ঢাকা বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

‘উঠোন পাঠশালা’ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৬ পিএম
ছবি : আরটিভি

করোনার সময় চারদিকে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, তখন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে রাখার বিকল্প পথ খুঁজছিলেন নুরুল করিম। শ্রেণিকক্ষের বদলে কখনো শিক্ষার্থীদের বাড়ির উঠোনে মাদুর বিছিয়ে, কখনো ছাদে, আবার কখনো মাঠে বসে চলত পড়াশোনা। সেই উদ্যোগের নাম হয়ে ওঠে ‘উঠোন পাঠশালা’। নীলফামারী সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নেওয়ার এই পাঠশালায় ছিল না নির্দিষ্ট কোনো ফি। ছিল উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।

শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিসিএস দেননি নুরুল করিম। ইচ্ছা ছিল সাধারণ ক্যাডারে চাকরি করার। তবে বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুযোগ পেয়ে যোগ দেন নীলফামারী সরকারি কলেজে। শুরুতে হতাশ ছিলেন তিনি। ক্যাডার পরিবর্তনের আশায় আবারও বিসিএস দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বদলে যেতে থাকে তার ভাবনা। শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের বাইরেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য সময় দিতে শুরু করেন। সেই শুরু, যা একসময় বহু শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতির অংশ হয়ে ওঠে।

নিজের শৈশবের শিক্ষা থেকে অন্যদের পাশে

বরিশালের হিজলা উপজেলার পূর্ব কৃষ্ণপুর গ্রামে নুরুল করিমের জন্ম। নদীবেষ্টিত প্রত্যন্ত এই গ্রামে কৃষক বাবার সংসারে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় শিক্ষকদের কাছ থেকে বিনামূল্যে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। সকাল থেকে বিকেল, কখনো রাতেও শিক্ষকেরা তাকে পড়াতেন।

শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওয়া সেই সহায়তা তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্য শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে সেই শিক্ষার প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

২০১২ সালে ফয়সাল মাহদী সবুজকে পড়ানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার বিনা মূল্যে শিক্ষাদানের উদ্যোগ। সবুজ এখন বাংলাদেশ পুলিশের সার্জেন্ট। সেই সময় থেকেই নিজের সরকারি বেতনে সংসার চালিয়ে শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন নুরুল করিম। কলেজের ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা তার বিভাগের কক্ষে এসে পড়ত। প্রচলিত কোচিংয়ের মতো নির্দিষ্ট ফি দিয়ে পড়ার ব্যবস্থা ছিল না। তার কাছে শিক্ষার্থীদের পড়ানো ছিল নিজের দায়িত্ববোধ থেকে নেওয়া একটি উদ্যোগ।

পরে তার কোচিংয়ের নাম হয় ‘ড্রিম টু ডিইউ’। নামের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন থাকলেও তার শিক্ষার্থীরা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তির সুযোগ পেতে থাকে।

একেকটি সাফল্য, একেকটি স্বপ্নপূরণ

নুরুল করিমের হিসাবে, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেত। কোনো কোনো বছর এ সংখ্যা ৬০ ছাড়িয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর গড়ে ১২ থেকে ১৩ জন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেয়েছে বলে জানান তিনি।

২০১৭ সালের একটি ব্যাচ থেকে প্রায় ১৬ জন শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। আর ২০২৩ সালের ব্যাচে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েছিল ৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থী। তবে এসব সাফল্যের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান তার কাছে নেই।

তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে মো. ফরিদুলের সাফল্যও উল্লেখযোগ্য। নুরুল করিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ৯৪ দশমিক ২০ নম্বর পেয়ে মেধাতালিকায় প্রথম হন ফরিদুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায়ও ১০৬তম স্থান অর্জন করেন তিনি। ফরিদুলের ফলাফলের স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করে রেখেছেন নুরুল করিম।

তবে তার কাছে সাফল্যের অর্থ শুধু ভর্তি পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়। প্রথমবার ব্যর্থ হওয়া শিক্ষার্থীদেরও আবার চেষ্টা করতে উৎসাহ দিতেন তিনি। কেউ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরও শ্রেণিকক্ষে দেখা হলে দ্বিতীয়বার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিতেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এমন অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।

শুধু পড়ানো নয়, পড়াশোনা চালিয়ে রাখার লড়াই

প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্নের পাশাপাশি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থের অভাব। নুরুল করিমের উদ্যোগ তাই ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার খরচ জোগাতে না পেরে যারা পড়াশোনা ছেড়ে দিতে চাইত, তাদের জন্যও সহায়তার ব্যবস্থা করেছেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা সংগ্রহ করেছেন। একটি মেয়ের জন্য দেড় লাখ টাকা সহায়তা জোগাড় করার কথাও জানান তিনি।

তবে এসব সহায়তার কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব তার কাছে নেই। সহায়তাকারীরা সরাসরি শিক্ষার্থীদের হাতে টাকা দিতেন। ফলে কতজন শিক্ষার্থী তার উদ্যোগে আর্থিক সহায়তা পেয়েছে, তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানও নেই।

শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই এগিয়েছে পাঠশালা

নুরুল করিমের কাছে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ পরে অন্যদের পড়ানোর দায়িত্বও নিয়েছে। আবির, রাকিব, ইভান ও বাদশাহ ছুটিতে বাড়ি এলে অন্য শিক্ষার্থীদের পড়াতেন। তাদের মধ্যে প্রথম দুজন এখন চাকরি করছেন।

এভাবে তার কাছে পড়া শিক্ষার্থীদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে, কেউ পড়াশোনা চালিয়ে গেছে, আবার কেউ অন্যদের এগিয়ে নেওয়ার কাজে যুক্ত হয়েছে। তবে বর্তমানে আগের মতো আর পাঠদান করতে পারছেন না নুরুল করিম। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে পদায়নের পর প্রায় এক বছর ধরে তার এই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

নিজের উদ্যোগের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক পুরস্কার বা স্বীকৃতি পাননি নুরুল করিম। স্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেই তার। যত দিন ভালো লাগবে, তত দিন এ ধরনের কাজ করে যেতে চান তিনি।

নুরুল করিমের মতে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বড় বাধাগুলোর একটি হলো উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার অভাব। তার কাছে পড়া শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং কর্মজীবনে প্রবেশের গল্পগুলোই এখন পর্যন্ত এই উদ্যোগের দৃশ্যমান ফল।

একসময় নিজের শিক্ষকদের কাছ থেকে বিনা মূল্যে পাঠ নেওয়া নুরুল করিম সেই শিক্ষা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কখনো কলেজের বিভাগের কক্ষে, কখনো শিক্ষার্থীদের বাড়ির উঠোনে মাদুর বিছিয়ে চলেছে তার পাঠদান। সেই পাঠশালার পেছনে ছিল প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখানো এবং সেই স্বপ্ন পূরণের পথে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা।

প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি কিংবা স্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র না থাকলেও তার উদ্যোগের গল্প ছড়িয়ে আছে শিক্ষার্থীদের সাফল্য ও এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতায়। উঠোনের সেই পাঠশালা তাই কেবল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জায়গা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখানো, ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করতে শেখানো এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ানোর এক প্রচেষ্টা।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
মন্ত্রীর হাতে পুরস্কার পেলেন শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ‘মেধাবী সন্তান’, গবেষকদের ভাগ্যে জুটল ফটোসেশন
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সন্তানরা। 
মন্ত্রীর হাতে পুরস্কার পেলেন শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ‘মেধাবী সন্তান’, গবেষকদের ভাগ্যে জুটল ফটোসেশন
বাংলাদেশ-উইন্ডিজ টেস্ট সিরিজে টিম অ্যানালিস্ট হলেন সাবেক রুয়েটিয়ান অনিক নিয়োগী
বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাঝে অনুষ্ঠিতব্য টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের টিম অ্যানালিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সাবেক শিক্ষার্থী অনিক নিয়োগী।
বাংলাদেশ-উইন্ডিজ টেস্ট সিরিজে টিম অ্যানালিস্ট হলেন সাবেক রুয়েটিয়ান অনিক নিয়োগী
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে মঞ্চ মাতাবেন জেমস
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের আয়োজনে গান শোনাতে আসছেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী জেমস। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ২ নভেম্বর (সোমবার) ক্যাম্পাসে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে প্রশাসন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে মঞ্চ মাতাবেন জেমস
১ জানুয়ারি নয়, ২৪ ডিসেম্বরই নতুন পাঠ্যবই পাবে শিক্ষার্থীরা
অনেক বছর ধরে ১ জানুয়ারি দেশজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশে ‘বই উৎসব’ পালন করে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। তবে এবার সেই চেনা ছক ভেঙে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনই শিক্ষার্থীদের হাতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নতুন বই তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
১ জানুয়ারি নয়, ২৪ ডিসেম্বরই নতুন পাঠ্যবই পাবে শিক্ষার্থীরা
নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলাকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনায় সুষ্ঠ বিচারের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে মানববন্ধন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন
আরও পড়ুন
রাস্তা দখল করে রেখেছেন ছাত্রলীগ নেতা, ঘটনা কী
যৌনকর্মী নিয়ে দ্বন্দ্ব, রাতে ‘তুলকালাম কাণ্ড’
মাদকব্যবসার প্রতিবাদ করায় মামলার মুখে এলাকাবাসী, ক্ষোভে মানববন্ধন
‘ডিসেম্বরে খেলা হবে’ স্লোগান দিয়ে রাতের আঁধারে ছাত্রলীগের মিছিল