
প্রেম, বিশ্বাস আর স্বপ্নের পথে হেঁটে দীর্ঘ ৮৪ বছর ধরে একসঙ্গে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার বাসিন্দা এলেনর গিটেনস ও তাঁর স্বামী লাইল গিটেনস। এলেনরের বয়স এখন ১০৭ এবং লাইলের বয়স ১০৮ বছর। ১৯৪২ সালের ৪ জুন গাঁটছড়া বাঁধা এই জুটি বিশ্বজুড়ে দীর্ঘতম দাম্পত্য জীবনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
অসংখ্য সম্পর্ক যেখানে অল্পতেই ভেঙে যায়, সেখানে তাদের সম্পর্ক যুগ-যুগ ধরে একসঙ্গে থাকার এক নীরব রহস্যের সন্ধান দেয়।
১৯৪১ সালের এক সন্ধ্যায় ক্লার্ক আটলান্টা ইউনিভার্সিটিতে বাস্কেটবল খেলা দেখতে গিয়েছিলেন এলেনর। সেখানেই পরিচয় হয় খেলোয়াড় লাইলের সঙ্গে। সেই রাতটি খেলায় কে জিতেছিল, তা এলেনর ভুলে গেলেও ভোলেননি লাইলের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের সেই মুহূর্ত। দ্রুতই তাদের সম্পর্ক প্রেমে গড়ায়।
তবে তাদের ভালোবাসার পথ মসৃণ ছিল না। বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজলে লাইল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। স্বল্প সময়ের জন্য প্রশিক্ষণ থেকে তিন দিনের ছুটি নিয়ে লাইল ১৯৪২ সালের ৪ জুন এলেনরকে বিয়ে করেন এবং তড়িঘড়ি করে ঘাঁটিতে ফিরে যান।
বিয়ের পরপরই লাইলকে সেনাবাহিনীর ৯২তম পদাতিক ডিভিশনের সঙ্গে ইতালিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এদিকে এলেনর তখন সন্তানসম্ভবা এবং তীব্র অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন।
তিনি নিউইয়র্ক সিটিতে চলে যান, যেখানে প্রথমবারের মতো লাইলের পরিবারের সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখানে একটি উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ নিয়ে তিনি নিজের জীবন নির্বাহের পাশাপাশি লাইলের পরিবারকেও আর্থিকভাবে সহায়তা করতে থাকেন। ভৌগোলিক দূরত্ব এবং সীমিত যোগাযোগের সেই কঠিন সময়ে তাদের ভরসা ছিল চিঠি, যা সেনাবাহিনী সেন্সর করে অধিকাংশ বক্তব্যই কালো কালির আঁচড়ে ঢেকে দিত।
এলেনর মজা করে বলেছিলেন, লাইলের চিঠিতে শব্দের চেয়ে কালো কালির আঁচড়ই থাকত বেশি; কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত লাইনগুলোই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর লাইল ফিরে এলে নিউইয়র্কে তাদের নতুন করে যৌথ জীবন শুরু হয়। দুজনেই নিউইয়র্কের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। পেশাগত ব্যস্ততা সত্ত্বেও তারা সব সময় একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ খুঁজে নিতেন।
সময়-সুযোগ পেলেই তারা ভ্রমণে বেরিয়ে পড়তেন, বিশেষ করে এলেনরের প্রিয় জায়গা ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের গুয়াদেলুপে। শুধু তাই নয়, বয়স বাড়লেও তাদের নতুন কিছু শেখার আগ্রহে ভাটা পড়েনি। এলেনর ৬৯ বছর বয়সে ফোর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটি থেকে আরবান এডুকেশনের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য অনুসারে, তারা বর্তমানে মায়ামিতে মেয়ে অ্যাঞ্জেলার সঙ্গে বাস করেন এবং ক্লার্ক আটলান্টা ইউনিভার্সিটির সক্রিয় সদস্য হিসেবে রয়েছেন।
দীর্ঘ দাম্পত্যের রহস্য নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তাদের উত্তর ছিল একেবারেই সরল ও সাদামাটা। লাইল ও এলেনরের মতে, এর পেছনে কোনো গভীর গোপন সূত্র নেই; বরং রয়েছে একে-অপরকে নিঃশর্ত ভালোবাসা, ধৈর্য এবং সব পরিস্থিতিতে একসঙ্গে থাকার তীব্র ইচ্ছা।
লাইল সহজভাবে বলেন, আমরা একসঙ্গে সময় কাটাই। একসঙ্গে আমরা অনেক কিছু করেছি।
এলেনরও একই প্রতিধ্বনি করে বলেন, আমরা পরস্পরকে ভালোবাসি।
লাইলের কণ্ঠেও একই কথা, আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসি।
এই সরল স্বীকারোক্তিই প্রমাণ করে—দীর্ঘ দাম্পত্যের মূল ভিত্তি কোনো জটিল সমীকরণ নয়, বরং নিরেট ভালোবাসা ও একে অপরের প্রতি যত্ন। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস
আরটিভি/এএইচ




