ঢাকা সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

যে রাতে অন্ধকারেরও অপেক্ষা ছিল ভোরের

নির্ঝর জয়

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

কিছু রাত কেবল রাত নয়। সময়ের শরীরে তারা কোনো অদৃশ্য চিহ্নের মতো থেকে যায়। কোনো কোনো রাত আবার মানুষের স্মৃতিতে এমনভাবে বেঁচে থাকে, যেন তার অন্ধকারের মধ্যেও একটি অনাগত আলোর শব্দ শোনা যায়। জন্মাষ্টমীর রাত তেমনই এক রাত। মথুরার কারাগারে কৃষ্ণের জন্মের যে কাহিনি হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরায় বহমান, তার শুরু কোনো উৎসবের উজ্জ্বলতা দিয়ে নয়। শুরু হয় ভয়, বন্দিত্ব, ভবিষ্যদ্বাণী এবং মৃত্যুর আশঙ্কার মধ্য দিয়ে। অথচ সেই অন্ধকারের বুকেই জন্ম নেয় এমন এক শিশু, যাঁকে ঘিরে পরবর্তী কালে ভারতীয় ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির এক বিশাল জগৎ গড়ে ওঠে।

শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধে কৃষ্ণের জন্মকাহিনির যে বর্ণনা পাওয়া যায়, সেখানে মথুরার রাজা কংসের ভয় কাহিনির অন্যতম কেন্দ্র। দেবকীর অষ্টম সন্তান তাঁর মৃত্যুর কারণ হবে এই ভবিষ্যদ্বাণী কংসকে এমন এক আতঙ্কে আচ্ছন্ন করে যে নিজের বোন দেবকী ও তাঁর স্বামী বাসুদেবকেও বন্দি করে সে। একে একে সন্তানদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় সেই অপেক্ষা। অবশেষে আসে অষ্টম সন্তান। আসে কৃষ্ণ।

একটি শিশুর জন্ম সাধারণত ঘরে আলো নিয়ে আসে। কিন্তু কৃষ্ণের জন্মকাহিনিতে সেই আলোকে প্রথমে অন্ধকারের মধ্য দিয়েই পথ তৈরি করতে হয়। কারাগারের দেয়াল, শিকল, প্রহরী এবং কংসের আতঙ্কের মধ্যে জন্ম নেওয়া শিশুটিকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া তখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। পুরাণের বর্ণনায় বাসুদেব সেই নবজাতককে নিয়ে গভীর রাতে মথুরা থেকে গোকুলের দিকে যাত্রা করেন।

তাঁর সামনে যমুনা, পেছনে কারাগার। সামনে অনিশ্চিত পথ, পেছনে নিশ্চিত বিপদ। এই যাত্রাকে শুধু অলৌকিকতার চোখে দেখলে বিস্ময় পাওয়া যায়। কিন্তু একজন পিতার চোখ দিয়ে দেখলে সেখানে আরও গভীর কিছু দেখা যায়। দেখা যায় ভয়কে অতিক্রম করে দায়িত্ব পালন করার এক অনিবার্যতা। কোলে একটি শিশু। চারদিকে অন্ধকার। কোথাও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। তবু পথ থামিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ কিছু পথ মানুষ নিজের জন্য হাঁটে না। ভালোবাসার মানুষটির জন্য হাঁটে।

এই জায়গাতেই জন্মাষ্টমীর কাহিনি আমাদের নিজেদের জীবনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে যুক্ত হয়ে যায়। আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কোনো না কোনো সময় এমন রাত আসে, যখন সামনে কোনো পথ স্পষ্ট থাকে না। ভবিষ্যৎ তখন কুয়াশার মতো। মানুষ জানে না পরের দিন কী অপেক্ষা করছে। তবু সে অপেক্ষা করে। তবু সে এগিয়ে যায়। হয়তো কারণ মানুষের সবচেয়ে গভীর শক্তির নাম সবসময় ক্ষমতা নয়। কখনো তার নাম আশা।

