
কিছু রাত কেবল রাত নয়। সময়ের শরীরে তারা কোনো অদৃশ্য চিহ্নের মতো থেকে যায়। কোনো কোনো রাত আবার মানুষের স্মৃতিতে এমনভাবে বেঁচে থাকে, যেন তার অন্ধকারের মধ্যেও একটি অনাগত আলোর শব্দ শোনা যায়। জন্মাষ্টমীর রাত তেমনই এক রাত। মথুরার কারাগারে কৃষ্ণের জন্মের যে কাহিনি হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরায় বহমান, তার শুরু কোনো উৎসবের উজ্জ্বলতা দিয়ে নয়। শুরু হয় ভয়, বন্দিত্ব, ভবিষ্যদ্বাণী এবং মৃত্যুর আশঙ্কার মধ্য দিয়ে। অথচ সেই অন্ধকারের বুকেই জন্ম নেয় এমন এক শিশু, যাঁকে ঘিরে পরবর্তী কালে ভারতীয় ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির এক বিশাল জগৎ গড়ে ওঠে।
শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধে কৃষ্ণের জন্মকাহিনির যে বর্ণনা পাওয়া যায়, সেখানে মথুরার রাজা কংসের ভয় কাহিনির অন্যতম কেন্দ্র। দেবকীর অষ্টম সন্তান তাঁর মৃত্যুর কারণ হবে এই ভবিষ্যদ্বাণী কংসকে এমন এক আতঙ্কে আচ্ছন্ন করে যে নিজের বোন দেবকী ও তাঁর স্বামী বাসুদেবকেও বন্দি করে সে। একে একে সন্তানদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় সেই অপেক্ষা। অবশেষে আসে অষ্টম সন্তান। আসে কৃষ্ণ।
একটি শিশুর জন্ম সাধারণত ঘরে আলো নিয়ে আসে। কিন্তু কৃষ্ণের জন্মকাহিনিতে সেই আলোকে প্রথমে অন্ধকারের মধ্য দিয়েই পথ তৈরি করতে হয়। কারাগারের দেয়াল, শিকল, প্রহরী এবং কংসের আতঙ্কের মধ্যে জন্ম নেওয়া শিশুটিকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া তখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। পুরাণের বর্ণনায় বাসুদেব সেই নবজাতককে নিয়ে গভীর রাতে মথুরা থেকে গোকুলের দিকে যাত্রা করেন।
তাঁর সামনে যমুনা, পেছনে কারাগার। সামনে অনিশ্চিত পথ, পেছনে নিশ্চিত বিপদ। এই যাত্রাকে শুধু অলৌকিকতার চোখে দেখলে বিস্ময় পাওয়া যায়। কিন্তু একজন পিতার চোখ দিয়ে দেখলে সেখানে আরও গভীর কিছু দেখা যায়। দেখা যায় ভয়কে অতিক্রম করে দায়িত্ব পালন করার এক অনিবার্যতা। কোলে একটি শিশু। চারদিকে অন্ধকার। কোথাও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। তবু পথ থামিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ কিছু পথ মানুষ নিজের জন্য হাঁটে না। ভালোবাসার মানুষটির জন্য হাঁটে।
এই জায়গাতেই জন্মাষ্টমীর কাহিনি আমাদের নিজেদের জীবনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে যুক্ত হয়ে যায়। আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কোনো না কোনো সময় এমন রাত আসে, যখন সামনে কোনো পথ স্পষ্ট থাকে না। ভবিষ্যৎ তখন কুয়াশার মতো। মানুষ জানে না পরের দিন কী অপেক্ষা করছে। তবু সে অপেক্ষা করে। তবু সে এগিয়ে যায়। হয়তো কারণ মানুষের সবচেয়ে গভীর শক্তির নাম সবসময় ক্ষমতা নয়। কখনো তার নাম আশা।
কৃষ্ণের জন্মের সময়টিও এই ভাবনাকে আরও গভীর করে। মধ্যরাত এমন এক সময়, যখন দিনের আলো সম্পূর্ণ বিদায় নিয়েছে, কিন্তু নতুন দিনের সূর্য এখনও ওঠেনি। এটি যেন সময়ের একটি মধ্যবর্তী অঞ্চল। একদিকে শেষ হয়ে যাওয়া অতীত, অন্যদিকে এখনও অদৃশ্য ভবিষ্যৎ। মানুষের জীবনেও এমন মধ্যরাত আসে। পুরোনো জীবন শেষ হয়ে যায়, অথচ নতুন জীবনের দরজা তখনও পুরোপুরি খোলে না। মানুষ তখন দাঁড়িয়ে থাকে একটি অদৃশ্য ভোরের অপেক্ষায়।
