
যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার ছিল মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমানের। বিশ্বের পরিচিত সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠান এএমডিতে চিপ নকশাবিদ হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। তবে দেশের তরুণ প্রকৌশলীদের নিয়ে বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে কাজ করার স্বপ্নে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন তিনি।
সেই স্বপ্ন থেকেই ২০০৭ সালে ঢাকায় মাত্র চারজন প্রকৌশলী নিয়ে যাত্রা শুরু করে ইউএলকাসেমি। প্রায় দুই দশকের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি এখন ৬০০-এর বেশি নকশা প্রকৌশলীর একটি আন্তর্জাতিক সেমিকন্ডাক্টর নকশা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের অন্যতম বড় চিপ নির্মাতা টিএসএমসির নকশা কেন্দ্র জোটেরও অংশ।
এনায়েতুর রহমান ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের জন্য পরে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। একপর্যায়ে সিলিকন ভ্যালিতে গিয়ে এএমডিতে সেমিকন্ডাক্টর চিপ নকশাবিদ হিসেবে কাজ শুরু করেন।
সেখানে কাজ করার সময় তিনি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের দ্রুত পরিবর্তন ও এশিয়ার সম্ভাবনা কাছ থেকে দেখেন। তখনই তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে তারাও বৈশ্বিক চিপ নকশা শিল্পে কাজ করতে পারবেন কি না। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী ও প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলী তৈরির বিষয়টি তাঁকে আশাবাদী করে।
শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার ছেড়ে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ২০০৭ সালে ঢাকায় চারজন প্রকৌশলী নিয়ে শুরু হয় ইউএলকাসেমির যাত্রা। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি করা হয়।
শুরুর পথ অবশ্য সহজ ছিল না। বাংলাদেশে তখন চিপ নকশা শিল্পের শক্তিশালী পরিবেশ ছিল না। দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি, আন্তর্জাতিক গ্রাহকের আস্থা অর্জন এবং নতুন এই প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলে ধরা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কাও সামলাতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
শুরুতে চিপের বিন্যাস নকশার কাজ দিয়ে এগোয় ইউএলকাসেমি। পরে ধীরে ধীরে চিপের কাঠামো নির্ধারণ, নকশা যাচাই, ভৌত নকশাসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত কাজে নিজেদের কার্যক্রম বিস্তৃত করে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে ইউএলকাসেমিতে ৬০০-এর বেশি নকশা প্রকৌশলী কাজ করছেন। চারটি দেশে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির নকশা কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যদের সম্মিলিত সিলিকন ভ্যালি অভিজ্ঞতা ২৫০ বছরেরও বেশি বলে জানিয়েছে ইউএলকাসেমি।
প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম এখন শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছে তারা। অ্যানালগ সার্কিট নকশা, বিশেষায়িত চিপ বিন্যাস, চিপের ভৌত নকশা, চিপের কাঠামো ও নকশা যাচাইসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
ইউএলকাসেমির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ৪০০-এর বেশি ভৌত নকশা সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ ছাড়া ১৫০টি এসআরএএম এবং ৫০টি ওটিপি নকশা সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাদের।
প্রতিষ্ঠানটির জন্য বড় মাইলফলক আসে ২০২১ সালে। ওই বছর ইউএলকাসেমি টিএসএমসির নকশা কেন্দ্র জোটের অংশীদার হয়। টিএসএমসির এই জোট চিপ বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের নকশা সমাধানের মাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবহারকারী গ্রাহকদের নকশা সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করে।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, দেশের মাটিতে বসেই একটি প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক চিপ নকশা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
তবে এনায়েতুর রহমানের লক্ষ্য শুধু নিজের প্রতিষ্ঠানকে বড় করা নয়। বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তোলার স্বপ্নও রয়েছে তাঁর। তাঁর মতে, শুরুতেই বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে চিপ তৈরির কারখানা স্থাপনের চেয়ে চিপ নকশা, নকশা যাচাই, পরীক্ষা ও প্যাকেজিংয়ের মতো ক্ষেত্রে সক্ষমতা তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য বেশি বাস্তবসম্মত।
এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে দেশের দক্ষ মানবসম্পদ। প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার প্রকৌশলী স্নাতক হন বলে সংশ্লিষ্ট খাতের বিভিন্ন আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক চিপ নকশা ও প্রকৌশল সেবা খাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন এনায়েতুর রহমান।
সেমিকন্ডাক্টর খাতকে সম্ভাবনাময় উচ্চপ্রযুক্তির রপ্তানি শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়েও সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। দক্ষ জনবল তৈরি, নীতিগত সহায়তা ও প্রযুক্তি খাতের পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে এই শিল্পের বিকাশের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রকৌশলী তৈরিতেও গুরুত্ব দিচ্ছে ইউএলকাসেমি। চিপের অ্যানালগ ও ডিজিটাল নকশা যাচাই এবং বিন্যাস প্রকৌশলের মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা তৈরির বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
একসময় এএমডির মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে চিপ নকশা করতেন এনায়েতুর রহমান। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজের দেশে গড়ে তুলেছেন এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে এখন শত শত বাংলাদেশি প্রকৌশলী বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য কাজ করছেন।
চারজন প্রকৌশলী নিয়ে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ আজ ৬০০-এর বেশি প্রকৌশলীর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, বাংলাদেশে বসেও উচ্চপ্রযুক্তির বৈশ্বিক শিল্পের জন্য প্রতিযোগিতামূলক কাজ করা সম্ভব।
আরটিভি/জেএমএ




