
দেশের অন্যতম বৃহৎ উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)। প্রায় ছয় দশকের পথচলায় শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সময়ের সঙ্গে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিভাগের সংখ্যা বেড়েছে। তবে, সেই তুলনায় অবকাঠামো সম্প্রসারণ না হওয়ায় আবাসন, শ্রেণিকক্ষসহ বিভিন্ন সংকটও তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি গবেষণা, আন্তর্জাতিক পরিসরে অবস্থান এবং সময়োপযোগী নতুন বিষয় চালুর মতো ক্ষেত্রগুলোতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১তম উপাচার্য হিসেবে ২০২৬ সালের মার্চে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সিনিয়র সহসভাপতি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সমস্যা ও সংকট, দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার পরিস্থিতি, সম্ভাবনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, গবেষণা এবং সরকারের কাছে প্রত্যাশাসহ নানা বিষয়ে আরটিভির চবি সংবাদদাতা আল আরাফের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
আরটিভি: উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়কে কী অবস্থায় পেয়েছিলেন? দায়িত্ব নেওয়ার পর আপনার সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
উপাচার্য: দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমে যেটা দেখেছি, বিশ্ববিদ্যলয়ের কাজের যে গতি, আমার গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করবে সে ধরনের লোকের খুবই অভাব। যার কারণে আমি কোনো সিদ্ধান্ত প্রদান করলে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। পরে আমি বিশ্লেষণ করে দেখলাম, আসলে কাজ না করার যে সংস্কৃতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে, এটি আমাদের অনেক সহকর্মীর ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাদের কাজের স্ট্রিমে ফিরিয়ে আনা এটা ছিল আমার প্রথম চ্যালেঞ্জ।
আরটিভি: বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সমস্যা বা সংকটগুলো কী? বিশেষ করে আবাসন ও অবকাঠামোর পরিস্থিতি কীভাবে দেখছেন?
উপাচার্য: দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ যেটা ছিল, গত ৯ বছর ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটিও ডিপিপি আসেনি। এক টাকাও নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবল বেড়েছে, শিক্ষকসংখ্যা বেড়েছে, ছাত্রসংখ্যা বেড়েছে, বিভাগের সংখ্যা বেড়েছে, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের সংখ্যাও বেড়েছে। এগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নয়নের কাজগুলো হওয়া উচিত ছিল।
এখন আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো আবাসন সংকট। ছাত্রী এবং ছাত্র উভয়ের জন্যই সংকট রয়েছে। আমাদের অনেকগুলো নতুন বিষয় বা বিভাগ খোলা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের জন্য অন্তত পাঁচটি ক্লাসরুম প্রয়োজন। যদি প্র্যাকটিক্যাল নাও থাকে, তাহলেও পাঁচটি বর্ষের জন্য পাঁচটি ক্লাসরুম প্রয়োজন হয়। একজন চেয়ারম্যান যেন বসতে পারেন, এমন একটি কক্ষের ব্যবস্থা করতে হবে। ১০ জন শিক্ষক যেন বসতে পারেন, তাদের জন্য ১০টি কক্ষেরও ব্যবস্থা করতে হবে। এই ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ না করেই বিভাগগুলো খোলা হয়েছে।
আমি যেহেতু দায়িত্ব নিয়েছি, আমি বুঝতে পেরেছি যে আমাদের অনেক সহকর্মী ও অনেক শিক্ষার্থীর আমার প্রতি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছেন, স্যারের কাছে গেলেই হয়তো চাইলেই এখনই হল পেয়ে যাবেন, এখনই সবকিছু হয়ে যাবে। আসলে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
আরটিভি: তাহলে আবাসন ও অবকাঠামো সংকট নিরসনে কী পরিকল্পনা নিয়েছেন?