কৃষ্ণের জন্মের সময়টিও এই ভাবনাকে আরও গভীর করে। মধ্যরাত এমন এক সময়, যখন দিনের আলো সম্পূর্ণ বিদায় নিয়েছে, কিন্তু নতুন দিনের সূর্য এখনও ওঠেনি। এটি যেন সময়ের একটি মধ্যবর্তী অঞ্চল। একদিকে শেষ হয়ে যাওয়া অতীত, অন্যদিকে এখনও অদৃশ্য ভবিষ্যৎ। মানুষের জীবনেও এমন মধ্যরাত আসে। পুরোনো জীবন শেষ হয়ে যায়, অথচ নতুন জীবনের দরজা তখনও পুরোপুরি খোলে না। মানুষ তখন দাঁড়িয়ে থাকে একটি অদৃশ্য ভোরের অপেক্ষায়।

কৃষ্ণের জন্মকাহিনির সৌন্দর্য হয়তো এই অপেক্ষার মধ্যেই। আলোকে দেখার আগেই আলোকে বিশ্বাস করা। পথ দেখা যাওয়ার আগেই পথের দিকে এগিয়ে যাওয়া। ভবিষ্যৎ নিশ্চিত না হয়েও ভবিষ্যতের জন্য একটি শিশুকে বাঁচিয়ে রাখা। মথুরার অন্ধকার থেকে গোকুলের দিকে কৃষ্ণের যাত্রা যেন এক পৃথিবী থেকে অন্য পৃথিবীতে প্রবেশেরও প্রতীক। মথুরায় ছিল রাজশক্তির ভয়, ষড়যন্ত্র ও মৃত্যুর আশঙ্কা।

গোকুলে শুরু হয় কৃষ্ণের শৈশবের অন্য এক অধ্যায়। মাঠ, নদী, গরু, রাখাল, বন্ধুত্ব, খেলা এবং বাঁশির সুরের মধ্যে গড়ে ওঠে তাঁর বাল্যপরিচয়। জন্মের সঙ্গে যেখানে কারাগারের অন্ধকার, শৈশবের সঙ্গে সেখানে প্রকৃতির মুক্তি।

কৃষ্ণের চরিত্রের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি এখানেই। তিনি একরৈখিক নন। একই কৃষ্ণকে কেউ দেখেছেন শিশুরূপে, কেউ বন্ধুরূপে, কেউ প্রেমের প্রতীকে, কেউ দার্শনিক হিসেবে, কেউ আবার মহাভারতের জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার এক অসাধারণ চরিত্র হিসেবে। অর্জুনের সারথি হিসেবে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে জীবনের গভীরতম প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হন। গীতার কৃষ্ণ তাই শুধু ধর্মীয় চরিত্র নন, ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসেও এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ।

বাংলা সাহিত্যেও কৃষ্ণের উপস্থিতি বহুমাত্রিক। বৈষ্ণব পদাবলীতে রাধা ও কৃষ্ণের প্রেম, বিরহ, আকাঙ্ক্ষা এবং মিলনের অনুভূতি এক গভীর কাব্যিক ভাষা পেয়েছে। চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাসসহ বহু কবির পদে কৃষ্ণের উপস্থিতি শুধু ভক্তির নয়, মানুষের অন্তর্জগতেরও। সেখানে প্রেম আছে, বিচ্ছেদ আছে, আকুলতা আছে, অপেক্ষা আছে। দেবতার কাহিনি মানুষের হৃদয়ের ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে।

এই কারণেই কৃষ্ণকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংস্কৃতি শুধু মন্দিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কীর্তন, পদাবলী, সংগীত, নৃত্য, নাটক, চিত্রকলা, লোকসংস্কৃতি এবং উৎসবের নানা আয়োজনে কৃষ্ণের উপস্থিতি বিস্তৃত হয়েছে। একটি পুরাণকাহিনি এভাবে মানুষের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। জন্মাষ্টমী সেই দীর্ঘ স্মৃতিকে প্রতি বছর নতুন করে জাগিয়ে তোলে।

