
ক্যাম্পাসের ব্যস্ততা, ক্লাস-পরীক্ষা আর প্রতিদিনের সংবাদ সংগ্রহের জন্য ছুটে চলা এই সবকিছুকে কিছুদিনের জন্য পাশে রেখে পাঁচ দিন পাঁচ রাতের জন্য সমুদ্রের শহর কক্সবাজারের পথে পাড়ি জমায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের সদস্যরা। ২৪ আগস্ট রাতে যাত্রা শুরু করেন তারা। তবে এই সফর ছিল না কেবল সমুদ্র দেখার আয়োজন। টলারে মহেশখালী ভ্রমণ, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ঘুরে দেখা, সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেজা, চান্দের গাড়িতে পাহাড়ি পথ পাড়ি দেওয়া—সব মিলিয়ে সফরটি হয়ে ওঠে প্রকৃতি, সংস্কৃতি, আনন্দ ও বন্ধুত্বের এক দীর্ঘ গল্প। ২৯ আগস্ট বিকেলে ক্যাম্পাসে ফেরেন সবাই।
ক্যাম্পাস থেকে শুরু, ট্রেনের জানালায় নতুন উত্তেজনা
সফরের শুরুতেই ছিল দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি। ময়মনসিংহ থেকে ট্রেনে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করেন প্রেসক্লাবের সদস্যরা। ট্রেনের জানালার বাইরে বদলে যেতে থাকা দৃশ্য আর সহযাত্রীদের গল্প-আড্ডায় কখন যে পথ পেরিয়ে যায়, তা যেন টেরই পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রামে পৌঁছে সেখান থেকে বাসে করে শুরু হয় কক্সবাজারের পথে যাত্রা। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে যখন সমুদ্রের শহরের কাছাকাছি পৌঁছায় বাস, তখন দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তির মধ্যেও সবার চোখেমুখে দেখা দেয় নতুন জায়গা দেখার উচ্ছ্বাস।
কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর শুরু হয় পাঁচ দিন পাঁচ রাতের মূল ভ্রমণপর্ব।
প্রথম দিন: ট্রলারে মহেশখালীর পথে
সফরের প্রথম দিনেই ছিল ব্যতিক্রমী আয়োজন। টলারে করে মহেশখালীর উদ্দেশে যাত্রা করেন প্রেসক্লাবের সদস্যরা। নৌপথে চারপাশের জলরাশি, বাতাস আর দূরের পাহাড় দেখতে দেখতে টলারযাত্রাই হয়ে ওঠে দিনের অন্যতম আকর্ষণ।
মহেশখালী পৌঁছে একে একে ঘুরে দেখা হয় শুটিং ব্রিজ, আদিনাথ মন্দির, বড় রাখাইনপাড়া বৌদ্ধ মন্দির ও ঝাউবন।
আদিনাথ মন্দিরের ঐতিহ্য ও পাহাড়ি পরিবেশ, বড় রাখাইনপাড়া বৌদ্ধ মন্দিরের স্থাপত্য ও সংস্কৃতির ছাপ এবং ঝাউবনের সবুজ প্রকৃতি—সব মিলিয়ে প্রথম দিনেই প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের এক ভিন্ন স্বাদ পান ভ্রমণকারীরা।
টলারযাত্রা, নতুন জায়গা দেখা আর একসঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দে প্রথম দিনটি শেষ হয় নানা স্মৃতি নিয়ে।
দ্বিতীয় দিন: সমুদ্রের ঢেউয়ে হারিয়ে যাওয়া
দ্বিতীয় দিনটি ছিল সমুদ্রকেন্দ্রিক। দিনের শুরুতেই ঘুরে দেখা হয় শৈবাল বিচ। এরপর সুগন্ধা বিচ ও লাবণী বিচে সময় কাটান প্রেসক্লাবের সদস্যরা।
সমুদ্রের বিশাল জলরাশি আর ঢেউয়ের সঙ্গে মেতে ওঠেন সবাই। কেউ সৈকতের বালুচরে হাঁটেন, কেউ ছবি তোলেন, আবার কেউ নেমে পড়েন সাগরের পানিতে। সমুদ্রের ঢেউয়ে গোসল, বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আড্ডা আর দলবেঁধে ছবি তোলায় দ্বিতীয় দিনটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
সাংবাদিকতার ব্যস্ততায় সারাক্ষণ সংবাদ, ক্যামেরা ও নোটবুক নিয়ে ছুটে চলা তরুণদের সেদিন যেন অন্য এক রূপ। সংবাদ খোঁজার বদলে তারা খুঁজেছেন আনন্দের মুহূর্ত; শিরোনামের বদলে জমিয়েছেন স্মৃতি।
তৃতীয় দিন: চান্দের গাড়িতে মেরিন ড্রাইভ
তৃতীয় দিনের ভ্রমণে যুক্ত হয় নতুন রোমাঞ্চ। চান্দের গাড়িতে করে শুরু হয় মেরিন ড্রাইভ ভ্রমণ। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সাগরের বিশাল জলরাশি—দুই পাশের প্রকৃতির এই অপূর্ব মেলবন্ধন পথটিকেই করে তোলে ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।
