দিঘির পাড়ের কাপড় ব্যবসায়ী মোর্শেদ আলম বলেন, আমার বাবা দীর্ঘদিন এ দিঘির পাড়ে ব্যবসা করেছেন। সম্প্রতি তার মৃত্যুর পর আমি দোকানটি পরিচালনা করছি। এটি দিয়েই আমাদের সংসার চলে। তাছাড়া দিঘির পাড়ের এসব দোকান ঘিরে দুই হাজারেরও বেশি মানুষের সংসার চলছে। এখানে ব্যবসা করতে না পারলে এসব পরিবারের মানুষগুলোর না খেয়ে মরার দশা হবে। জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা যদি একটি হকার্স মার্কেট তৈরি করে দেয়, তাহলে আমাদের স্থায়ী পুনর্বাসন হবে।
ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির উদ্দিন বলেন, রাজাঝির দিঘির পাড়ের পাঁচ শতাধিক অবৈধ দোকান পৌরসভার অনুমোদন ছাড়াই বসছে। এ থেকে পৌরসভা কোনো ভাড়া পায় না। আমরা লোকমুখে শুনেছি, কে বা কারা প্রতি দোকান থেকে মাসিক ৬০০ টাকা করে আদায় করে। এ বিষয়ে পৌরসভা কিছুই জানে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী শহর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জিয়া উদ্দিন আহমেদ মিষ্টার বলেন, রাজাঝির দিঘির পাড়ের অবৈধ দোকানগুলো শহরের জন্য একটি বিষফোঁড়া। আমাদের বিভিন্ন মার্কেটের ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করে এবং সব ধরনের কর পরিশোধ করেও ব্যবসা করতে পারছেন না। আর তারা অবৈধ জায়গা দখল করে ব্যবসা করবেন, এটি হতে পারে না। অবিলম্বে এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করে দিঘির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে হবে।
ফেনী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, রাজাঝির দিঘির পাড়কে কেন্দ্র করেই আজকের ফেনী শহরের গোড়াপত্তন হয়েছে। দিঘির আশপাশে ছিল শহরের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যালয়। কালের পরিক্রমায় দিঘির পাড় এখন অবৈধ হকারদের দখলে চলে গেছে। নামকাওয়াস্তে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা না করে প্রশাসন যদি সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে এসব দোকান ভাড়া দেয়, তাহলে সরকারের বিপুল রাজস্ব আদায় হবে। সন্ধ্যাকালীন বাজার বসালে জায়গাটি দখলমুক্ত হওয়ার পাশাপাশি হকারদেরও পুনর্বাসন হবে।
আরটিভি/টিআর