উপাচার্য: তারপরও আমি যতটুকু সম্ভব গত ছয় মাসের মধ্যে দুটি প্রজেক্টকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে পেরেছি। প্রথমটি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি নির্মাণ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ৬০ বছরে কেউ কখনো চিন্তাও করেনি। হয়তো আমরা আগামী দুই মাসের মধ্যে টিএসসির কাজটা শুরু করতে পারব।
আরেকটি মূল প্রজেক্ট আমাদের ডিপিপি, যেখানে মেয়েদের একটি হল রেখেছি। সেখানে এক হাজার মেয়ে একসঙ্গে একটি হলে থাকতে পারবে। আমরা যদি এ বছরের মধ্যেই এই দুটি ডিপিপিকে আমাদের কাজের মধ্যে নিয়ে আসতে পারি, এর সঙ্গে আমরা পাইপলাইনের মধ্যে আরও অনেক প্রজেক্ট ঢুকিয়ে দিচ্ছি, যাতে এটার একটা ফ্লো থাকে। শিক্ষার্থী বাড়বে, বিভাগ বাড়বে সেই অনুযায়ী আমাদেরও প্রস্তুতি রাখতে হবে।
আরটিভি: সময়ের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে নতুন বিভাগ বা বিষয় চালুর বিষয়ে কী ভাবছেন?
উপাচার্য: আমাদের নিজস্ব কিছু বিভাগ এখন সময়ের দাবি। আইটি, এআই-বেজড সাবজেক্ট, ডেটা সায়েন্স এই সাবজেক্টগুলো এখন বুমিং সাবজেক্ট। এই সাবজেক্টগুলো থেকে আমরা আমাদের ছাত্রছাত্রীদের দূরে সরিয়ে রাখতে পারি না। ফলে এগুলো সময়ের দাবি।
আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও একটি বিষয় দরকার। সেটি হলো আমাদের নিজস্ব একটি মেডিকেল ফ্যাকাল্টি, যেখান থেকে আমরা এমবিবিএস ডিগ্রি দেব এবং একটি মেডিকেল ফ্যাসিলিটি থাকবে। এটি এখন সময়ের দাবি, প্রয়োজনের দাবি। এই কাজগুলো করার জন্য তো আমাদের ডিপিপি প্রয়োজন হবে।
আরটিভি: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাবনার জায়গাগুলো কোথায় দেখছেন? সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
উপাচার্য: বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় একটি সম্ভাবনার জায়গা এবং বিশ্ববিদ্যালয় আসলে সম্ভাবনা তৈরি করে। আমরা সেই জিনিসগুলোকে চিহ্নিত করেছি। যেমন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক বা কোনো ছাত্র বাইরে কোথাও গেলে, যাদের সঙ্গে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এমওইউ আছে, তাদের সঙ্গে আমাদের যৌথ প্রোগ্রাম করা যায়। কাদের সঙ্গে রিসার্চ ফ্যাসিলিটিজ ডেভেলপ করা যায় এ ধরনের কার্যকর কোনো সেল ছিল না।
আমি ইতোমধ্যে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স সেল পুনর্গঠন করেছি এবং দক্ষ পরিচালক ও উপপরিচালক নিয়োগ দিয়েছি।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় দুঃখ দেশের অন্যতম বৃহৎ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্বেও যখন ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিং হয়, আমরা দেখি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিংয়ে কোনো জায়গায় নেই। এজন্য এখন থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যেন ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিংয়ে ঢুকতে পারে, সেজন্য আমি ইনস্টিটিউশনাল র্যাঙ্কিং সেল গঠন করেছি। ইতোমধ্যেই এর পরিচালক এবং সহকারী পরিচালক নিয়োগ করেছি। তারা আগামীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিংয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করবেন।
শুধু সেটা নয়, আমি যে কাজটা করেছি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে গবেষণার উর্বর ক্ষেত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা না থাকলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি হচ্ছে গবেষণা। সেই গবেষণার স্পেকট্রাম যেন বাড়ে, গবেষণার পথ যেন আরও প্রসারিত হয়, সেজন্য আমরা থিসিসের শিক্ষার্থীদের জন্য এ বছর থেকে ছয় মাসের জন্য প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা করে শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছি।
আরটিভি: দায়িত্ব নেওয়ার সময় আপনি বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার চেয়ে সাড়ে তিনটার বাসের প্রতি বেশি নজর থাকে এবং গবেষণা বাজেটের বড় অংশ ফেরত যায়। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?