পথে হিমছড়ি ও দড়িয়া বাড়িসহ বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখেন প্রেসক্লাবের সদস্যরা। পাহাড়ের ওপর থেকে সমুদ্রের বিস্তীর্ণ জলরাশি দেখা, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা আর চান্দের গাড়িতে দলবেঁধে ছুটে চলার অভিজ্ঞতা ভ্রমণে যোগ করে আলাদা মাত্রা।
মেরিন ড্রাইভের পথে একের পর এক দৃশ্য যেন ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী হতে থাকে। কারও হাতে মোবাইল, কারও হাতে ক্যামেরা—স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ধরে রাখার ব্যস্ততা ছিল সবার মধ্যেই।
শুধু ভ্রমণ নয়, সম্পর্কেরও নতুন ঠিকানা
পাঁচ দিন পাঁচ রাতের এই সফর শুধু দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ক্যাম্পাসে যাদের সঙ্গে প্রতিদিন সংবাদ, অ্যাসাইনমেন্ট ও নানা ব্যস্ততার কারণে দেখা হয়, তাদের সঙ্গে এবার পাওয়া যায় দীর্ঘ সময়।
একসঙ্গে পথ চলা, একই গাড়িতে যাত্রা, একসঙ্গে খাওয়া, আড্ডা, ছবি তোলা কিংবা কোনো ছোটখাটো সমস্যায় সবাই মিলে সমাধান খোঁজা—এসব মুহূর্ত প্রেসক্লাবের সদস্যদের সম্পর্ককে আরও গভীর করে।
ক্যাম্পাসে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় থাকলেও ভ্রমণের এই কয়েকটি দিনে সেই পরিচয়ের বাইরেও সবাই হয়ে ওঠেন ভ্রমণসঙ্গী, বন্ধু ও একে অপরের সহযাত্রী।
সাংবাদিকতার বাইরে অন্য এক শিক্ষা
এই সফর আনন্দের পাশাপাশি দিয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতাও। একজন সাংবাদিকের জন্য নতুন জায়গা দেখা মানে শুধু ঘোরাঘুরি নয়; বরং মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও পরিবেশকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ।
মহেশখালীর ঐতিহ্য, রাখাইন সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির ছাপ, পর্যটনকেন্দ্রিক কক্সবাজারের জীবনযাত্রা কিংবা মেরিন ড্রাইভের পাহাড়-সমুদ্র—সবকিছুই ভ্রমণকারীদের সামনে তুলে ধরে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যের ভিন্ন ভিন্ন চিত্র।
ফেরার পথে মন পড়ে থাকে সমুদ্রে
পাঁচ দিন পাঁচ রাতের আনন্দ শেষে এবার ফেরার পালা। কক্সবাজার থেকে বাসে করে ক্যাম্পাসের উদ্দেশে যাত্রা করেন প্রেসক্লাবের সদস্যরা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যখন ফেরার যাত্রা শুরু হয়, তখন সঙ্গে ছিল ব্যাগভর্তি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর মোবাইল-ক্যামেরায় জমে থাকা অসংখ্য ছবি। আর মনের ভেতর ছিল আরও বেশি স্মৃতি।
ফেরার পথে হয়তো কারও চোখে ঘুম, কারও হাতে মোবাইলের গ্যালারি, আবার কারও মনে তখনও ভাসছে সমুদ্রের ঢেউ। কক্সবাজার পেছনে পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু পাঁচ দিনের গল্পগুলো যেন আরও শক্ত করে জায়গা করে নিচ্ছিল মনে।
ময়মনসিংহ থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে বাসে কক্সবাজার, তারপর টলারে মহেশখালী, সমুদ্রের পানিতে গোসল, চান্দের গাড়িতে মেরিন ড্রাইভ—পাঁচ দিন পাঁচ রাতের এই সফর যেন একসঙ্গে অনেকগুলো ভ্রমণকাহিনি।
ক্যাম্পাসে ফিরে আবার শুরু হবে সেই চেনা ব্যস্ততা। সংবাদ সংগ্রহ, লেখা, ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট—সবই চলবে আগের মতো। কিন্তু ব্যস্ততার ফাঁকে কোনো একদিন যখন কক্সবাজারের ছবি চোখে পড়বে, তখন মনে পড়বে সেই টলারযাত্রা, সমুদ্রের ঢেউ, মেরিন ড্রাইভের পাহাড় কিংবা রাতের আড্ডা।
কারণ কিছু ভ্রমণ শেষ হয় গন্তব্যে ফিরে আসার সঙ্গে, আর কিছু ভ্রমণ শেষ হয় না কখনোই। সেগুলো থেকে যায় গল্প হয়ে, ছবির ফ্রেমে আর বন্ধুদের আড্ডায়।
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের পাঁচ দিন পাঁচ রাতের কক্সবাজার সফরও তেমনই—একটি ভ্রমণ, অসংখ্য গল্প আর আজীবন মনে রাখার মতো একগুচ্ছ স্মৃতি।
আরটিভি/ এসকেডি


