ঢাকা সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জালে, নাকি জেলের জীবনেও?

মনিরুজ্জামান মমিন

প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৬ পিএম
জেলেদের সঙ্গে কথা বলছেন লেখক। ছবি: সৌজন্য

মা ইলিশ রক্ষায় বর্তমানে ইলিশ আহরণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলছে। নিষেধাজ্ঞার এই দিনগুলোতে জেলেদের জীবনসংগ্রাম এবং নদী ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সবার জবাবদিহির প্রশ্ন রয়েছে। নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও জেলের ক্ষুধার জ্বালা বন্ধ হয় না। চুলায় হাড়ি চড়াতে হয়, সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে হয়, অসুস্থ হলে ওষুধ কিনতে হয়। ঋণের বোঝাও অপেক্ষা করে না নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার। যে নদী একসময় একটি পরিবারের বেঁচে থাকার ভরসা ছিল, সেই নদীতে জাল ফেলতে না পারার দিনগুলোই অনেক জেলে পরিবারের কাছে হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার কঠিন পরীক্ষা। নদীতে মাছ না উঠলে শুধু জালই খালি ফেরে না, অনেক সময় খালি থাকে ঘরের হাড়িও।

গত ২০ ও ২১ অক্টোবর বরিশাল ও ভোলার বিভিন্ন জেলেপল্লি ও মাছ অবতরণকেন্দ্রে গিয়ে জেলেদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তাদের জীবনসংগ্রাম, অভাব-অনটন আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা শুনতে গিয়ে উপলব্ধি করেছি, ইলিশ সংরক্ষণের আলোচনা যতটা জরুরি, ইলিশের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর জীবনকে বোঝাও ততটাই জরুরি। তাদের কারও কথায় ছিল সংসার চালানোর দুশ্চিন্তা, কারও কণ্ঠে ছিল অভাবের দীর্ঘশ্বাস, আবার কারও চোখেমুখে ছিল আগামী দিন নিয়ে অনিশ্চয়তা।

একজন মৎস্যবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ও গবেষক হিসেবে এই অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন করে ভাবিয়েছে। আমরা ইলিশ রক্ষার কথা বলি, নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরি, আইন অমান্য করলে শাস্তির দাবি জানাই। কিন্তু যে মানুষটির জীবিকার প্রধান অবলম্বন নদী, সেই নদীতে মাছ ধরতে না পারার দিনগুলোতে তার পরিবারের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা কোথায়? সন্তানকে না খাইয়ে রাখা যায় না, অভাবকে বোঝানো যায় না যে নিষেধাজ্ঞা চলছে। জীবিকার আর কোনো পথ না থাকলে একজন মানুষ কোন বাস্তবতার মুখোমুখি হন, সেই প্রশ্নটিও আমাদের ভাবতে হবে।

ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সব ভার যেন সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলোর কাঁধেই না চাপে। জাল ফেলার দায় জেলের, নদী ধ্বংসের দায় কার?

ইলিশের সংকটের কথা উঠলেই অনেক সময় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন জেলেরা—বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার সময়ে যারা মাছ ধরতে নদীতে নামেন। আইন অমান্য করে মাছ ধরা যে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ইলিশের সংকটের পেছনে থাকা বৃহত্তর পরিবেশগত ও মানবসৃষ্ট চাপগুলোকে পাশ কাটিয়ে শুধু দরিদ্র জেলেদের দায়ী করলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র কি সামনে আসে?

নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, গভীরতা ও মাছের বিচরণক্ষেত্রের সঙ্গে ইলিশের জীবনচক্রের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অথচ অবৈধ ও অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, নদীর তলদেশের পরিবর্তন এবং নতুন নতুন চর জেগে ওঠা নিয়ে নদীপাড়ের মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড কোথায়, কীভাবে এবং কার স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।

নদীকে নিজের স্বার্থে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা যাদের আছে, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে তারা যেন জবাবদিহির বাইরে থাকতে না পারেন।

অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। নদী কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এর ক্ষতি মানে অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের ক্ষতি।

