
চাঁদ কেন পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে? গ্রহগুলো কীভাবে নির্দিষ্ট পথে ঘোরে? কোনো বস্তু পড়ার সময় তার গতি কীভাবে বদলায়? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ২৪ বছর বয়সেই গণিতের জগতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন। ১৬৬৫ সালের দিকে তার হাত ধরে বিকশিত হয় ক্যালকুলাস, যা পরবর্তীতে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।
নিউটনের আগে কোনো বস্তুর পরিবর্তনশীল গতি বা সময়ের সঙ্গে তার পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করার জন্য প্রয়োজনীয় গাণিতিক কাঠামো ছিল না। বিশেষ করে পড়ন্ত বস্তুর গতি প্রতি মুহূর্তে কীভাবে বাড়ছে—এ প্রশ্নের গাণিতিক ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়েই নিউটন নতুন ধরনের গণিতের প্রয়োজন অনুভব করেন।
গতি বুঝতে গিয়ে নতুন গণিতের জন্ম
নিউটন মূলত গতি ও মহাকর্ষ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেন, কোনো বস্তু পড়ার সময় তার গতি প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়। আবার গ্রহ ও চাঁদের গতিও একইভাবে পরিবর্তনশীল।
এই পরিবর্তনকে নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে নিউটন পরিবর্তনের হার নিয়ে কাজ শুরু করেন। সেখান থেকেই ক্যালকুলাসের ধারণা গড়ে ওঠে।
ক্যালকুলাসের সাহায্যে তিনি শুধু পড়ন্ত বস্তুর গতি নয়, গ্রহগুলোর গতিপথও ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হন। তিনি দেখান, সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণের কারণে গ্রহগুলো উপবৃত্তাকার পথে ঘোরে। একই মহাকর্ষ পৃথিবীর মানুষ ও বস্তুকে মাটির দিকে টেনে রাখে এবং চাঁদকে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে সাহায্য করে।
অর্থাৎ পৃথিবীতে কোনো বস্তু পড়ে যাওয়ার পেছনে যে মহাকর্ষ কাজ করে, একই শক্তি মহাকাশে গ্রহ ও চাঁদের গতির সঙ্গেও যুক্ত—নিউটনের গবেষণায় এই সম্পর্ক স্পষ্ট হয়।
কী এই ক্যালকুলাস?
সহজভাবে বললে, সময়ের সঙ্গে কোনো কিছুর পরিবর্তন কীভাবে ঘটছে, তা বোঝার গণিতই ক্যালকুলাস।
এর দুটি প্রধান অংশ রয়েছে। একটি হলো পরিবর্তনের হার নির্ণয়, অন্যটি হলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ যোগ করে মোট পরিমাণ বের করা।
সাধারণ বীজগণিতে দুটি বিন্দুর মধ্যে সরলরেখার ঢাল বের করা যায়। কিন্তু কোনো রেখা বাঁকা হলে তার প্রতিটি বিন্দুতে ঢাল এক রকম থাকে না। সেই বাঁকা রেখার কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে পরিবর্তনের হার বের করতে ক্যালকুলাস প্রয়োজন হয়।
আবার কোনো বাঁকা রেখার নিচের জায়গার পরিমাণ বের করতেও ক্যালকুলাস ব্যবহার করা হয়। এজন্য বাঁকা অংশটিকে অসংখ্য ক্ষুদ্র আয়তক্ষেত্রে ভাগ করে হিসাব করা যায়। আয়তক্ষেত্রগুলো যত ছোট করা হয়, মোট হিসাব তত নির্ভুল হয়।
শুধু গণিত নয়, বদলে দিয়েছে পুরো বিজ্ঞান
ক্যালকুলাস আবিষ্কারের পর এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, অর্থনীতি, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রকৌশলসহ নানা ক্ষেত্রে।
যেসব বিষয়ে সময়ের সঙ্গে কোনো কিছুর পরিবর্তন ঘটে, সেখানেই ক্যালকুলাস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যানবাহনের গতি, শব্দ, আলো, বিদ্যুৎ, প্রকৌশল নকশা, চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন হিসাব এবং অর্থনৈতিক পূর্বাভাসেও এর ব্যবহার রয়েছে।
এমনকি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বগুলোর ক্ষেত্রেও ক্যালকুলাস অপরিহার্য। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বেও স্থান ও সময়ের পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে ক্যালকুলাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নিউটন একা নন
ক্যালকুলাসের বিকাশ নিয়ে জার্মান গণিতবিদ গটফ্রিড ভিলহেল্ম লাইবনিজের সঙ্গেও নিউটনের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। কে আগে ক্যালকুলাসের ধারণা তৈরি করেছিলেন, তা নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল।
তবে নিউটনের কাজ লাইবনিজের কাজের কয়েক বছর আগেই শুরু হয়েছিল। অন্যদিকে ক্যালকুলাসের বিভিন্ন প্রতীক ও প্রকাশভঙ্গি তৈরিতে লাইবনিজের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। পরবর্তীতে দুই বিজ্ঞানীর কাজের ওপর ভিত্তি করে ক্যালকুলাস আরও উন্নত হয়েছে।
প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও ক্যালকুলাসের গুরুত্ব কমেনি। বরং আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অসংখ্য আবিষ্কারের পেছনে এটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
এক কথায়, চাঁদ, গ্রহ ও গতির রহস্য বুঝতে গিয়ে নিউটন যে গণিতের পথ খুলে দিয়েছিলেন, সেটিই পরবর্তীতে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে ওঠে।
সূত্র: ম্যাথ টিউটর ডিভিডি
আরটিভি/জেএমএ