কিন্তু উৎসবের আড়ালে যে প্রশ্নটি থেকে যায়, তা আরও গভীর। আমরা কি শুধু কৃষ্ণের জন্ম উদ্‌যাপন করি, নাকি তাঁর জন্মের অর্থও ভাবি? প্রদীপ জ্বালানো সহজ। নিজের ভেতরের অন্ধকারে আলো জ্বালানো কঠিন। মন্দিরে প্রার্থনা করা সহজ। মানুষের প্রতি সত্যিকারের সহমর্মিতা দেখানো কঠিন। উৎসবের দিনে আনন্দ করা সহজ। অন্যের দুঃখের সময়ে পাশে দাঁড়ানো কঠিন।

তাই জন্মাষ্টমীর আলো শুধু প্রদীপের আলো হলে তার অর্থ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেই আলো যদি মানুষের আচরণে পৌঁছায়, যদি অন্যায়ের সামনে বিবেককে জাগিয়ে তোলে, যদি মানুষের প্রতি মানুষের মমতা বাড়ায়, তবেই হয়তো একটি প্রাচীন জন্মকাহিনি বর্তমানের জীবনের সঙ্গে নতুন করে কথা বলে।

কংসকে শুধু পুরাণের একজন অত্যাচারী রাজা দেখলে গল্পের একটি স্তর বোঝা যায়। কিন্তু তার ভয়কে দেখলে আরও একটি স্তর সামনে আসে। ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্ক একজন মানুষকে কীভাবে নিষ্ঠুর করে তুলতে পারে, কংস তার এক চরম প্রতীক। অন্যদিকে বাসুদেবের পথচলায় দেখা যায় ভালোবাসার শক্তি। একজন মানুষ নিজের জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে সন্তানের জীবনকে বড় করে দেখেন।

ভয় তাঁকে থামাতে পারে না। মানুষের ভেতরে এই দুই প্রবণতাই হয়তো চিরকাল পাশাপাশি থাকে। একদিকে ভয়, অহংকার, লোভ এবং নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা। অন্যদিকে ভালোবাসা, দায়িত্ব, সাহস এবং আশার আলো। জন্মাষ্টমীর কাহিনি সেই দুই সম্ভাবনার সামনে মানুষকে দাঁড় করায়।

আজকের পৃথিবী মথুরার পৃথিবী নয়। আমাদের কারাগারের দেয়ালও সবসময় ইট দিয়ে তৈরি হয় না। কোনো কারাগার তৈরি হয় ভয় দিয়ে, কোনোটি অহংকার দিয়ে, কোনোটি লোভ দিয়ে, কোনোটি হতাশা দিয়ে। বাইরে থেকে মুক্ত মানুষও কখনো কখনো নিজের ভেতরে বন্দি থাকে। এই কারণেই কৃষ্ণের জন্মের মধ্যরাত আজও অর্থবহ। কারণ মধ্যরাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সব আলো চোখে দেখা যায় না। কিছু আলো প্রথমে জন্ম নেয় বিশ্বাসে। তারপর তা পথ দেখায়।

জন্মাষ্টমীর রাতে তাই যখন ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায়, কীর্তনের সুর ভেসে আসে, মন্দিরে প্রদীপ জ্বলে এবং শিশুরা কৃষ্ণের সাজে সেজে ওঠে, তখন শতাব্দী পেরিয়ে একটি পুরোনো রাত যেন আবার বর্তমানের দরজায় এসে দাঁড়ায়। মথুরার কারাগার, বাসুদেবের যাত্রা, যমুনার অন্ধকার জল এবং গোকুলের অপেক্ষা আবার মানুষের কল্পনায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। সময় বদলায়। মানুষ বদলায়। সমাজ বদলায়। কিন্তু মানুষের ভেতরের অন্ধকার এবং আলোর আকাঙ্ক্ষা খুব বেশি বদলায় না। সেই কারণেই একটি প্রাচীন জন্মকাহিনি এখনও এত মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে আছে।

