
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (চাকসু) ও সাজিনাজ হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত মেডিকেল ক্যাম্প স্থগিত হওয়াকে কেন্দ্র করে চাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সাঈদ বিন হাবিব ও সহ সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) আইয়ুবুর রহমান তৌফিকের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে।
জিএসের হস্তক্ষেপে মেডিকেল ক্যাম্প স্থগিত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এজিএস। তবে অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করে তা প্রমাণ করতে পারলে ১০ কোটি টাকা পুরস্কার দেওয়ার পাশাপাশি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন জিএস।
পাল্টা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন এজিএস।
শনিবার (১০ অক্টোবর) মেডিকেল ক্যাম্প স্থগিতের পর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পৃথক পোস্টে দুজনের মধ্যে এই বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। পরে গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া বক্তব্যেও তারা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।
জানা যায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে চাকসু ও সাজিনাজ হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে একটি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিল। তবে শনিবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পটি স্থগিত করে। এরপরই কর্মসূচি স্থগিতের কারণ ও এর আয়োজনের ক্ষেত্রে কার কী ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে চাকসুর জিএস ও এজিএসের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।
চাকসুর এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিকের দাবি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছিল। এমনকি ক্যাম্পের জন্য নির্ধারিত স্থানেও প্রস্তুতিমূলক কাজ চলছিল। কিন্তু জিএসের হস্তক্ষেপে ক্যাম্পটি স্থগিত করা হয়েছে। এতে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, এজিএসের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে চাকসুর জিএস সাঈদ বিন হাবিব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ১০ কোটি টাকার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।
তার দাবি, তিনি নিজে কিংবা তার মাধ্যমে অন্য কেউ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ফোন করে মেডিকেল ক্যাম্প স্থগিত করেননি। এ ধরনের কোনো ঘটনার প্রমাণ দিতে পারলে তিনি চাকসুর সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরে দাড়াবেন এবং পৈতৃক সম্পদ বিক্রি করে হলেও এজিএসকে ১০ কোটি টাকা দেবেন।
জিএসের এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অডিও রেকর্ড প্রকাশ করেন এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক। প্রকাশিত পোস্টে তিনি অডিওতে অপর প্রান্তের বক্তাকে সাজিনাজ হাসপাতালের পরিচালক হাসান মাহমুদ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।
প্রকাশিত অডিওতে মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজনের প্রাথমিক যোগাযোগ ও বৈঠকের বিষয়ে দুজনকে কথা বলতে শোনা যায়। কথোপকথনের একপর্যায়ে এজিএস বলেন, ‘উনি ১০ কোটি টাকার চ্যালেঞ্জ লিখছে সোশ্যাল মিডিয়াতে যে, যদি প্রমাণ করতে পারি।
এর জবাবে হাসান মাহমুদ হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি বলেন, কে বলছে, তোমাদের একটু বুঝাই বলি। আমাকে ফোন করছিল, তোমাদের কালো করে মোটা করে একটা ছেলে আছে না?
তখন এজিএস বলেন, ‘হ্যাঁ, স্বাস্থ্য সম্পাদক।’ জবাবে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘এই ওই ফোন করছিল।’
কথোপকথনের একপর্যায়ে মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজনের ক্ষেত্রে নিজের ভূমিকা অস্বীকার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন এজিএস। তিনি বলেন, ‘কিন্তু দেখেন, আসলে আমি আপনাদের সাথে যোগাযোগ করছি। উনি বলতেছে যে, উনারা নিজেরাই যোগাযোগ করছে। মানে উনি এই জায়গায় আমার অবদান অস্বীকার করতেছেন। তো এইটা আমার খারাপ লাগবে না, বলেন?’
