
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে (কুবি) একটি টেকসই ও সবুজ ক্যাম্পাস হিসবে গড়তে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্বন নিঃসরণ নেট-জিরোতে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো, পানি সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গতকাল ৩০ সেপ্টেম্বর (বুধবার) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে আয়োজিত ‘টেকসই গ্রিন ক্যাম্পাস’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব লক্ষ্য ও পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স সেল (আইকিউএসি) পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমান কর্মশালায় এসব পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
উপস্থাপনায় বলা হয়, নেট-জিরো লক্ষ্য অর্জনের প্রথম ধাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য, পরিবহন ও সবুজায়নসহ বিভিন্ন খাতের বর্তমান পরিস্থিতির ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করা হবে। বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে প্রচলিত বাতির পরিবর্তে এলইডি স্থাপন, ভবন ও স্থাপনায় জ্বালানি নিরীক্ষা এবং পর্যায়ক্রমে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ‘৩ই’ বা এনার্জি, ইকোনমি ও এনভায়রনমেন্ট মূল্যায়নে বছরে ৩১০ দশমিক ৭ মেগাওয়াট-ঘণ্টা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। এতে ২৫ বছরে ৭৫৩ দশমিক ৫ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ এড়ানো এবং ৩ লাখ ৩০ হাজার ৬৭৮ মার্কিন ডলার সাশ্রয়ের হিসাব দেওয়া হয়েছে।
কার্বন নিঃসরণ কমাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় উৎসস্থলেই জৈব, পুনর্ব্যবহারযোগ্য, অবশিষ্ট, ই-বর্জ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য আলাদা করা হবে। খাদ্য ও বাগানের বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি এবং কাগজ, প্লাস্টিক, ধাতু, কাচ ও ই-বর্জ্য অনুমোদিত পুনর্ব্যবহারকারীদের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি তিন বছরের মধ্যে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পানি ব্যবহারে অপচয় কমাতে নিয়মিত লিকেজ পরীক্ষা ও মেরামত, পানির মিটার স্থাপন এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। সবুজায়নের অংশ হিসেবে দেশীয় ও জলবায়ু-সহনশীল প্রজাতির গাছ লাগানো, পরিপক্ব গাছ সংরক্ষণ এবং ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্যের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরিবহন খাতে হাঁটা ও সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া, নিরাপদ হাঁটার পথ ও সাইকেল পার্কিং তৈরি, রাইড শেয়ারিং এবং পর্যায়ক্রমে কম-নিঃসরণকারী বা বৈদ্যুতিক যান ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্বন ফুটপ্রিন্ট হিসাব করে বিদ্যুৎ, জেনারেটরের জ্বালানি, যানবাহন, যাতায়াত, বর্জ্য ও কেনাকাটা থেকে সৃষ্ট নিঃসরণ পরিমাপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম তিন মাসের মধ্যে গ্রিন ক্যাম্পাস স্টিয়ারিং কমিটি গঠন, সমন্বয়ক নিয়োগ এবং বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য, পরিবহন, সবুজায়ন ও পাঠ্যক্রমের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করা হবে। পরবর্তী সময়ে গ্রিন ক্যাম্পাস নীতি অনুমোদন, বর্জ্য বিন স্থাপন, পানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী কার্যক্রম, জ্বালানি নিরীক্ষা, এলইডি স্থাপন, বৃক্ষ ও জীববৈচিত্র্য জরিপ এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথম বছরে নির্বাচিত ভবনগুলোতে ৫ থেকে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো, ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ প্রচলিত বাতি এলইডিতে পরিবর্তন, শনাক্ত হওয়া বড় পানির লিকেজের ৯০ শতাংশ মেরামত, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ক্রয় ৩০ শতাংশ কমানো এবং রোপণ করা দেশীয় গাছের অন্তত ৮০ শতাংশ টিকিয়ে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমের অগ্রগতি মাসিকভাবে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রতিবছর ‘গ্রিন ক্যাম্পাস সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট’ প্রকাশের প্রস্তাবও রয়েছে।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন।
এছাড়া বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. জসিম উদ্দিন আহমেদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম. আতিউর রহমান, অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদিন সিদ্দিক, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবিব, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শফি মোহাম্মদ তোরেক, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হায়দার। এছাড়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগের চেয়ারম্যান ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আরটিভি/ এসকেডি