হয়তো জন্মাষ্টমীর সবচেয়ে গভীর উপলব্ধি হলো, অন্ধকারকে শেষ সত্য বলে মেনে না নেওয়া। কারণ রাত যত দীর্ঘই হোক, ভোর তার বাইরে কোথাও নয়। ভোরের সম্ভাবনা রাতের ভেতরেই জন্ম নেয়। কৃষ্ণের জন্ম তাই শুধু একটি জন্মের স্মরণ নয়।

এটি মানুষের সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষারও স্মরণ, যেখানে ভয়কে অতিক্রম করে আশা জন্ম নেয়, বন্দিত্বের মধ্যেও মুক্তির স্বপ্ন দেখা যায় এবং গভীরতম অন্ধকারের মধ্যেও মানুষ বিশ্বাস করতে পারে যে আলো আসবে। হয়তো সেই কারণেই জন্মাষ্টমীর রাত আজও এত গভীর। কারণ সেটি এমন এক রাত, যে রাতে অন্ধকারেরও অপেক্ষা ছিল ভোরের।

লেখকঃ নির্ঝর জয়, শিক্ষক, গীতিকার ও সাহিত্যসমালোচক

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সন্ধিক্ষণ...
মহালয়া আসলে কোনো নির্দিষ্ট দিনের নাম নয়, মানুষের অস্তিত্বের ভেতরে বারবার ফিরে আসা এক সন্ধিক্ষণের নাম।
সন্ধিক্ষণ...
মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের শঙ্কায় ট্রাম্প
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শঙ্কায় আছেন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয় ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদী কার্যকালের দুই বছর পর ঠিক মাঝপথে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে বলা হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের শঙ্কায় ট্রাম্প
শিক্ষক থেকে পথপ্রদর্শক: যাদের কাছে ঋণী আমি
আজ মহান শিক্ষক দিবস। জীবনের এই বিশেষ দিনে সবার আগে গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই আমার জীবনের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক—আমার আম্মুকে। আমার জীবনের প্রতিটি ভালো অর্জনের পেছনে তার অবদান সবচেয়ে বেশি। তার ভালোবাসা, শাসন, ত্যাগ ও নিরন্তর অনুপ্রেরণাই আমাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। এরপর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি আমার স্কুলজীবনের প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের—প্রধান শিক্ষক দীন ইসলাম স্যার, ফরিদা ইয়াসমিন (আমার চাচি), নিপা মেম, হেলানা মেম ও ফাতেমা মেমকে। তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও স্নেহেই চতুর্থ শ্রেণিতে আমার জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করেছিল। তাদের শেখানো অনেক কথাই আজও আমার পথচলার অনুপ্রেরণা। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে যখন মাধ্যমিক জীবনে পা রাখলাম, তখন নতুন করে কিছু মানুষ আমার সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তাদের স্নেহ, শাসন ও অনুপ্রেরণায় পেয়েছি নতুন পথের সন্ধান। তাদের মধ্যে প্রধান শিক্ষক রেহানা মেম, শিলা মেম, তানিয়া মেম, দোলা মেম, হুজুর স্যার ও রাসেল স্যার অন্যতম। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই পেয়েছি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, যা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। এরপর এলো কলেজজীবন। জীবনের এই অধ্যায়েও কিছু মানুষ আমার স্বপ্নকে আরও বড় করে তুলেছেন। রাবেয়া মেম, দীপ্তি মেম, শামীম স্যার, দেলোয়ার স্যার ও আবুবকর স্যার—তাদের নাম আমি কখনোই ভুলতে পারব না। তারা আমাকে শুধু পড়াননি; বরং স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছেন এবং বিশ্বাস করিয়েছেন—‘আমি পারব।’ তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার ফলেই আজ আমি দেশের অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের একজন শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে তাদের অনুপ্রেরণায়ই ঢাবিতে (কলা অনুষদের নরমাল সাবজেক্টে), রাবি ও চবিতে ভর্তির সুযোগ হয়েছিল। আমার জীবনের সেই সময়ে তাদের উৎসাহ ও বিশ্বাস আমাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। বর্তমানে আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের পথচলায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অবদানও