একই প্রশ্ন ধ্বংসাত্মক জালের ব্যবহার নিয়েও। বেহুন্দি জালের মতো নির্বিচার আহরণপদ্ধতিতে ছোট মাছ, পোনা, অন্যান্য জলজ প্রাণী এবং বিভিন্ন আকারের মাছ আটকা পড়তে পারে। এতে মৎস্যসম্পদের পুনরুৎপাদন ও ভবিষ্যৎ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসব জালের ব্যবহার, সরবরাহ বা পৃষ্ঠপোষকতার পেছনে যাদের ভূমিকা রয়েছে, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কারও অর্থনৈতিক সামর্থ্য, পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব যেন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা হয়ে না দাঁড়ায়।

নদীদূষণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। শিল্পবর্জ্য ও অন্যান্য দূষণ নদীর পরিবেশ এবং জলজ প্রাণীর আবাসস্থলকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এসব ক্ষতির দায় কোনো একটি দরিদ্র জেলে পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। নদী ও মৎস্যসম্পদের বড় ক্ষতির পেছনে যাদের ভূমিকা রয়েছে, তাদের শনাক্ত করা, ক্ষতির প্রকৃতি নিরূপণ করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে আইন ভাঙা যেমন কাম্য নয়, তেমনি নদী ধ্বংস করে কিংবা মৎস্যসম্পদের ক্ষতি করে প্রভাবের জোরে পার পেয়ে যাওয়াও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আইন প্রয়োগের কঠোরতা যেন কেবল দুর্বল মানুষের ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান না হয়।

ইলিশ বাঁচুক, বাঁচুক জেলের সংসারও

মাঠপর্যায়ে জেলেদের সঙ্গে আলোচনায় সরকারি সহায়তা, নিবন্ধন এবং প্রকৃত জেলেদের তালিকাভুক্তি নিয়েও নানা অসন্তোষের কথা উঠে এসেছে। কেউ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা বলেছেন, কেউ জানিয়েছেন নিবন্ধনসংক্রান্ত সমস্যার কথা। এসব অভিযোগ যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যারা সত্যিকার অর্থেই মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের শনাক্ত ও নিবন্ধিত করা এবং সহায়তা তাদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

নিষেধাজ্ঞার সময়ে শুধু মাছ ধরা বন্ধের নির্দেশ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সেই সময়ে জেলেদের পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। যে পরিবারটি কয়েক দিন আগেও নদীতে মাছ ধরে কোনোভাবে সংসার চালাত, নিষেধাজ্ঞার সময় সেই পরিবারটির চুলা জ্বলবে কীভাবে—এই প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তরও সংরক্ষণ পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত।

সহায়তা বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, প্রকৃত জেলেদের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করতে হবে। একইসঙ্গে প্রশিক্ষণ, বিকল্প আয়ের সুযোগ ও সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে হবে, যাতে নিষেধাজ্ঞার সময়ে পরিবার চালাতে গিয়ে কাউকে আইন ভাঙার ঝুঁকি নিতে না হয়। জেলেদের আইন মানার আহ্বান তখনই বেশি কার্যকর হবে, যখন তাঁদের সামনে আইন মেনে বেঁচে থাকার বাস্তব সুযোগও থাকবে।

অন্যদিকে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিষিদ্ধ সময়ে অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ করতে হবে, ধ্বংসাত্মক জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং নদীর ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে এই প্রয়োগ হতে হবে ন্যায়সংগত ও বৈষম্যহীন। দরিদ্র জেলে থেকে শুরু করে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্য যে কেউ—আইন ভাঙার দায় প্রমাণিত হলে সবার ক্ষেত্রেই একই নীতি কার্যকর হওয়া উচিত।

ইলিশ রক্ষার লড়াই হোক সবার

ইলিশ কেবল একটি মাছ নয়। এটি আমাদের নদী, জীববৈচিত্র্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং অসংখ্য মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ইলিশের প্রাচুর্যের সঙ্গে যেমন জেলেদের ঘরের চুলা জ্বলার সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি নদীর সুস্থতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের পরিবেশগত ভবিষ্যৎ। তাই ইলিশ সংরক্ষণের দায়িত্বও কোনো একক গোষ্ঠীর নয়। জেলেদের আইন মানতে হবে, সরকারকে তাদের জীবিকার নিরাপত্তা দিতে হবে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নদী ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে, আর নদীদূষণ ও ধ্বংসের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

বরিশাল ও ভোলার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে আমার উপলব্ধি—ইলিশ বাঁচানোর লড়াইকে শুধু নিষেধাজ্ঞা আর আইন প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। নদীর পরিবেশ রক্ষা, ধ্বংসাত্মক আহরণ বন্ধ, ন্যায্য সহায়তা এবং জেলেদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।

