
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘস্থায়ী গরম। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে গর্ভবতী নারী ও অনাগত শিশুদের স্বাস্থ্যে। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব, উচ্চ রক্তচাপ এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই সন্তান জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। এমনকি গর্ভাবস্থার শেষ মাসে তাপপ্রবাহের সংস্পর্শে এলে অপরিণত সন্তান জন্মের হার ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গবেষণা, চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ এবং গর্ভবতী নারীদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের চিকিৎসা গবেষক দর্শনিকা লাখু গর্ভাবস্থায় তীব্র গরমের কারণে নিজেই নানা জটিলতার মুখে পড়েন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে জোহানেসবার্গে তাপমাত্রা বারবার ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। ওই সময় তার যমজ সন্তান নির্ধারিত সময়ের ছয় সপ্তাহ আগেই জন্ম নেয়।
লাখু বলেন, ‘উষ্ণ হয়ে ওঠা বিশ্বে কেউই নিরাপদ থাকবে না। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীরা।’
লাখু ও তার সহকর্মীরা প্রায় ২০০টি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখেছেন, গর্ভবতী নারীর বসবাসের এলাকার গড় তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে পরবর্তী সময়ে অপরিণত সন্তান জন্মের আশঙ্কা ৪ শতাংশ বাড়ে। আর তাপপ্রবাহের পরের সপ্তাহে এই ঝুঁকি ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অতিরিক্ত তাপমাত্রার সঙ্গে গর্ভপাত, জন্মগত ত্রুটি এবং প্লাসেন্টা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি গর্ভবতী নারীদের উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্লাম্পসিয়ার আশঙ্কাও বাড়তে পারে। প্রি-এক্লাম্পসিয়া গুরুতর একটি গর্ভকালীন জটিলতা, যা কিডনি বিকল, হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের কারণ হতে পারে।
চীনে ২০ লাখ নারীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় অস্বাভাবিক গরমের সঙ্গে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার ঝুঁকি ১৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত গরম সুস্থ গর্ভবতী নারীদেরও প্রভাবিত করতে পারে। তবে আগে থেকে শারীরিক জটিলতা থাকা, বেশি বয়সী ও দরিদ্র নারীদের পাশাপাশি ধূমপায়ীদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
মেক্সিকোর ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৮০ লাখের বেশি জন্মের তথ্য বিশ্লেষণেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, সন্তান জন্মের আগের চার সপ্তাহে তাপপ্রবাহ বা দীর্ঘস্থায়ী গরম থাকলে অপরিণত সন্তান জন্মের হার গড়ে প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ে। এর ফলে দেশটিতে প্রতিবছর গরমের মৌসুমে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি শিশু অপরিণত অবস্থায় জন্ম নিতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, তাপের তীব্রতা যত বেশি, ঝুঁকিও তত বেশি। মৃদু তাপের সংস্পর্শে অপরিণত সন্তান জন্মের হার প্রায় ৪ শতাংশ বাড়লেও সর্বোচ্চ তাপের সংস্পর্শে তা ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
এদিকে মেক্সিকো সিটির জুয়ারেজ হাসপাতালের চিকিৎসক হুয়ান রিভেরো করোনা জানান, ২০২৪ সালের গরমের মৌসুমে গর্ভবতী নারীদের মধ্যে প্রি-এক্লাম্পসিয়া, উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা এবং প্লাসেন্টা বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা বেড়েছিল। এসব পরিস্থিতিতে মা ও শিশুর জীবন বাঁচাতে অনেক সময় জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়।
শুধু মেক্সিকো নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে তাপপ্রবাহের সময় গর্ভপাত, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে গর্ভবতী নারীদের জরুরি বিভাগে যাওয়ার হার বেড়েছে। ব্রাজিলেও গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে তাপপ্রবাহের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ভারতেও গরমের সময় নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার ঘটনা বেড়েছে।
তবে অতিরিক্ত গরম কীভাবে গর্ভাবস্থায় জটিলতা তৈরি করে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন। তাদের ধারণা, শরীর ঠান্ডা রাখতে অতিরিক্ত গরমের সময় মায়ের শরীর প্লাসেন্টায় রক্ত সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে। এতে ভ্রূণের ওপর চাপ তৈরি হয়। এ ছাড়া তাপমাত্রা হরমোন নিঃসরণে প্রভাব ফেলতে পারে এবং ভ্রূণের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গঠনের সময় জিনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার উইটওয়াটারস্র্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাতৃস্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষক ম্যাথিউ চেরশিচ বলেন, যমজ গর্ভধারণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গরমের ঝুঁকি অনেক বেশি।
গবেষকদের মতে, গরমের প্রভাব সব গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে এক রকম নয়। বয়স, শারীরিক গঠন, আবহাওয়ার আর্দ্রতা, বাতাস চলাচল, বাসস্থানের ধরন এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণের সুবিধার ওপর ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করে। গর্ভাবস্থার কোন পর্যায়ে তাপপ্রবাহ দেখা দিচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে অতিরিক্ত গরম জন্মগত ত্রুটি ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে সন্তান জন্মের আগের সপ্তাহে তাপমাত্রা বাড়লে মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে গর্ভবতী নারী ও অনাগত শিশুর সুরক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের রহিমা মুসা মা ও শিশু হাসপাতালে এ বিষয়ে গবেষণা চলছে। সেখানে বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে গর্ভবতী নারীদের প্রতিদিনের তাপমাত্রার সংস্পর্শ পরিমাপ করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের রক্তচাপ, রক্ত, বুকের দুধ, প্লাসেন্টা ও নাভিরজ্জুর নমুনা পরীক্ষা করে অতিরিক্ত গরমের প্রভাব বোঝার চেষ্টা করছেন গবেষকেরা।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, গর্ভবতী নারীদের যথাসম্ভব অতিরিক্ত গরম এড়িয়ে চলতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে, ঢিলেঢালা পোশাক পরতে হবে এবং সম্ভব হলে ঠান্ডা পরিবেশে থাকতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর পাশাপাশি গরমের কারণে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
গবেষক দর্শনিকা লাখু গর্ভবতী নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির নীতিমালা আরও কার্যকর করার ওপরও জোর দিয়েছেন। তার মতে, শুধু সন্তান জন্মের পর নয়, গর্ভাবস্থায়ও নারীদের ছুটির সুযোগ থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি সহজলভ্য বিশুদ্ধ পানি ও অস্থায়ী শীতলীকরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহের ব্যাপ্তি ও সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ১৯৬০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে মাত্র ৫০টি বড় তাপঝড়ের ঘটনা দেখা গেলেও চলতি দশকে এখন পর্যন্ত এ সংখ্যা ৬৬৫ ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে বড় তাপঝড়টি এক বছর ধরে পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকায় প্রভাব ফেলেছিল।
গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই পরিস্থিতিতে গর্ভবতী নারী ও অনাগত শিশুদের সুরক্ষায় ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, কর্মক্ষেত্র এবং সরকারি নীতিমালায় পরিবর্তন আনা জরুরি। তবে অতিরিক্ত গরমের সঙ্গে গর্ভাবস্থার বিভিন্ন জটিলতার সম্পর্ক পাওয়া গেলেও কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তাপমাত্রাকেই জটিলতার একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না।
আরটিভি/এসকে




