
নানা কারণে অনেক নারী সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা কিছুটা পিছিয়ে দেন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমতে থাকে। বিশেষ করে মধ্য ত্রিশের পর এ সম্ভাবনা দ্রুত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে বয়স বাড়লে ডিম্বাণুতে ক্রোমোজোমজনিত ত্রুটির ঝুঁকিও বাড়ে। ফলে গর্ভধারণ হলেও কিছু জটিলতার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের জন্য ডিম্বাণু সংরক্ষণের বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন এ প্রযুক্তির সুযোগ রয়েছে। তবে চাইলেই যে কোনো নারী ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলেই ভবিষ্যতে সন্তানধারণ নিশ্চিত হবে বিষয়টি এমন নয়।
বয়স কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ বছর বয়সের পর নারীর গর্ভধারণের সম্ভাবনা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। মধ্য ত্রিশের পর এই হার আরও দ্রুত কমে। ৪৫ বছর বয়সের দিকে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা খুবই কমে যায়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর গুণগত মানও কমতে পারে। একই সঙ্গে ডিম্বাণুতে ক্রোমোজোমাল অস্বাভাবিকতার ঝুঁকি বাড়ে। ফলে গর্ভধারণ হলে ভ্রূণের কিছু জিনগত বা জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
ডিম্বাণু সংরক্ষণ কীভাবে করা হয়?
ডিম্বাশয়ে থাকা ডিম্বাণুগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকতেই সেগুলো সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা যায়। এ জন্য প্রথমে হরমোন ইনজেকশনের মাধ্যমে একসঙ্গে একাধিক ডিম্বাণুকে পরিণত করে তোলা হয়। সাধারণত ৮ থেকে ১২ দিন পর নির্দিষ্ট সময়ে ডিম্বাণু সংগ্রহের প্রক্রিয়া করা হয়।
এ সময় রোগীকে ঘুমের ওষুধ বা চেতনানাশক দেওয়া হয়। এরপর ট্রান্সভ্যাজাইনাল সনোগ্রাফি বা টিভিএস প্রোবের সাহায্যে বিশেষ সূচের মাধ্যমে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়।
সংগৃহীত ডিম্বাণু তরল নাইট্রোজেনের অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় ফ্রিজারে সংরক্ষণ করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ১০ বছর বা তারও বেশি সময় ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।
পরবর্তী সময়ে ওই নারী সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সংরক্ষিত ডিম্বাণু স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আনা হয়। এরপর শুক্রাণুর মাধ্যমে ডিম্বাণুর নিষেক ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। পরে সেই ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপন করা হয়।
কারা ডিম্বাণু সংরক্ষণ করতে পারেন?
ক্যানসারে আক্রান্ত কোনো নারীর চিকিৎসার কারণে ভবিষ্যতে বন্ধ্যত্বের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে আগেই ডিম্বাণু সংরক্ষণ ভবিষ্যতে সন্তানধারণের একটি সম্ভাবনা ধরে রাখার সুযোগ দিতে পারে।
এ ছাড়া সুস্থ কোনো নারী ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে চাইলে তিনিও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন। তবে ডিম্বাণু সংরক্ষণ তাঁর জন্য উপযুক্ত কি না, তা নির্ভর করবে বয়স, শারীরিক অবস্থা, ডিম্বাণুর মজুত ও গুণগত মানসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলেই কি সন্তানধারণ নিশ্চিত?
না। ডিম্বাণু সংরক্ষণ ভবিষ্যতে সন্তানধারণের নিশ্চয়তা দেয় না। বিশেষ করে সংরক্ষিত ডিম্বাণু পরে গলিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় আনার সময় কিছু ডিম্বাণু নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এরপর নিষেক ও ভ্রূণ তৈরির ক্ষেত্রেও সাফল্য নিশ্চিত নয়।
এ ছাড়া বয়স বাড়ার সঙ্গে নারীর অন্যান্য শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপনের পরও গর্ভপাতসহ বিভিন্ন জটিলতার আশঙ্কা থাকতে পারে। ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলেও ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্মগত ত্রুটি সম্পূর্ণভাবে ঠেকানো সম্ভব এমন নিশ্চয়তাও নেই।
ঝুঁকি ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
ডিম্বাণু সংগ্রহের আগে দেওয়া হরমোন ইনজেকশনের কারণে কারও কারও ওভারিয়ান হাইপারস্টিমুলেশন সিনড্রোম (OHSS) হতে পারে। এতে ডিম্বাশয় ফুলে যাওয়া, শরীরে পানি জমা, পেটব্যথা, পেট ফাঁপা, বমি বমি ভাব, বমি বা পাতলা পায়খানা হতে পারে।
জটিলতা বেশি হলে দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়া, তীব্র পেটব্যথা, অনবরত বমি, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট কিংবা রক্ত জমাট বাঁধার মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া হরমোনের প্রভাবে ডিম্বাশয় বড় ও ভারী হয়ে গেলে সেটি নিজের অক্ষের ওপর মুচড়ে যেতে পারে, যাকে ওভারিয়ান টরশন বলা হয়। এটি জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয় এমন একটি পরিস্থিতি।
ডিম্বাণু সংগ্রহের সময় যোনিপথ বা ডিম্বাশয়ের রক্তনালিতে আঘাত লাগারও আশঙ্কা থাকে। বিরল ক্ষেত্রে মূত্রথলি, অন্ত্র বা আশপাশের রক্তনালিতেও আঘাত লাগতে পারে। সংক্রমণের ঝুঁকিও পুরোপুরি বাদ যায় না।
খরচও কম নয়
ডিম্বাণু সংরক্ষণের পুরো প্রক্রিয়া তুলনামূলক ব্যয়বহুল। ডিম্বাণু সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পাশাপাশি ফ্রিজারে সংরক্ষিত ডিম্বাণুর জন্য প্রতিবছর অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।
তাই ডিম্বাণু সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি। একই সঙ্গে যে প্রতিষ্ঠানে প্রক্রিয়াটি করানো হবে, সেখানে ডিম্বাণু সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ভবিষ্যতে ব্যবহারের প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ সব মিলিয়ে মোট খরচ সম্পর্কে আগেই বিস্তারিত জেনে নেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে, ডিম্বাণু সংরক্ষণ ভবিষ্যতে সন্তানধারণের একটি সুযোগ ধরে রাখার প্রযুক্তি হলেও এটি কোনো নিশ্চয়তা নয়। কার জন্য এটি উপযুক্ত, কখন করা ভালো এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি কতটা এসব সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের ভিত্তিতেই নেওয়া উচিত।
আরটিভি/এসকে


