বিশ্বকাপ শেষ, স্মৃতির খাতায় রয়ে যাবে রাবি শিক্ষার্থীদের রাতজাগা আড্ডা

রাবি সংবাদদাতা, আরটিভি নিউজ

রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬ , ০৮:০৬ পিএম


বিশ্বকাপ শেষ, স্মৃতির খাতায় রয়ে যাবে রাবি শিক্ষার্থীদের রাতজাগা আড্ডা
ফুটবল বিশ্বকাপে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্মাদনা। ছবি: সংগৃহীত

আর্জেন্টিনা-স্পেন আর মাত্র একটি ম্যাচ। এরপরই শেষ হবে চার বছর ধরে প্রতীক্ষিত ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা। ট্রফি উঠবে কোনো এক দলের হাতে, বিজয়ের হাসি ফুটবে একদল সমর্থকের মুখে, অন্যদিকে কারও স্বপ্ন ভেঙে যাবে। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীদের কাছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো কোনো দলের জয়-পরাজয় নয়; বরং একসঙ্গে কাটানো অসংখ্য রাত, বন্ধুত্বের গল্প, তর্ক-বিতর্ক, খুনসুটি আর ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে থাকা উৎসবের আবহ।

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর থেকেই রাত নামলেই যেন বদলে যেত বিশ্ববিদ্যালয়ের চেনা পরিবেশ। হলের টিভি রুম, বিভাগের করিডোর, আবাসিক মেস কিংবা বড় পর্দার আয়োজন—যেখানেই খেলা, সেখানেই ভিড়। প্রিয় দলের জার্সি গায়ে, হাতে পতাকা আর মুখে স্লোগান নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন শিক্ষার্থীরা। খেলা শেষে কেউ উল্লাসে মেতে উঠেছেন, কেউ আবার হতাশ মুখে ফিরেছেন নিজের কক্ষে। তবে জয়-পরাজয়ের বাইরেও ছিল বন্ধুত্বের এক অনন্য গল্প।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপ দেখেছেন অনেক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। পরিবারের সঙ্গে নয়, বন্ধুদের সঙ্গে মধ্যরাতের খেলা দেখা তাদের কাছে একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। খেলা শুরুর আগেই সবাই মিলে চা-কফির আড্ডা, স্কোর নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী, শেষ বাঁশি বাজার পর জয়-পরাজয় নিয়ে হাসি-ঠাট্টা—সব মিলিয়ে তাদের কাছে এটি হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মরণীয় অধ্যায়।

বিশ্বকাপ ঘিরে ক্যাম্পাসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, তবে তা সীমাবদ্ধ ছিল মাঠের খেলায়। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন, ইংল্যান্ড কিংবা অন্য দলের সমর্থকদের মধ্যে তর্ক হয়েছে, বাজি ধরেছেন অনেকেই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়েছে মজার খুনসুটি। কিন্তু খেলা শেষ হতেই সবাই আবার এক টেবিলে বসে চা খেয়েছেন, ক্লাস করেছেন, আড্ডা দিয়েছেন। ফুটবল তাদের বিভক্ত করেনি, বরং আরও কাছাকাছি এনেছে।

আরও পড়ুন

যেসব দলের সমর্থকেরা বিদায় নিয়েছেন, তাদের কাছে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে আগেই। তবু তারা খেলা দেখা বন্ধ করেননি। প্রিয় দল না থাকলেও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য এখনো রাত জেগে ম্যাচ দেখছেন অনেকেই। অন্যদিকে ফাইনালে ওঠা দলগুলোর সমর্থকদের মধ্যে এখনো উত্তেজনা তুঙ্গে। শেষ ম্যাচ ঘিরে চলছে পরিকল্পনা, কে কোথায় বসে খেলা দেখবেন, কীভাবে উদ্‌যাপন করবেন—এসব নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।

বিশ্বকাপকে ঘিরে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজনও পেয়েছে ব্যাপক সাড়া। একই স্থানে বিভিন্ন বিভাগের শত শত শিক্ষার্থী একত্রে বসে খেলা উপভোগ করেছেন। নতুন পরিচয় হয়েছে, নতুন বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে এবারের বিশ্বকাপ।

