
মৃত্যুর পর দাফন বা সৎকারের রীতি দেশ ও সংস্কৃতিভেদে ভিন্ন। তবে ইউরোপের কিছু অঞ্চলে একসময় প্রচলিত ছিল অদ্ভুত এক বিশ্বাস—কবর দেওয়া মৃত ব্যক্তিও নাকি ফিরে আসতে পারেন জীবিতদের মাঝে!
মনে করা হতো-তারা কবর ছেড়ে বেরিয়ে এসে মানুষের রক্ত পান করতে পারে, ছড়িয়ে দিতে পারে রোগ কিংবা ডেকে আনতে পারে অমঙ্গল। আর সেই ভয় থেকেই মৃতদেহকে কবর দেওয়ার সময় নেওয়া হতো অদ্ভুত সব ব্যবস্থা।
পোল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ড্রসকো গ্রামের একটি পুরোনো কবরস্থানে এমনই কিছু সমাধির সন্ধান পেয়েছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে সেখানে খননকাজ চালিয়ে তারা প্রায় ২৮৫টি কঙ্কাল উদ্ধার করেন। এর মধ্যে ছয়টি কঙ্কালের সমাধিরীতি ছিল বেশ অস্বাভাবিক। কয়েকটি কঙ্কালের গলা কিংবা পেটের ওপর আড়াআড়িভাবে রাখা হয়েছিল কাস্তে। আবার কয়েকটির থুতনির নিচে রাখা হয়েছিল বড় পাথর।
কেন এমন ব্যবস্থা?
গবেষকদের ধারণা, এর উদ্দেশ্য ছিল মৃত ব্যক্তিকে কবর থেকে ফিরে আসা ঠেকানো। কেউ যদি কবর থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন, তাহলে গলায় রাখা কাস্তে তার শরীর কেটে ফেলবে। আর মুখের নিচে রাখা পাথর তাকে কামড়ানো কিংবা অন্যের ক্ষতি করা থেকে বিরত রাখবে। অর্থাৎ মৃত্যুর পরও যেন কেউ বিপদ হয়ে ফিরে আসতে না পারেন, তারই আয়োজন!
২০১৪ সালে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী প্লস ওয়ানে প্রকাশিত এক গবেষণায় ড্রসকোর এসব কবরের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। গবেষকেরা মনে করেন, সতেরো শতকের কলেরা মহামারি এবং অস্বাভাবিক মৃত্যুকে ঘিরে মানুষের মধ্যে এমন আতঙ্ক তৈরি হয়ে থাকতে পারে। কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন, প্রথম মারা যাওয়া ব্যক্তি পরবর্তী মৃত্যুর জন্য দায়ী। ফলে মৃত ব্যক্তিকেই ভাবা হতো অমঙ্গলের উৎস।
পোল্যান্ডের পিয়েন গ্রামের একটি কবরের গল্পও কম চমকপ্রদ নয়। ২০২২ সালে সেখানে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এক তরুণীর কঙ্কাল উদ্ধার করেন। তার গলার কাছে রাখা ছিল কাস্তে। বাঁ পায়ের বড় আঙুলে লাগানো ছিল একটি ত্রিভুজাকৃতির তালা। গবেষকেরা তাকে পরে ‘জোসিয়া’ নামে উল্লেখ করেন। ধারণা করা হয়, কাস্তে দিয়ে তার ফিরে আসার পথ আটকানোর পাশাপাশি তালা দিয়ে প্রতীকীভাবে তাকে কবরের সঙ্গে বেঁধে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল।
শুধু কাস্তে কিংবা তালাই নয়, ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে মৃত ব্যক্তিকে উপুড় করে কবর দেওয়া, মুখে পাথর রাখা, শরীরের ওপর ভারী পাথর চাপিয়ে দেওয়ার মতো রীতিরও সন্ধান মিলেছে। তবে এসব সমাধির পেছনে সব সময় ভ্যাম্পায়ার-ভীতি কাজ করেছে, এমনটি নিশ্চিত করে বলা যায় না। সামাজিক অবস্থান, ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা অস্বাভাবিক মৃত্যুও এর কারণ হতে পারে।
মৃত মানুষ সত্যিই কবর থেকে ফিরে আসত কি না, তার কোনো প্রমাণ অবশ্য নেই। কিন্তু একসময় মানুষের মনে এই ভয় এতটাই গভীর ছিল যে, মৃত্যুর পরও নিশ্চিন্তে থাকতে দেওয়া হতো না কাউকে। কবরের ভেতরেও যেন পাহারা বসিয়ে রাখা হতো! জীবিত মানুষের আতঙ্ক যে কখনো কখনো মৃত মানুষের জন্যও কত বিচিত্র আয়োজন করতে পারে, পোল্যান্ডের এসব কবর তারই সাক্ষী।
সূত্র: হিস্ট্রি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন
আরটিভি/ এসকেডি