উপাচার্য: দেখুন, এমফিল গবেষক দুই বছরের জন্য প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা করে পাবেন। পিএইচডি গবেষক তিন বছরের জন্য প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা করে পাবেন। সেই সঙ্গে যিনি গবেষণা করাবেন, তার জন্যও আমরা সম্মানী রেখেছি।
আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বলি, গত বছর আমরা গবেষণার জন্য যে বাজেট পেয়েছিলাম, এ বছর আমরা তার চেয়ে প্রায় এক কোটি টাকা বেশি পেয়েছি। অন্যান্য সময়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণার ফান্ড ফেরত গিয়েছে। আমি যতটুকু জানি, এমনকি গত বছরও ফেরত গিয়েছে। আর এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ফান্ড ফেরত যাওয়ার তো কথাই নয়। যা দিয়েছে, তার চেয়েও আরও যাতে আমরা চাইতে পারি, আমরা সেই ব্যবস্থা করছি।
আমরা ওই ধরনের গবেষণা নিশ্চিত করতে চাই, যে গবেষণা দিয়ে দেশের কল্যাণ হবে। গবেষণা আমাদের ইকোনমিতে, আমাদের জিডিপিতে যোগ করবে, আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করবে যে গবেষণাটা প্রোডাক্টিভ গবেষণা। এর জন্য আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী গবেষণা সহায়তা ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত উন্নীত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সঙ্গে শিল্প খাতের সংযোগ তৈরিতে কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে?
উপাচার্য: আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও চমৎকার একটি আইডিয়া রয়েছে। এটি বর্তমান সরকারের প্রধান একটি চিন্তার ফসল। সেটি হলো, আমরা ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবরেশন নিশ্চিত করতে চাই। যে দেশে যত বেশি ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রং টাই থাকে, সে দেশে গবেষণার ক্ষেত্র তত উন্নত।
সেজন্য আমরা ইতোমধ্যে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সেল গঠন করেছি। আমরা পরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আগামী মাসের প্রথম দিকেই আমরা চট্টগ্রামের চেম্বার অব কমার্সের সঙ্গে বড় ধরনের একটি সমাবেশ করছি। সেখানে আমরা তাদের কীভাবে সাহায্য করে এগিয়ে যেতে পারি, তারাও কীভাবে আমাদের সহযোগিতা করতে পারে অথবা তাদের সমস্যাগুলো আমাদের কাছে নিয়ে আসতে পারে—সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।
আরটিভি: এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের কাছে আপনার চাওয়া বা প্রত্যাশা কী?
উপাচার্য: আমাকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন জিজ্ঞেস করেছেন, ‘ছয় মাস, আপনাদের প্রকল্প কই?’ আমাদের অর্থমন্ত্রী আমাদের জিজ্ঞেস করছেন, ‘আপনাদের প্রকল্প কেন আসছে না?’
সব জায়গা থেকেই আমরা একটা পজিটিভ রেসপন্স পাচ্ছি। অর্থাৎ আমরা যখনই আমাদের প্রকল্পগুলোকে ঠিক জায়গায় নিয়ে যেতে পারব, তখন সহযোগিতা পাব।
আমাদের অন্যান্য যে সকল সংসদ সদস্য মহোদয় রয়েছেন, তারাও আমাদের সহযোগিতা করার জন্য মুখিয়ে আছেন। যেমন সিনেটে তারা সরাসরি বলেছেন, ‘আপনাদের কী ধরনের সহযোগিতা লাগবে, আমাদের বলুন। প্রয়োজনে আমরা সবাই আপনার সঙ্গে যাব।’
সুতরাং এটি আমার জন্য বড় ধরনের একটি অনুপ্রেরণা। আমরা আশা করছি, সবার সহযোগিতা নিয়ে আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে যে স্বপ্নটা দেখছি, সেই জায়গায় নিয়ে যেতে পারব।
আরটিভি/এসএইচএম