তবে আনন্দের এই আয়োজন শেষ হতে চলেছে। কয়েক দিন পর আর থাকবে না গভীর রাতে একসঙ্গে খেলা দেখার পরিকল্পনা, প্রিয় দলকে ঘিরে উত্তেজনা কিংবা ম্যাচ শেষে দীর্ঘ আলোচনা। ক্যাম্পাস ফিরবে তার স্বাভাবিক ছন্দে। কিন্তু রাতজাগা সেই মুহূর্তগুলো, বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, জয়-পরাজয়ের আবেগ ভাগাভাগি আর একসঙ্গে কাটানো সময়—এসব স্মৃতি রয়ে যাবে রাবিয়ানদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অ্যালবামে। কারণ বিশ্বকাপ শেষ হয়, ট্রফির লড়াইও শেষ হয়। কিন্তু বন্ধুত্ব, স্মৃতি আর একসঙ্গে কাটানো সময়ের গল্পগুলো শেষ হয় না।

ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনাল ম্যাচের মহারণকে ঘিরে উৎসবের আমেজে ভাসছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল ম্যাচ উপভোগ করতে শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসের তিনটি স্থানে জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখার আয়োজন করা হয়েছে। ফলে হাজারো শিক্ষার্থীর সম্মিলিত উল্লাসে আবারও মুখর হয়ে উঠবে পুরো ক্যাম্পাস।  

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে জোহা চত্ত্বর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (রাকসুর) উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় স্টেডিয়াম ও ছাত্রদলের উদ্যোগে রাবির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলার দেখার আয়োজন করা হয়েছে।

শরীরচর্চা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং ব্রাজিল সমর্থক নোমান ইবনে শাহীন আরটিভিকে বলেন, “বন্ধুবান্ধব ও বড় ভাইদের সঙ্গে ক্যাম্পাসে বড় পর্দায় বিশ্বকাপের খেলা দেখা ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন দলের পতাকা, জার্সি এবং প্রতিটি ম্যাচকে ঘিরে উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা ক্যাম্পাসে খেলা দেখার আনন্দকে আরও দ্বিগুণ করে দিয়েছে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জয় আরটিভিকে বলেন, এবারই প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিশ্বকাপের খেলা দেখার সুযোগ হয়েছে তার। তার ভাষায়, “ক্যাম্পাসে খেলা দেখার আনন্দই আলাদা। এখানে সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ায় খেলাধুলা নিয়ে সবার মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় একই রকম। তাই বিশ্বকাপকে ঘিরে হাসি-ঠাট্টা, আলোচনা ও বিতর্ক হলেও তা কখনো ঝগড়ার পর্যায়ে পৌঁছায় না। ক্যাম্পাসে খেলা দেখার পরিবেশও ছিল সুশৃঙ্খল ও আনন্দময়। এটি আমার জন্য এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা, যা ক্যাম্পাস জীবনের একটি স্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থাকবে। 

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মাহিম আরটিভিকে বলেন, আগে কখনো এত বড় পরিসরে একসঙ্গে বসে বিশ্বকাপ দেখিনি। শত শত মানুষের সঙ্গে একই মুহূর্তে চিৎকার, করতালি আর উচ্ছ্বাস, পুরো অভিজ্ঞতাটাই ছিল অসাধারণ। মনে হয়েছে, এটা শুধু একটি খেলা নয়; বরং পুরো ক্যাম্পাসের একটি মিলনমেলা। বিশ্বকাপ উপলক্ষে পুরো ক্যাম্পাস যেন এক টুকরো ফুটবল উৎসবে পরিণত হয়েছিল। 

তিনি আরও বলেন, বিশ্বকাপ আমাদের শুধু একটি ম্যাচ উপহার দেয়নি, দিয়েছে একসঙ্গে থাকার আনন্দ। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা এক জায়গায় বসে একই আবেগে খেলা উপভোগ করেছে। এটাই ছিল সবচেয়ে সুন্দর দিক।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আহসান হাবিব আরটিভিকে বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বসে বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা উপভোগ করার স্বপ্ন অনেক আগে থেকেই ছিল। একজন নবীন শিক্ষার্থী হিসেবে প্রথম বর্ষেই ক্যাম্পাসে বিশ্বকাপের এমন পরিবেশে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাওয়া সত্যিই আমার জন্য ছিল অসাধারণ অভিজ্ঞতা। এই সুযোগ পেয়ে আমি ভীষণ আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত।