কারণ, যে মানুষটি নদী থেকে মাছ ধরে সংসার চালান, তাকে বাঁচার পথ না দেখিয়ে শুধু নদীতে নামতে নিষেধ করলে সংরক্ষণের লক্ষ্য পূরণ কঠিন হবে। আবার নদীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে যারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেন, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত না করেও মৎস্যসম্পদ রক্ষা সম্ভব নয়। নদী বাঁচানোর দায়িত্ব যেমন জেলের, তেমনি সেই নদীর ওপর প্রভাব বিস্তারকারী, তা থেকে মুনাফা অর্জনকারী এবং তার সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা সবার।

জেলেদের চোখের ক্লান্তি, তাদের পরিবারের অনিশ্চয়তা আর নদীর পরিবর্তিত বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সংরক্ষণ শুধু মাছ বাঁচানোর কর্মসূচি নয়; এটি মানুষের জীবন, প্রকৃতি এবং ন্যায়বিচারকে একসঙ্গে রক্ষার অঙ্গীকার।

জেলেকে বাঁচার অধিকার দিন, নদীকে বাঁচার সুযোগ দিন—তবেই ইলিশ বাঁচানোর লড়াই সত্যিকার অর্থে সফল হবে। জেলে বাঁচলে ইলিশ বাঁচবে, নদী বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ ।

লেখক: বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের মাস্টার্স শিক্ষার্থী।