এর জবাবে অপর প্রান্তের ব্যক্তি বলেন, ‘স্বাভাবিক, স্বাভাবিক। এ তো অবশ্যই।’
পরে মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজনের প্রাথমিক যোগাযোগ ও বৈঠক কিভাবে হয়েছে সেটি তুলে ধরে হাসান মাহমুদ হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘এইডা তো সিকোয়েন্স কী বলে? সিকোয়েন্স হলো যে, তুমি আসছিলা, কথা বলছো, তারপর আমি আমরা ওদেরকে বললাম যে, তোমরা আসো, তোমরা আসলা, কথা বললা, ওইখানের ভিতরে সবাই একসাথে বসলো।’
এ বিষয়ে চাকসু এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক আরটিভি নিউজকে বলেন, সাধারণ সম্পাদক সাঈদ বিন হাবিব যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, আমি তা গ্রহণ করছি। এ সংক্রান্ত কল রেকর্ডও প্রকাশ করছি। সাধারণত কারও ব্যক্তিগত ফোনালাপ রেকর্ড বা প্রকাশ করা উচিত নয়। কিন্তু তিনি নিজেই একটি কল রেকর্ড প্রকাশ করেছেন। তাই আমিও বাধ্য হয়ে কল রেকর্ড প্রকাশ করছি। আশা করি, এর মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সবার কাছে স্পষ্ট হবে।
মেডিকেল ক্যাম্প স্থগিতের জন্য জিএসকে দায়ী করে তিনি বলেন, এই মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছিল শিক্ষার্থীদের স্বার্থে। এতে আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইনি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। চাকসুতে দায়িত্ব পালনকালে আমি অনেক উদ্যোগ নিতে চেয়েছি। কিন্তু পারস্পরিক যোগাযোগ ও সমন্বয়ের অভাবে অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তারা কোনো বিষয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন না। বলা যায়, চাকসু চলছে তাদের মতো করে, আর আমি আমার জায়গা থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।
এজিএস আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যতটুকু সম্ভব, আমি কাজ করার চেষ্টা করেছি। এবার সবাইকে সম্পৃক্ত করে, চাকসুর অন্য সম্পাদকদের সঙ্গে নিয়ে একটি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু সেটি জিএসের পছন্দ হয়নি। ফলে তিনি তা বন্ধ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে আসা প্রয়োজন। এ কারণেই আমি তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছি এবং সংশ্লিষ্ট কল রেকর্ড প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
অন্যদিকে, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি করে চাকসুর সাধারণ সম্পাদক সাঈদ বিন হাবিব বলেন, ‘রাজনীতিকে এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়িয়ে ফেলা অত্যন্ত বিব্রতকর। দীর্ঘদিন পর একেবারে শেষ সময়ে এসে আমাকে নিয়ে এমন বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে আমার কোনো কথাই হয়নি। এর প্রমাণও আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছি।
এজিএসের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলে জিএস বলেন, তৌফিক গত এক বছরে চাকসুর কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখেনি। মাঝেমধ্যে চাকসুতে এসেছে এবং প্রশাসনের সঙ্গে কিছু আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। এর বাইরে তার কার্যক্রম কতটা ছিল, সেটি শিক্ষার্থীরাই বিবেচনা করবেন। তবে আমি ফোন করে কোনো কার্যক্রম বন্ধ করিয়েছি বলে সে যে অভিযোগ করেছে, তা স্পষ্ট মিথ্যাচার।
অভিযোগ প্রমাণের চ্যালেঞ্জ পুনর্ব্যক্ত করে সাঈদ বিন হাবিব বলেন, আমি তাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছি, সে যদি প্রমাণ করতে পারে যে আমি ফোন করে ওই কার্যক্রম বন্ধ করিয়েছি, তাহলে তাকে ছোট ভাই হিসেবে ১০ কোটি টাকা উপহার দেব এবং চাকসুর সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকেও পদত্যাগ করব। একই সঙ্গে তাকেও এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছি। নিজের অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দিতে না পারলে তাকে ক্ষমা চাইতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বিব্রতকর বিষয় হলো, শেষ সময়ে এসে তৌফিক এমন একটি বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছে, যেন আমার সঙ্গে তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। বাস্তবে এমন কোনো পরিস্থিতি নেই। সে তার মতো কাজ করেছে, আমি আমার মতো কাজ করেছি। অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে আমাকে জড়িয়ে নিজের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা দুঃখজনক। ছোট ভাই হিসেবে তাকে বলব, মিথ্যা অভিযোগ করে এই সুন্দর সময়টাকে নষ্ট করো না।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের চাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোটের’ প্রার্থীরা জয়ী হন। অন্যদিকে, সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে জয় পান ছাত্রদল সমর্থিত প্রার্থী আইয়ুবুর রহমান তৌফিক। ভিন্ন রাজনৈতিক প্যানেল থেকে নির্বাচিত এই দুই প্রতিনিধির মধ্যে এর আগেও চাকসু ভবনে বসার কক্ষ নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছিল। এবার মেডিকেল ক্যাম্প স্থগিতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁদের সেই বিরোধ নতুন করে সামনে এসেছে।
আরটিভি/এসআর




