
মাটির স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য বোঝার জন্য অভিনব এক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন সুইজারল্যান্ডের গবেষকেরা। দেশটির বিভিন্ন বাগান, তৃণভূমি, কৃষিজমি ও লনে দুই হাজারের বেশি জোড়া তুলার অন্তর্বাস পুঁতে রাখা হয়। পাশাপাশি মাটির নিচে দেওয়া হয় প্রায় ১২ হাজার টি-ব্যাগ। দুই মাস পর সেগুলো তুলে পরীক্ষা করে মাটির জৈবিক কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন গবেষকেরা।
বিজ্ঞানবিষয়ক সংবাদমাধ্যম সায়েন্সঅ্যালার্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে Plants, People, Planet জার্নালে।

গবেষকদের এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘Proof by Underpants’। মূল লক্ষ্য ছিল মাটির জীববৈচিত্র্য ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা।
গবেষকেরা দেখেছেন, দুই মাস মাটির নিচে থাকার পর কিছু অন্তর্বাস প্রায় পুরোপুরি পচে গেছে। কোথাও শুধু সেলাইয়ের অংশ অবশিষ্ট ছিল। আবার কিছু জায়গায় অন্তর্বাসে মাত্র এক-দুটি ছিদ্র তৈরি হয়েছে।
গবেষকদের মতে, মাটিতে থাকা কেঁচো, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীবের কর্মকাণ্ডের কারণে তুলার অন্তর্বাস দ্রুত পচে যায়। তাই অন্তর্বাস কতটা পচেছে, তা মাটির জৈবিক কার্যক্রমের একটি সহজ সূচক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এ থেকেই গবেষকেরা ‘আন্ডারপ্যান্টস ইনডেক্স’ বা ‘অন্তর্বাস সূচক’ ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছেন। সাধারণভাবে অন্তর্বাস যত বেশি পচবে, মাটিতে জৈবিক কার্যক্রম তত বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাটি কতটা সক্রিয়, তা নির্ধারণে জমির ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার বড় ভূমিকা রয়েছে। সুইজারল্যান্ডের লন, কৃষিজমি ও তৃণভূমিতে অন্তর্বাস পচনের হার তুলনামূলক কম ছিল। বিশেষ করে ভবন ও বাড়ির আশপাশের একজাতীয় ঘাসে আচ্ছাদিত জমিতে মাটির জৈবিক কার্যক্রমের মাত্রা কম পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, ব্যক্তিগত বাগানে অন্তর্বাস সবচেয়ে বেশি পচেছে। সেখানে কেঁচো, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য মাটিতে বসবাসকারী জীব বেশি সক্রিয় ছিল। এসব বাগানের মাটিতে জৈব কার্বন ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের পরিমাণও তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।
দুই মাস পর ব্যক্তিগত বাগানে পুঁতে রাখা তুলার অন্তর্বাসের গড়ে ৫৮ শতাংশ পচে যায়। বিপরীতে লনে পচনের হার ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিজ্ঞানী ও গবেষণার সহ-প্রধান মার্সেল ভ্যান ডার হেইডেন বলেন, জমি কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়, তা মাটির জীবজগৎ ও গুণমানের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে তুলার স্ট্রিপ ও টি-ব্যাগ ব্যবহারের নজির আগে থেকেই রয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, অন্তর্বাস ব্যবহারের মাধ্যমে বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব।
প্রায় পাঁচ বছর আগে শুরু হওয়া এই নাগরিক বিজ্ঞান প্রকল্পে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকার প্রায় এক হাজার স্বেচ্ছাসেবী অংশ নেন। তারা দেশের বিভিন্ন ধরনের ভূদৃশ্যে তুলার অন্তর্বাস ও টি-ব্যাগ মাটির নিচে পুঁতে দেন।

দুই মাস পর সেগুলো তুলে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। অন্তর্বাস ও টি-ব্যাগ দুই পরীক্ষাতেই প্রায় একই ধরনের ফল পাওয়া যায়। উভয় ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত বাগানে পচনের হার সবচেয়ে বেশি ছিল। হাঙ্গেরিতে পরিচালিত আরেকটি নাগরিক বিজ্ঞান গবেষণাতেও প্রায় একই ফল পাওয়া গেছে। সেখানে পরিচর্যা করা পারিবারিক সবজি-বাগানের মাটিতে অন্তর্বাস তুলনামূলক দ্রুত পচেছিল।
তবে গবেষকেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও দিয়েছেন। কোনো মাটিতে জৈবিক কার্যক্রম বেশি থাকা এবং সেটি সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর হওয়া দুটি বিষয় এক নয়। ব্যক্তিগত বাগানের মাটিতে ফসফরাস, নাইট্রোজেন ও পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, এর অন্যতম কারণ অতিরিক্ত সার ব্যবহার।
বিশেষ করে অনেক ব্যক্তিগত বাগানে ফসফরাসের মাত্রা মাটি ব্যবস্থাপনা ও ফসল উৎপাদনের জন্য নির্ধারিত সীমার চেয়েও বেশি ছিল। অতিরিক্ত ফসফরাস আশপাশের জলপথ ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
গবেষণার আরেক সহ-প্রধান ও জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিজ্ঞানী ফ্রাঞ্জ বেন্ডারের মতে, সব ধরনের বাস্তুতন্ত্রে সর্বোচ্চ মাত্রার পচন বা জৈবিক কার্যক্রম সবসময় কাম্য নয়। বনাঞ্চলের মতো প্রায়-প্রাকৃতিক পরিবেশে অতিরিক্ত পুষ্টি মাটির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।

গবেষকদের মতে, অন্তর্বাস কতটা পচেছে, তা দেখে কোনো মাটিতে জৈবিক কার্যক্রম ও পুষ্টির উপস্থিতি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব। তবে শুধু এই সূচক দিয়ে কোন মাটি সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যাবে না। এর জন্য মাটির রাসায়নিক ও জীববৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন।
গবেষকেরা বলছেন, নাগরিকদের অংশগ্রহণে পরিচালিত এই প্রকল্প সুইজারল্যান্ডের মাটির জীবজগৎ সম্পর্কে বড় একটি তথ্যভাণ্ডার তৈরি করেছে। একই সঙ্গে অদ্ভুত ও সহজবোধ্য এই পদ্ধতির মাধ্যমে মাটির গুরুত্ব নিয়েও মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে।
গবেষকদের আশা, এই তথ্য ভবিষ্যতে কোন ধরনের মাটির বেশি যত্ন ও সংরক্ষণ প্রয়োজন, তা শনাক্ত করতে সহায়তা করবে।
আরটিভি/এসকে