আমি কখনো ভুলব না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের যে স্নেহ, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা—তা সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত শুধু একাডেমিক শিক্ষা নয়, বরং জীবনকে কীভাবে আরও সুন্দরভাবে এগিয়ে নিতে হয়, সেটিও শেখার সুযোগ পাচ্ছি। শিক্ষাজীবনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের বাইরেও আমার জীবনে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে আমার চাচাতো বড় বোন মিম আপুর। ছোটবেলা থেকেই তিনি আমাকে অনেক অঙ্ক অনুশীলন করিয়েছেন। তার সেই পরিশ্রম ও সময় দেওয়ার সুফল আমি আজও পাচ্ছি। অনেক সময় একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে থাকেন না, কিন্তু তার শেখানোটা সারাজীবন আমাদের সঙ্গে থেকে যায়—মিম আপু আমার জন্য তেমনই একজন। এর পাশাপাশি ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা আমার শেখার জগৎকে আরও বিস্তৃত করেছে। সাংবাদিকতা করার সুবাদে আরটিভির অনলাইন ইনচার্জ আজাদ ভাই এবং শিফট ইনচার্জ ইমতিয়াজ ভাইয়ের কাছ থেকেও প্রতিনিয়ত অনেক কিছু শেখার সুযোগ পাচ্ছি। সংবাদকে কীভাবে দেখতে হয়, তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীলতা, পেশাদারিত্ব এবং কাজের প্রতি আন্তরিকতা— এসব বিষয়ে তাদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা আমার ভবিষ্যৎ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাদের প্রতিও রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, আমার জীবনের প্রতিটি ধাপে কোনো না কোনো শিক্ষক আমার হাত ধরে সামনে এগিয়ে দিয়েছেন। কেউ শিখিয়েছেন কীভাবে ভালো মানুষ হতে হয়, কেউ শিখিয়েছেন কীভাবে কঠিন সময়ে হাল না ছেড়ে এগিয়ে যেতে হয়, আবার কেউ আমার ওপর বিশ্বাস রেখে আমাকে নিজের ওপর বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন। আজ আমি যে পরিচয়ে পরিচিত, তার পেছনে আমার বাবা-মায়ের পাশাপাশি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের দেওয়া শিক্ষা, শাসন, স্নেহ, ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণা আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। আমার জীবনের পথচলায় যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিক্ষক হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের প্রত্যেকের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অশেষ কৃতজ্ঞতা। শিক্ষক শুধু একটি পেশার নাম নয়; একজন শিক্ষক একটি জীবন বদলে দিতে পারেন। আর জীবনের এই দীর্ঘ পথে কিছু মানুষ শিক্ষক না হয়েও আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে যান। তাই এই মহান দিবসে আমার শিক্ষকদেরসহ বিশ্বের সকল শিক্ষকের প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা। শুভ শিক্ষক দিবস। আবুবকর সম্পদ জবি সংবাদদাতা, আরটিভি আহ্বায়ক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটি আরটিভি/এমএইচজে
শিক্ষক থেকে পথপ্রদর্শক: যাদের কাছে ঋণী আমি
চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে দ্বিতীয় মতামত কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত একটি পরিবারের জন্য বড় সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থ, সময়, মানসিক চাপ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—চিকিৎসা নিয়ে প্রত্যাশা। তাই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমার কাছে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়—দ্বিতীয় মতামত নেওয়া। দ্বিতীয় মতামত মানে প্রথম চিকিৎসককে অবিশ্বাস করা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ কোনো চিকিৎসা সিদ্ধান্তের আগে আরেকজন যোগ্য বিশেষজ্ঞের মতামত জানা। এতে রোগী ও পরিবার রোগের অবস্থা, চিকিৎসার বিকল্প, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং দেশে বা বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন। আমাদের দেশে কোনো