কৃষ্ণের জন্মকাহিনির সৌন্দর্য হয়তো এই অপেক্ষার মধ্যেই। আলোকে দেখার আগেই আলোকে বিশ্বাস করা। পথ দেখা যাওয়ার আগেই পথের দিকে এগিয়ে যাওয়া। ভবিষ্যৎ নিশ্চিত না হয়েও ভবিষ্যতের জন্য একটি শিশুকে বাঁচিয়ে রাখা। মথুরার অন্ধকার থেকে গোকুলের দিকে কৃষ্ণের যাত্রা যেন এক পৃথিবী থেকে অন্য পৃথিবীতে প্রবেশেরও প্রতীক। মথুরায় ছিল রাজশক্তির ভয়, ষড়যন্ত্র ও মৃত্যুর আশঙ্কা।
গোকুলে শুরু হয় কৃষ্ণের শৈশবের অন্য এক অধ্যায়। মাঠ, নদী, গরু, রাখাল, বন্ধুত্ব, খেলা এবং বাঁশির সুরের মধ্যে গড়ে ওঠে তাঁর বাল্যপরিচয়। জন্মের সঙ্গে যেখানে কারাগারের অন্ধকার, শৈশবের সঙ্গে সেখানে প্রকৃতির মুক্তি।
কৃষ্ণের চরিত্রের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি এখানেই। তিনি একরৈখিক নন। একই কৃষ্ণকে কেউ দেখেছেন শিশুরূপে, কেউ বন্ধুরূপে, কেউ প্রেমের প্রতীকে, কেউ দার্শনিক হিসেবে, কেউ আবার মহাভারতের জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার এক অসাধারণ চরিত্র হিসেবে। অর্জুনের সারথি হিসেবে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে জীবনের গভীরতম প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হন। গীতার কৃষ্ণ তাই শুধু ধর্মীয় চরিত্র নন, ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসেও এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ।
বাংলা সাহিত্যেও কৃষ্ণের উপস্থিতি বহুমাত্রিক। বৈষ্ণব পদাবলীতে রাধা ও কৃষ্ণের প্রেম, বিরহ, আকাঙ্ক্ষা এবং মিলনের অনুভূতি এক গভীর কাব্যিক ভাষা পেয়েছে। চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাসসহ বহু কবির পদে কৃষ্ণের উপস্থিতি শুধু ভক্তির নয়, মানুষের অন্তর্জগতেরও। সেখানে প্রেম আছে, বিচ্ছেদ আছে, আকুলতা আছে, অপেক্ষা আছে। দেবতার কাহিনি মানুষের হৃদয়ের ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে।
এই কারণেই কৃষ্ণকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংস্কৃতি শুধু মন্দিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কীর্তন, পদাবলী, সংগীত, নৃত্য, নাটক, চিত্রকলা, লোকসংস্কৃতি এবং উৎসবের নানা আয়োজনে কৃষ্ণের উপস্থিতি বিস্তৃত হয়েছে। একটি পুরাণকাহিনি এভাবে মানুষের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। জন্মাষ্টমী সেই দীর্ঘ স্মৃতিকে প্রতি বছর নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
কিন্তু উৎসবের আড়ালে যে প্রশ্নটি থেকে যায়, তা আরও গভীর। আমরা কি শুধু কৃষ্ণের জন্ম উদ্যাপন করি, নাকি তাঁর জন্মের অর্থও ভাবি? প্রদীপ জ্বালানো সহজ। নিজের ভেতরের অন্ধকারে আলো জ্বালানো কঠিন। মন্দিরে প্রার্থনা করা সহজ। মানুষের প্রতি সত্যিকারের সহমর্মিতা দেখানো কঠিন। উৎসবের দিনে আনন্দ করা সহজ। অন্যের দুঃখের সময়ে পাশে দাঁড়ানো কঠিন।