তিনি বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বকাপের খেলা দেখার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত সুন্দর, প্রাণবন্ত ও মনোমুগ্ধকর। সিনিয়র-জুনিয়র সবাই একসঙ্গে বসে খেলা দেখা, প্রিয় দলের প্রতিটি গোলের পর সম্মিলিত উল্লাস, করতালি আর উদযাপন পুরো ক্যাম্পাসকে এক অন্যরকম উৎসবের আবহে রাঙিয়ে তুলেছিল। আবার প্রতিপক্ষের পরাজয় নিয়েও বন্ধুসুলভ হাসি-ঠাট্টা ও আনন্দ ভাগাভাগির মুহূর্তগুলোও ছিল দারুণ উপভোগ্য।

তার ভাষায়, বিশ্বকাপ শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়, এটি আমাদের ক্যাম্পাসে পারস্পরিক সম্প্রীতি, বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যের এক অনন্য উপলক্ষ হয়ে উঠেছিল। এই স্মৃতিগুলো আজীবন হৃদয়ে গেঁথে থাকবে। ভবিষ্যতেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন আয়োজন অব্যাহত থাকবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী তুহিন প্রধান আরটিভিকে বলেন, এবারের বিশ্বকাপ আমার কাছে শুধু খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ক্যাম্পাসজীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। আমার মতো অনেক শিক্ষার্থীই জীবনে প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সঙ্গে বড় পর্দায় বিশ্বকাপ দেখেছে। রাতজাগা, একসঙ্গে খেলা দেখা, গোল হলে উল্লাস, আবার মিস হলে হতাশা—সব মিলিয়ে ক্যাম্পাস যেন এক প্রাণবন্ত উৎসবে পরিণত হয়েছিল।

তিনি বলেন, বিশ্বকাপ চলাকালে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দলের সমর্থন ভুলে একসঙ্গে বসে খেলা উপভোগ করেছে। খেলার আগে-পরে তর্ক, বন্ধুত্বপূর্ণ বাজি, খুনসুটি আর হাসি-ঠাট্টা ক্যাম্পাসের পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। ফুটবল আমাদের সবাইকে এক জায়গায় সমবেত করেছিল, যার ফলে উৎসবমুখর পরিবেশে খেলা উপভোগ করা সম্ভব হয়েছে।

প্রিয় দল ব্রাজিলের বিদায় নিয়ে তুহিন বলেন, ব্রাজিলের সমর্থক হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু দল বিদায় নেওয়ার পর কিছুটা কষ্ট পেয়েছি। তবুও প্রতিপক্ষের ভালো খেলাকে সম্মান করেছি এবং বুঝেছি, ফুটবলে জয়-পরাজয় দুটিই খেলার অংশ। অন্যদিকে বিজয়ী দলের সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, আনন্দ মিছিল ও উদযাপনও উপভোগ করেছি, কারণ এমন আনন্দই বিশ্বকাপকে আরও বিশেষ করে তোলে।

বিশ্বকাপ শেষে কী সবচেয়ে বেশি মিস করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি মিস করব সেই রাতজাগা মুহূর্তগুলো, বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে খেলা দেখা, ম্যাচ নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা, খুনসুটি আর ক্যাম্পাসের উৎসবমুখর পরিবেশ। কয়েক সপ্তাহের জন্য পুরো বিশ্ববিদ্যালয় যেন একটি বড় ফুটবল পরিবারের রূপ নিয়েছিল। এই স্মৃতিগুলো আমাদের ক্যাম্পাসজীবনের সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িয়ে থাকবে।

সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান আরটিভিকে বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পাসে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশির ব্যবস্থা থাকবে এবং শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ড সঙ্গে নিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করা হবে। বহিরাগতদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যাতে সবাই নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে খেলা উপভোগ করতে পারেন।

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission