
তিন দশকের বেশি সময় ধরে টেলিভিশন, মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শকের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন সমু চৌধুরী। অভিনয়জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনে প্রিয়জন হারানোর বেদনা, পারিবারিক দায়িত্ব ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। মায়ের দেখাশোনার কথা ভেবে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া এই অভিনেতার জীবন এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
১৯৬৪ সালের ৮ জুন যশোরে জন্মগ্রহণ করেন সমু চৌধুরী। ছাত্রজীবনেই যশোর উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। সেখানে প্রায় ১০ বছর পথনাটক, মঞ্চনাটক ও গণসংগীতে অংশ নেন। পরে ঢাকা উদীচী, ঢাকা থিয়েটার ও নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের সঙ্গেও কাজ করেন।
১৯৯০ সালের ২২ মার্চ আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় ‘সমৃদ্ধ অসীম’ নাটকের মাধ্যমে বাংলাদেশ টেলিভিশনে অভিষেক হয় তার। প্রথম নাটকে অভিনয়ের জন্য সম্মানী পেয়েছিলেন ৭০০ টাকা। এরপর ‘জন্মভূমি’, ‘বিবর্ণ প্রজাপতি’, ‘কালো জোছনা’, ‘রঙের মানুষ’, ‘নিশিকুটুম্ব’ ও ‘উঠোন’সহ অসংখ্য নাটকে অভিনয় করে পরিচিতি পান এই অভিনেতা।
১৯৯৫ সালে আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘আদরের সন্তান’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় যাত্রা শুরু করেন সমু চৌধুরী। পরবর্তী সময়ে ‘মায়ের অধিকার’, ‘দেশ দরদী’, ‘সুন্দরী বধূ’, ‘নদীর নাম মধুমতী’, ‘গলুই’ ও ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ওটিটি মাধ্যমেও কাজ করেছেন এই অভিনেতা। ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’ ও ‘নয়া নোট’-এর মতো কাজেও দেখা গেছে তাকে।
তবে অভিনয়জীবনে সব সময় সমানভাবে সক্রিয় থাকতে পারেননি সমু চৌধুরী। একপর্যায়ে প্রায় তিন বছর অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন তিনি। ঢাকার কর্মব্যস্ততা ছেড়ে চলে যান যশোরের গ্রামের বাড়িতে। পরে শিল্পী ঐক্য জোটের মাধ্যমে আবারও অভিনয়ে ফেরেন।
সমু চৌধুরীর ব্যক্তিজীবনের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি ১৯৯৩ সালের ২৬ জুলাইয়ের সড়ক দুর্ঘটনা। ওই দুর্ঘটনায় বাবা আবুল কাশেম চৌধুরী ও ছোট বোন রোজিনা চৌধুরী রুবিকে হারান তিনি। যশোরের নাভারন থেকে ফেরার পথে ঝিকরগাছা এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। পরে ২০১৮ সালে ছোট ভাই সনু চৌধুরীকেও হারান এই অভিনেতা।
পরপর প্রিয়জনদের হারানোর বেদনার পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বও এসে পড়ে তার কাঁধে। এক সাক্ষাৎকারে সমু চৌধুরী জানিয়েছিলেন, মায়ের দেখাশোনার কথা বিবেচনা করেই বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ব্যক্তিজীবনে অবিবাহিত এই অভিনেতার জীবনে মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালের জুনে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার মুখী শাহ মিসকিন মাজারে গামছা পরা অবস্থায় সমু চৌধুরীর একটি ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। পরে অভিনেতা জানান, ওরস উপলক্ষে সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। কাপড় শুকানোর সময় গামছা পরে গাছের নিচে বিশ্রাম নেওয়ার একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল।
এ ঘটনায় তার স্বজন ও অভিনয়শিল্পী সংঘের সদস্যরা সেখানে যান। পরে পুলিশ তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। এরপর যশোরে মায়ের কাছে ফিরে যান তিনি।
এরপর ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর যশোর শহরের বেজপাড়া নলডাঙ্গা সড়কের নতুন বাজার এলাকায় নিজের বাড়ির সামনে হামলার শিকার হন সমু চৌধুরী। ঘটনাটি তার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
একসময় টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় করে দর্শকের ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন এই শিল্পী। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করলেও ব্যক্তিজীবনে তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে একের পর এক কঠিন পরিস্থিতি। সাম্প্রতিক সময়ে তার জীবনযাপনের বিভিন্ন দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় কেউ কটূক্তি করছেন, আবার কেউ তার পরিস্থিতি দেখে প্রকাশ করছেন আক্ষেপ।
তবে একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিকূলতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তার প্রতি মানবিকতা ও সম্মান বজায় রাখাও জরুরি। দীর্ঘদিনের অভিনয়জীবন, প্রিয়জন হারানোর বেদনা এবং মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ সব মিলিয়ে সমু চৌধুরীর জীবন যেন সাফল্য ও সংগ্রামের এক ভিন্ন গল্প।
আরটিভি/এসকে