তাই জন্মাষ্টমীর আলো শুধু প্রদীপের আলো হলে তার অর্থ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেই আলো যদি মানুষের আচরণে পৌঁছায়, যদি অন্যায়ের সামনে বিবেককে জাগিয়ে তোলে, যদি মানুষের প্রতি মানুষের মমতা বাড়ায়, তবেই হয়তো একটি প্রাচীন জন্মকাহিনি বর্তমানের জীবনের সঙ্গে নতুন করে কথা বলে।
কংসকে শুধু পুরাণের একজন অত্যাচারী রাজা দেখলে গল্পের একটি স্তর বোঝা যায়। কিন্তু তার ভয়কে দেখলে আরও একটি স্তর সামনে আসে। ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্ক একজন মানুষকে কীভাবে নিষ্ঠুর করে তুলতে পারে, কংস তার এক চরম প্রতীক। অন্যদিকে বাসুদেবের পথচলায় দেখা যায় ভালোবাসার শক্তি। একজন মানুষ নিজের জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে সন্তানের জীবনকে বড় করে দেখেন।
ভয় তাঁকে থামাতে পারে না। মানুষের ভেতরে এই দুই প্রবণতাই হয়তো চিরকাল পাশাপাশি থাকে। একদিকে ভয়, অহংকার, লোভ এবং নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা। অন্যদিকে ভালোবাসা, দায়িত্ব, সাহস এবং আশার আলো। জন্মাষ্টমীর কাহিনি সেই দুই সম্ভাবনার সামনে মানুষকে দাঁড় করায়।
আজকের পৃথিবী মথুরার পৃথিবী নয়। আমাদের কারাগারের দেয়ালও সবসময় ইট দিয়ে তৈরি হয় না। কোনো কারাগার তৈরি হয় ভয় দিয়ে, কোনোটি অহংকার দিয়ে, কোনোটি লোভ দিয়ে, কোনোটি হতাশা দিয়ে। বাইরে থেকে মুক্ত মানুষও কখনো কখনো নিজের ভেতরে বন্দি থাকে। এই কারণেই কৃষ্ণের জন্মের মধ্যরাত আজও অর্থবহ। কারণ মধ্যরাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সব আলো চোখে দেখা যায় না। কিছু আলো প্রথমে জন্ম নেয় বিশ্বাসে। তারপর তা পথ দেখায়।
জন্মাষ্টমীর রাতে তাই যখন ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায়, কীর্তনের সুর ভেসে আসে, মন্দিরে প্রদীপ জ্বলে এবং শিশুরা কৃষ্ণের সাজে সেজে ওঠে, তখন শতাব্দী পেরিয়ে একটি পুরোনো রাত যেন আবার বর্তমানের দরজায় এসে দাঁড়ায়। মথুরার কারাগার, বাসুদেবের যাত্রা, যমুনার অন্ধকার জল এবং গোকুলের অপেক্ষা আবার মানুষের কল্পনায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। সময় বদলায়। মানুষ বদলায়। সমাজ বদলায়। কিন্তু মানুষের ভেতরের অন্ধকার এবং আলোর আকাঙ্ক্ষা খুব বেশি বদলায় না। সেই কারণেই একটি প্রাচীন জন্মকাহিনি এখনও এত মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে আছে।
হয়তো জন্মাষ্টমীর সবচেয়ে গভীর উপলব্ধি হলো, অন্ধকারকে শেষ সত্য বলে মেনে না নেওয়া। কারণ রাত যত দীর্ঘই হোক, ভোর তার বাইরে কোথাও নয়। ভোরের সম্ভাবনা রাতের ভেতরেই জন্ম নেয়। কৃষ্ণের জন্ম তাই শুধু একটি জন্মের স্মরণ নয়।
এটি মানুষের সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষারও স্মরণ, যেখানে ভয়কে অতিক্রম করে আশা জন্ম নেয়, বন্দিত্বের মধ্যেও মুক্তির স্বপ্ন দেখা যায় এবং গভীরতম অন্ধকারের মধ্যেও মানুষ বিশ্বাস করতে পারে যে আলো আসবে। হয়তো সেই কারণেই জন্মাষ্টমীর রাত আজও এত গভীর। কারণ সেটি এমন এক রাত, যে রাতে অন্ধকারেরও অপেক্ষা ছিল ভোরের।
লেখকঃ নির্ঝর জয়, শিক্ষক, গীতিকার ও সাহিত্যসমালোচক
আরটিভি/এসএইচএম



