
‘বাবুসোনা তুমি কি পাগল? নাকি তোমার পেট খারাপ? ডাক্তার হতে চেয়ে আত্মহত্যা করার এত ইচ্ছে কেন?’ ‘এই বয়সে সাইকিয়াট্রিক প্রবলেম একেবারেই ঠিক না।’ ‘ছেলেটা মরতে চাইছে যখন মরতে দিন না।’ ‘মহামূর্খ ছাড়া কেউ ডাক্তার হতে চায় না।’ ডাক্তারি পড়ার স্বপ্ন দেখা মাধ্যমিকের দুই শিক্ষার্থীকে এই ভাষাতেই উপদেশ ও ‘পরামর্শ’ দিয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তারদের একাংশ।
মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধাতালিকার প্রথম দুই স্থান অর্জন করে ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নের কথা জানিয়েছিল দুই শিক্ষার্থী। একজনের ইচ্ছা ছিল বিনামূল্যে রোগীদের চিকিৎসা করা। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন ও ইচ্ছাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটাক্ষ ও বিদ্রুপ করে চিকিৎসকরা। এ ঘটনায় চিকিৎসক মহলে সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
পূর্ব মেদিনীপুরের মহম্মদপুর দেশপ্রাণ বিদ্যাপীঠের সৌগত দাস এবং ফালাকাটা গার্লস হাইস্কুলের শ্রেয়সী পাল ওই বছর মাধ্যমিক পরীক্ষার মেধাতালিকায় প্রথম দুই স্থান অধিকার করে। গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দুজনই ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার আগ্রহের কথা জানায়। শ্রেয়সী জানিয়েছিল, সে বিনা মূল্যে রোগীদের চিকিৎসা করতে চায়।
এরপরই তাদের বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটাক্ষ শুরু হয়। দুটি ক্ষেত্রেই প্রথম পোস্ট করেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রভাসপ্রসূন গিরি। সৌগতকে উদ্দেশ করে তিনি লেখেন, চিকিৎসক হতে চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং আত্মহত্যার প্রসঙ্গ টেনে বিদ্রুপ করেন।
ওই পোস্টে চিকিৎসকসহ ২৪ জন মন্তব্য করেন। তাদের অধিকাংশই চিকিৎসক। কেউ সৌগতকে অসুস্থ বলে কটাক্ষ করেন, কেউ আবার তাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। চিকিৎসক দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় মন্তব্য করেন, এই বয়সে মানসিক সমস্যা হওয়া ঠিক নয় এবং পরিবারের উচিত তাকে বোঝানো। দন্তচিকিৎসক দীপাঞ্জয় ঘোষও বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করেন। চিকিৎসক বিশ্বম্ভর আগরওয়ালের মন্তব্য ছিল, মহামূর্খ ছাড়া কেউ চিকিৎসক হতে চায় না।
শুধু সৌগত নয়, বিনামূল্যে চিকিৎসা করার ইচ্ছা প্রকাশ করায় শ্রেয়সীকেও কটাক্ষ করেন প্রভাসপ্রসূন গিরি। তার প্রশ্ন ছিল, বিনামূল্যে রোগী দেখলে চিকিৎসক নিজের জীবিকা নির্বাহ করবেন কীভাবে? ওষুধও কি বিনা মূল্যে কিনে দেবেন? সরকারি চাকরি করলে বেতন নেবেন না কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
এদিকে, চিকিৎসক গৌরগৌতম কর শ্রেয়সীর বাবা-মাকে উদ্দেশ করে মন্তব্য করেন, মেয়ের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রয়োজনে তার স্বামীকেও উপার্জন ছাড়া চিকিৎসাসেবায় সহায়তা করতে হবে।
প্রভাসপ্রসূন গিরি দাবি করেন, শ্রেয়সীর বিনা মূল্যে চিকিৎসার ঘোষণাকে ঘিরে ব্যাপক প্রশংসার প্রতিক্রিয়ায় তিনি পোস্টদুটি করেছিলেন। তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিকিৎসকদের মন্তব্য থেকেই তাদের হতাশার বিষয়টি স্পষ্ট।
তবে চিকিৎসকদের এমন মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন মেদিনীপুর কলেজের অধ্যাপক ফটিকচাঁদ ঘোষ। তার বক্তব্য, বিনা মূল্যে চিকিৎসা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে শ্রেয়সী অন্যায় কিছু বলেনি। এতে হয়ত একজন চিকিৎসকের বিপুল সম্পদ বা বিলাসী জীবন হবে না, তবে সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করা সম্ভব। অনেক চিকিৎসক এখনো পাঁচ বা ৫০ টাকায় রোগী দেখেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একটি কিশোরীর স্বপ্ন ও আবেগ নিয়ে উপহাস করার অধিকার কারও নেই বলে মন্তব্য করেন এই অধ্যাপক।
২০১৯ সালের ২২ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ঘিরে দুই মেধাবী শিক্ষার্থীর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন, বিশেষ করে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ইচ্ছা এবং তা নিয়ে চিকিৎসকদের একাংশের বিদ্রুপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সূত্র: সংবাদ প্রতিদিন
আরটিভি/এমএইচজে



