
দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে বিপাকে পড়া ২২৫ শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছেন হবিগঞ্জের মাধবপুরের সন্তান অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেউলিয়া প্রক্রিয়ার কারণে আটকে থাকা শিক্ষার্থীদের প্রায় ১৫ কোটি ৮৮ লাখ ৬১ হাজার ২৫০ টাকা ফেরত পেতে আইনি লড়াইয়ে এবার সিউলে যাচ্ছেন তিনি।
আগামী ২৩ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন মাধবপুরের দাসপাড়া গ্রামের সাইফুল ইসলাম। ইউ কেয়ার এডুকেশন কনসালটেন্সি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে তিনি এ আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
ভুক্তভোগী ২২৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৯৪ জন বাংলাদেশি, ২৮ নেপালি ও তিনজন পাকিস্তানি। তারা দক্ষিণ কোরিয়ার সিংইয়ংজু বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য মোট ১৬ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার কোরিয়ান ওন টিউশন ফি জমা দেন। ভিসার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বিশ্ববিদ্যালয় সময়মতো জমা না দেওয়ায় তাদের ভিসা প্রত্যাখ্যাত হয়।
অফার লেটারে উল্লেখ ছিল, ভিসা না হলে ৯০ দিনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু নির্ধারিত ৯০ দিন পার হলেও শিক্ষার্থীরা টাকা ফেরত পাননি। এরপর শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট এডুকেশন কনসালটেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সকল শিক্ষার্থীর পক্ষে উই কেয়ার এডুকেশন এজেন্সির বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও কোন সমাধান মেলেনি।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বহুলা গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুল মান্নান মোরল টিউশন ফি বাবদ প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, সবকিছু চিন্তা করে মনে করেছিলাম দক্ষিণ কোরিয়ার এই বিশ্ববিদ্যালয়টিই সবচেয়ে ভালো হবে। এসব চিন্তা করেই আবেদন করি। পরে জানতে পারলাম, বিশ্ববিদ্যালয়টি সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। এখনো আমার টাকা ফেরত পাইনি।
তিনি আরও বলেন, তাদের সিলেটে একটি অফিস রয়েছে। তারা আজ নয়, কাল টাকা দেবে—এভাবে সময়ক্ষেপণ করেছে।
একই উপজেলার ছোট বহুলা গ্রামের শিক্ষার্থী মিয়া মো. কামাল টিউশন ফি বাবদ ৬ লাখ ১৮ হাজার টাকা জমা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। দক্ষিণ কোরিয়ায় টিউশন ফি তুলনামূলক কম হওয়ায় ভেবেছিলাম দেশটি আমার জন্য উপযুক্ত হবে। কিন্তু এখন দেখি প্রতারণার শিকার হয়েছি। ভিসা হয়নি, ফেরত মেলেনি টাকাও।
জানা গেছে, ২০২৬ সালের মার্চে ২২৫ শিক্ষার্থী সিংইয়ংজু বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার ও নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি বাবদ মোট ১,৬০৪,২৫০,০০০ কোরিয়ান ওন জমা দেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১৩ কোটি ৬৩ লাখ ৬১ হাজার ২৫০ টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, টিউশন ফি নেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাগজপত্র সময়মতো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয় নি বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে শিক্ষার্থীদের উ-২ স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়।
এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় দেউলিয়া হওয়ার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট উই কেয়ার এডুকেশন কনসালটেন্সি ফার্মের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন মাধবপুরের ছাতিয়াইন ইউনিয়নের দাসপাড়া গ্রামের সন্তান অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম। তিনি ঢাকার সুপ্রিম ল ফার্মের হেড অব চেম্বার। সমস্যাটি সমাধানের জন্য তিনি ব্যারিস্টার তানিয়া হামিদ জুইকে নিয়ে তিনি বিষয়টি পর্যালোচনা করে শিক্ষার্থীদের পক্ষে আইনি পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেন।
প্রথমেই তিনি গত ২০ মে ২০২৬ইং তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে আইনি নোটিশ পাঠায়। এতে শিক্ষার্থীদের জমা দেওয়া ১,৬০৪,২৫০,০০০ কোরিয়ান ওন টিউশন ফি ফেরতের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ হিসেবে আরও ২৬৪,৭০৫,০০০ কোরিয়ান ওন দাবি করা হয়। সব মিলিয়ে দাবির পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি ৮৮ লাখ ৬১ হাজার ২৫০ টাকা দাবি করে তিনি একটি জোরালো লিগ্যাল নোটিশ পাঠান।
তবে আইনি নোটিশের পরও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অর্থ ফেরতের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটারেই উল্লেখ ছিল, ভিসা না হলে ৯০ দিনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পুরো টিউশন ফি ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও বিশ্ববিদ্যালয় টাকা ফেরত দেয়নি। উই কেয়ারের পক্ষ থেকে বারবার যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। এর মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে।
এর মধ্যে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের কোরিয়ান এম্বেসিতে গিয়ে আন্দোলন করে। ফলে বিষয়টি সাউথ কোরিয়ার সরকার ও বাংলাদেশের কনসুলার অফিসে পৌঁছায়। এরই পরপর কনসুলার অফিস পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়কে অবহিত করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় এডভোকেট সাইফুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং আগামী ২৮ আগষ্টের মধ্যে কোরিয়ার উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়েরের পরামর্শ দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোরিয়ার আদালতে শিক্ষার্থীদের পাওনার দাবি দাখিল করতে হবে। উই কেয়ার এডুকেশন নিজ খরচে সেখানে আইনজীবী নিয়োগ করেন। তাহার সহিত সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় কাগজ নিয়ে কোরিয়াতে রওনা হবেন সাইফুল।
তিনি বলেন, আমরা জরুরি ভিত্তিতে সেই ক্লেইম ফাইল করার প্রস্তুতি নিয়েছি। যথাসময়ে ক্লেইম দাখিল করতে পারলে ইনশাআল্লাহ শিক্ষার্থীরা তাদের পুরো টাকা ফেরত পাবেন।
সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের অর্থ ফেরতের বিষয়ে উই কেয়ার এডুকেশন কনসালটেন্সি এবং বাংলাদেশ থেকে দায়িত্ব পালনকারী প্রতিনিধিরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছেন। সেখানে স্থানীয় কোরিয়ান আইনজীবীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আগামী ২৮ আগস্টের সময়সীমার মধ্যে আদালতে শিক্ষার্থীদের আর্থিক পাওনার দাবি দাখিল করবো।
ইতোমধ্যে সুপ্রিম ল ফার্মের একটি লিগ্যাল টিম শিক্ষার্থীদের পক্ষে প্রয়োজনীয় পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও আদালতের কাগজপত্র প্রস্তুত করেছে।
এদিকে ঢাকায় অবস্থানরত দক্ষিণ কোরিয়ার দূতাবাসের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। অনেকে পরিবারের সঞ্চয়, ঋণ কিংবা জমি-জমা বন্ধক রেখে উচ্চশিক্ষার জন্য কোরিয়ায় টাকা পাঠিয়েছেন। ফলে টাকা ফেরত না পাওয়ায় তারা আর্থিকভাবে চরম সংকটে পড়েছেন।
আরটিভি/এমএম




