
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেগা প্রজেক্টের পিডি ড. মো. নওয়াব আলী খান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও বহাল তবিওয়তে। স্বৈরাচারের আস্থাভাজন হিসেবে পতিত সরকারের সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী ছিলেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক পদ আর উপাচার্যের সাথে সম্পর্কের কারণে নওয়াব আলী এখনও সুবিধার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন।
অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্ত্রীকে চাকরি পাইয়ে দেওয়াসহ পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে ড. নওয়াব আলীর বিরুদ্ধে। স্বৈরাচারের সুবিধাভোগী দোষররা পালিয়ে গেলেও ড. নওয়াব আলী খান থেকে গেছেন ধরা ছোয়ার বাইরে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের পুনর্বিন্যাসের ঢেউ গেলেও ইবির প্রকল্প পরিচালক ড. নওয়াব আলী রয়ে গেছেন অপরিবর্তিত। স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনীতির ঘনিষ্ঠ ও জুলাই আন্দোলনের বিপক্ষে থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছে জুলাই আন্দোলনের পক্ষের শিক্ষক-কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ড. নওয়াব আলী খান ২০২২ সালের ৩০ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ৯ জানুয়ারি শেখ হাসিনার দেওয়া ইবির ৫৩৭ কোটি ৭ লাখ টাকার ‘উন্নয়ন (৩য় পর্যায়) ১ম সংশোধিত’ মেগা প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। এসব প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি সিদ্ধান্তে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তিনি বরাবরই প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে ড. নওয়াব আলী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ছিল। বিভিন্ন সময় নামে বেনামে প্রকল্পের টাকা আত্মস্যাৎ করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আলাউদ্দিনের সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার স্ত্রী সেলিনা আক্তারকে চাকরি দেওয়ার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। স্ত্রী সেলিনা আক্তার ইবির লাইব্রেরীতে কর্মরত রয়েছে।

আওয়ামী সখ্যতা, প্রভাব
কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলীর সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল ড. নওয়াব আলী খানের। এ ছাড়া কুষ্টিয়া সদর আসনের সাবেক এমপি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের সাথেও যোগাযোগ ছিল তার। তৎকালীন ইবি ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার সাথে তার বেশ খাতির ছিল। এসব নিয়ে কুষ্টিয়ায় বেশ প্রভাব ছিল তার।
ড. নওয়াব আলী খান ইবির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। ২০২৫ সালের ৫ মার্চ, ‘ফ্যাসিবাদী তৎপরতা, দুর্নীতি এবং অন্যান্য অভিযোগে’ তাকে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালকের পদ থেকে অপসারণ করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে ফাইলপত্র সরানোর অভিযোগ ওঠে।
যেভাবে ফাইলপত্র গায়েব হয়
অব্যাহতির পরের দিন ৬ মার্চ, বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির দিনে দপ্তরটির ফাইলপত্র বাসায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে সাবেক এই পরিচালকের বিরুদ্ধে।
সূত্র মতে, অভিযুক্ত নওয়াব আলী গত ৬ মার্চ ছুটির দিনে দপ্তরটির ফাইলপত্র তিনটি মিনি ব্যাগ ও একটি বড় বস্তায় ভরেন। এসব ফাইলপত্র বের করার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ব্যবহার না করে গোপনে এক প্রকৌশলীর গাড়ি ব্যবহার করে ডরমিটরি সংলগ্ন দুই নম্বর গেট দিয়ে ফাইলপত্র ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যান বলে অভিযোগ উঠে।
এদিকে তার বিরুদ্ধে ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে প্রায় ৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
প্রমাণ মিললেও শাস্তি হয়নি
দুই বছর আগে ভুয়া বিলের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পের (৩য় পর্যায়) বিলে সোয়া ৬ কোটি টাকার আত্মসাতের অভিযোগ উঠে প্রকল্প পরিচালক নওয়াব আলীসহ কয়েকজন প্রকৌশলী, কর্মকর্তা ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ তদন্তে তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. শেখ আব্দুল সালাম ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরবর্তী বছরের ৯ মার্চ জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে নওয়াব আলীসহ সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। কিন্তু ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি এমপ্লয়ি ইফিসিয়েন্সি অ্যান্ড ডিসিপ্লিন রুলস’ মতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কি ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে তা ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেনি তদন্ত কমিটি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি প্রশাসন। পরবর্তীতে উক্ত অনিয়মের বিষয়ের অধিকতর তদন্ত সাপেক্ষে সুনির্দিষ্ট শাস্তির ধরণ উল্লেখপূর্বক প্রতিবেদন প্রদানের জন্য আরেকটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের ফলে পটপরিবর্তনের কারণে উক্ত কমিটি কোনো ধরনের প্রতিবেদন দাখিল করেনি। ফলে মেগা প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে থেকে যান নওয়াব আলী।
ড. নওয়াব আলী পূর্বে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) রেজিস্ট্রার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০১০ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিনি পবিপ্রবির চুক্তিভিত্তিক রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করেন এবং ২২ মার্চ ২০১১ তারিখ পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তিনি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পান। অফিস আদেশ নং প্রশাঃ/ইবি-২০১১/৪২৫৮, ২১ মার্চ ২০১১ তে তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া হতে ছাড়পত্র গ্রহণ করেন। ২৩ মার্চ ২০১১ তারিখে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন এবং বিভিন্ন সময়ে ছুটি নিয়ে ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত চাকরি করেন।
তবে ১৫ ডিসেম্বর ২০১৪ থেকে ইবি থেকে নেওয়া তার বেতন ও ভাতা নিয়ে অভিযোগ ওঠে। ইউজিসির গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মোহাব্বত খান নওয়াব আলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন। এ ছাড়া অন্য একটি দুর্নীতির তদন্তে তার নাম আসে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য বিভাগে দায়িত্বরত ড. নওয়াব আলী খানের এক সহকর্মী বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন প্রশাসন নিয়োগ প্রাপ্ত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্বের সকল দুর্নীতির বিচার করার জন্য দাবি ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থানপন্থী শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই দাবি তুলে ধরেন। অন্যদিকে ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্পের আওতাধীন বিভিন্ন প্রকল্পের বিগত ১৫ বছরের অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবেদন উপদেষ্টার নিকট দাখিলের জন্য নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। দুই দিকের দাবির প্রেক্ষিতে জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করায় গত ৩০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭১ তম সিন্ডিকেটে ৩০ জন শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সাময়িক বহিষ্কার এবং ৩৩ জন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকে বহিষ্কার ও সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় ইবি প্রশাসন। তবে এর ফাঁক গলেও বের হয়ে যান নওয়াব আলী।
নওয়াব আলী কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে পড়াকালীন সময়ে অনুমান ১৯৯১ থেকে ৯৪ সালের দিকে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। কুষ্টিয়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বে দেওয়া বেশ কয়েকজন রয়েছে তারাও ছাত্র ইউনিয়ন করতো। ধারণা করা হয় এই সখ্যতা ও বর্তমান উপাচার্য ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহর আস্থাভাজন হওয়ায় ড. নওয়াব আলীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অস্বস্তি বিরাজ করছে। নওয়াব আলীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভে ফুসঁছে ইবির জুলাই পক্ষ। একই অপরাধে অপরাধী হওয়া স্বত্তেও তার বিরুদ্ধে কোনো প্রদক্ষেপ না নেওয়ায় অভ্যুত্থানবিরোধী ভূমিকা চিহ্নিতকরণ কমিটির তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক বলেন, নওয়াব আলী খান আগের সরকারের সময়ে বিশেষ সুবিধায় ছিলেন এটা ক্যাম্পাসের সবাই জানে। প্রশ্ন হচ্ছে, পটপরিবর্তনের পরও তিনি একই ক্ষমতায় বহাল থাকলেন কীভাবে?
ছাত্র সংগঠনের এক নেতার অভিযোগ, পটপরিবর্তনের পর প্রায় সকল প্রশাসনিক পদে পরিবর্তন আনা হলেও প্রকল্প পরিচালকের পদে নিয়োগ দেওয়ার মত যোগ্য কেউ না থাকার দোহাই দিয়ে উক্ত পদে নওয়াব আলীকে বহাল রাখা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ড. নওয়াব আলী খান বলেন, আমার বিরুদ্ধে আসা সবগুলো অভিযোগই মিথ্যা। একটি গোষ্ঠী আমাকে ছোট করার জন্য মিথ্যা বানোয়াট তথ্য প্রচার করছে।
ড. নওয়াব আলী খানের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ ফোন কলে জানান, এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
আরটিভি/একে

-1792227043-410252_1792227053.jpg)