জটিল রোগ ধরা পড়লেই অনেক পরিবার প্রথমে বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবেন। আবার কেউ পরিচিত কারও অভিজ্ঞতাকে নিজের চিকিৎসার সিদ্ধান্তের ভিত্তি করেন। কিন্তু একই রোগ হলেও প্রতিটি রোগীর অবস্থা, চিকিৎসার প্রয়োজন এবং ঝুঁকি এক নয়। তাই একজনের ভালো অভিজ্ঞতা অন্যজনের জন্য একই ফল নিশ্চিত করে না। আমার দৃষ্টিতে, বিদেশে যাওয়ার আগে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—“আমার চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন?” এর উত্তর পেতে কয়েকটি বিষয় জানা দরকার। রোগটি ঠিক কী? চিকিৎসার উদ্দেশ্য কী? দেশে এই চিকিৎসার উপযুক্ত সক্ষমতা আছে কি না? বিদেশে গেলে অতিরিক্ত কী সুবিধা পাওয়া যাবে? সম্ভাব্য খরচ কত? আর চিকিৎসার পরবর্তী পর্যায়ের চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ কীভাবে হবে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ এবং চিকিৎসক ও রোগীর যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরে। চিকিৎসার মান শুধু একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর নির্ভর করে না; নিরাপত্তা, রোগীকেন্দ্রিকতা, সময়োপযোগিতা এবং চিকিৎসার ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জটিল বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে গিয়ে একটি চিকিৎসা করিয়ে দেশে ফিরে আসার পর পরবর্তী চিকিৎসা কোথায় হবে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা কোথায় হবে এবং চিকিৎসার তথ্য স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে কীভাবে পৌঁছাবে—এসবও সিদ্ধান্তের অংশ হওয়া উচিত। কারণ চিকিৎসা একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তবে দ্বিতীয় মতামত নেওয়া মানেই চিকিৎসা পরিবর্তন করতে হবে—এমন নয়। অনেক সময় দ্বিতীয় বিশেষজ্ঞের মতামত প্রথম চিকিৎসা পরিকল্পনাকেই আরও পরিষ্কার করে। আবার কখনো নতুন কোনো বিকল্প সামনে আসতে পারে। মূল বিষয় হলো—রোগী যেন নিজের চিকিৎসা সম্পর্কে বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া ভুল—এমন কথা বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি বিদেশে গেলেই ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে—এমন ধারণাও সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। কিছু বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়া প্রয়োজন হতে পারে। আবার অনেক চিকিৎসার জন্য দেশের মধ্যেই উপযুক্ত সক্ষমতা থাকতে পারে। তাই আমার কাছে বিদেশে চিকিৎসার প্রশ্নটি “দেশ না বিদেশ”—এভাবে দেখার চেয়ে “প্রয়োজনের জন্য সঠিক জায়গা কোথায়?”—এই প্রশ্নে দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থা রোগীকে কোনো একটি সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয় না। বরং তাকে সঠিক তথ্য, প্রয়োজনীয় বিকল্প এবং যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ দেয়। শেষ পর্যন্ত রোগী বিদেশে যাবেন, নাকি দেশে চিকিৎসা নেবেন—সিদ্ধান্তটি তার। আমাদের দায়িত্ব হলো সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাকে যথেষ্ট তথ্য ও আস্থার সুযোগ দেওয়া। কারণ চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে কখনো কখনো আরেকজন বিশেষজ্ঞের মতামত শুধু একটি অতিরিক্ত পরামর্শ নয়— এটি হতে পারে আরও সচেতন সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। লেখক: মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম। আরটিভি/ এসকেডি
চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে দ্বিতীয় মতামত কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের হাব হতে পারে বাংলাদেশ: জেট্রো
ভৌগোলিক অবস্থান ও বিপুল জনসংখ্যার কারণে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের কেন্দ্রে (হাব) পরিণত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের।
আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের হাব হতে পারে বাংলাদেশ: জেট্রো