আরটিভি/আইএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
মৃত ব্যক্তির অধিকার যাদের কাছে নিরাপদ নয়, ক্ষমতায় গেলে জীবিতদের অধিকার কতটুকু নিরাপদ? 
জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কাছে আমাদের স্পষ্ট প্রশ্ন—মানবিক অধিকার কি শুধু নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের জন্য, নাকি প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য?
মৃত ব্যক্তির অধিকার যাদের কাছে নিরাপদ নয়, ক্ষমতায় গেলে জীবিতদের অধিকার কতটুকু নিরাপদ? 
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে দেশের ৫০০ মেরিন ক্যাডেটের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ
বাংলাদেশের মেরিটাইম খাতের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে, যা এখনো আমাদের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে দেশের ৫০০ মেরিন ক্যাডেটের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ
সন্ধিক্ষণ...
মহালয়া আসলে কোনো নির্দিষ্ট দিনের নাম নয়, মানুষের অস্তিত্বের ভেতরে বারবার ফিরে আসা এক সন্ধিক্ষণের নাম।
সন্ধিক্ষণ...
মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের শঙ্কায় ট্রাম্প
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শঙ্কায় আছেন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয় ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদী কার্যকালের দুই বছর পর ঠিক মাঝপথে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে বলা হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের শঙ্কায় ট্রাম্প
শিক্ষক থেকে পথপ্রদর্শক: যাদের কাছে ঋণী আমি
আজ মহান শিক্ষক দিবস। জীবনের এই বিশেষ দিনে সবার আগে গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই আমার জীবনের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক—আমার আম্মুকে। আমার জীবনের প্রতিটি ভালো অর্জনের পেছনে তার অবদান সবচেয়ে বেশি। তার ভালোবাসা, শাসন, ত্যাগ ও নিরন্তর অনুপ্রেরণাই আমাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। এরপর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি আমার স্কুলজীবনের প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের—প্রধান শিক্ষক দীন ইসলাম স্যার, ফরিদা ইয়াসমিন (আমার চাচি), নিপা মেম, হেলানা মেম ও ফাতেমা মেমকে। তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও স্নেহেই চতুর্থ শ্রেণিতে আমার জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করেছিল। তাদের শেখানো অনেক কথাই আজও আমার পথচলার অনুপ্রেরণা। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে যখন মাধ্যমিক জীবনে পা রাখলাম, তখন নতুন করে কিছু মানুষ আমার সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তাদের স্নেহ, শাসন ও অনুপ্রেরণায় পেয়েছি নতুন পথের সন্ধান। তাদের মধ্যে প্রধান শিক্ষক রেহানা মেম, শিলা মেম, তানিয়া মেম, দোলা মেম, হুজুর স্যার ও রাসেল স্যার অন্যতম। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই পেয়েছি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, যা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। এরপর এলো কলেজজীবন। জীবনের এই অধ্যায়েও কিছু মানুষ আমার স্বপ্নকে আরও বড় করে তুলেছেন। রাবেয়া মেম, দীপ্তি মেম, শামীম স্যার, দেলোয়ার স্যার ও আবুবকর স্যার—তাদের নাম আমি কখনোই ভুলতে পারব না। তারা আমাকে শুধু পড়াননি; বরং স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছেন এবং বিশ্বাস করিয়েছেন—‘আমি পারব।’ তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার ফলেই আজ আমি দেশের অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের একজন শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে তাদের অনুপ্রেরণায়ই ঢাবিতে (কলা অনুষদের নরমাল সাবজেক্টে), রাবি ও চবিতে ভর্তির সুযোগ হয়েছিল। আমার জীবনের সেই সময়ে তাদের উৎসাহ ও বিশ্বাস আমাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। বর্তমানে আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের পথচলায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অবদানও আমি কখনো ভুলব না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের যে স্নেহ, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা—তা সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত শুধু একাডেমিক শিক্ষা নয়, বরং জীবনকে কীভাবে আরও সুন্দরভাবে এগিয়ে নিতে হয়, সেটিও শেখার সুযোগ পাচ্ছি। শিক্ষাজীবনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের বাইরেও আমার জীবনে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে আমার চাচাতো বড় বোন মিম আপুর। ছোটবেলা থেকেই তিনি আমাকে অনেক অঙ্ক অনুশীলন করিয়েছেন। তার সেই পরিশ্রম ও সময় দেওয়ার সুফল আমি আজও পাচ্ছি। অনেক সময় একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে থাকেন না, কিন্তু তার শেখানোটা সারাজীবন আমাদের সঙ্গে থেকে যায়—মিম আপু আমার জন্য তেমনই একজন। এর পাশাপাশি ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা আমার শেখার জগৎকে আরও বিস্তৃত করেছে। সাংবাদিকতা করার সুবাদে আরটিভির অনলাইন ইনচার্জ আজাদ ভাই এবং শিফট ইনচার্জ ইমতিয়াজ ভাইয়ের কাছ থেকেও প্রতিনিয়ত অনেক কিছু শেখার সুযোগ পাচ্ছি। সংবাদকে কীভাবে দেখতে হয়, তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীলতা, পেশাদারিত্ব এবং কাজের প্রতি আন্তরিকতা— এসব বিষয়ে তাদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা আমার ভবিষ্যৎ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাদের প্রতিও রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, আমার জীবনের প্রতিটি ধাপে কোনো না কোনো শিক্ষক আমার হাত ধরে সামনে এগিয়ে দিয়েছেন। কেউ শিখিয়েছেন কীভাবে ভালো মানুষ হতে হয়, কেউ শিখিয়েছেন কীভাবে কঠিন সময়ে হাল না ছেড়ে এগিয়ে যেতে হয়, আবার কেউ আমার ওপর বিশ্বাস রেখে আমাকে নিজের ওপর বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন। আজ আমি যে পরিচয়ে পরিচিত, তার পেছনে আমার বাবা-মায়ের পাশাপাশি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের দেওয়া শিক্ষা, শাসন, স্নেহ, ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণা আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। আমার জীবনের পথচলায় যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিক্ষক হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের প্রত্যেকের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অশেষ কৃতজ্ঞতা। শিক্ষক শুধু একটি পেশার নাম নয়; একজন শিক্ষক একটি জীবন বদলে দিতে পারেন। আর জীবনের এই দীর্ঘ পথে কিছু মানুষ শিক্ষক না হয়েও আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে যান। তাই এই মহান দিবসে আমার শিক্ষকদেরসহ বিশ্বের সকল শিক্ষকের প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা। শুভ শিক্ষক দিবস। আবুবকর সম্পদ জবি সংবাদদাতা, আরটিভি আহ্বায়ক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটি আরটিভি/এমএইচজে
শিক্ষক থেকে পথপ্রদর্শক: যাদের কাছে ঋণী আমি
আরও পড়ুন
২০ হাজারে মা ইলিশ নিধনের টোকেন বেচে নৌপুলিশ, বিক্রি চলে দিনদুপুরেই
চবি ক্যাম্পাসে ড্রোন ওড়ানোয় নিষেধাজ্ঞা
নিষেধাজ্ঞাতেও পদ্মাপাড়ে চলছে ইলিশের জমজমাট বেচাকেনা
হাইমচরে মা ইলিশ শিকারে বেপরোয়া জেলেরা