
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বৃষ্টিপাত বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে এল নিনো। এর মধ্যেই অঙ্গরাজ্যটির ৫৭টি বাঁধের অবস্থা নাজুক বলে উঠে এসেছে এক নিরীক্ষায়। এসব বাঁধের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ৪০টি ভেঙে পড়লে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে। পাশাপাশি ২৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রকাশিত নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়ার ৫৭টি বাঁধকে দুর্বল বা অসন্তোষজনক অবস্থায় পাওয়া গেছে। আগের হিসাবের তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছে। পুরোনো বাঁধগুলোর অবস্থা নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
রাজ্যজুড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো ছড়িয়ে থাকলেও ঘনবসতিপূর্ণ উপকূলীয় শহরগুলোর আশপাশে এগুলোর সংখ্যা বেশি। বিশেষ করে সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরীয় অঞ্চল, সান ডিয়েগো ও লস অ্যাঞ্জেলেস এলাকায় বাঁধ ভেঙে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
বাঁধের নিরাপত্তায় আইন থাকলেও ব্যবস্থা নেই
২০১৭ সালে অরোভিল বাঁধের পানি নিষ্কাশন পথের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর প্রায় দুই লাখ মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়েছিল। ওই ঘটনার পর বাঁধের নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনকারী মালিকদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাজ্য কর্তৃপক্ষকে দেয় আইনপ্রণেতারা।
তবে নিরীক্ষায় দেখা গেছে, নিরাপত্তার শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে ৪৪টি বাঁধের মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও রাজ্যের পানি সম্পদ বিভাগ এখন পর্যন্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। নিরীক্ষকের মতে, নিরাপত্তার ঘাটতি দূর করতে ব্যর্থ বাঁধমালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় জননিরাপত্তার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
পানি সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২২ সালে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় আলাদা প্রয়োগকারী শাখা যথাযথভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া শুনানিতে নিজেদের সিদ্ধান্তের পক্ষে লড়াই করার ব্যয় বহন করতে পারবেন কি না, তা নিয়েও কর্মকর্তাদের উদ্বেগ রয়েছে।
৩০ বছরেও মেরামত হয়নি বিশাল গর্ত
নিরীক্ষায় এমন একটি বাঁধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার পানি নিষ্কাশন পথে ৪৭ ফুট চওড়া একটি গর্ত রয়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সেটি মেরামত করা হয়নি। নিরীক্ষকের হিসাব অনুযায়ী, ওই বাঁধের ত্রুটির কারণে বন্যা হলে প্রায় ৩০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন এবং ৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।
তবে নিরাপত্তার স্বার্থে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বাঁধটির নাম প্রকাশ করা হয়নি। রাজ্যের পানি সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করলে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। অবশ্য বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রতিটি বাঁধের ঝুঁকির মাত্রা ও অবস্থা প্রকাশ করা হয়।
মেরামতে প্রয়োজন ২৮০০ কোটি ডলার
ক্যালিফোর্নিয়ার এক হাজার ২২০টির বেশি বাঁধের নিরাপত্তা তদারক করে রাজ্যের পানি সম্পদ বিভাগ। তবে এসব বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, পানি সংস্থা এবং বেসরকারি মালিকদের ওপর। নাজুক অবস্থায় থাকা কিছু বাঁধের মালিক সরকারি সংস্থাও।
অনেক বাঁধ কয়েক দশক আগে নির্মিত হয়েছে, যখন নিরাপত্তার মানদণ্ড তুলনামূলক দুর্বল ছিল। বাঁধের মালিকদের নিরাপত্তা মেরামতের জন্য আগাম অর্থ জমা রাখার বাধ্যবাধকতাও ছিল না। ফলে কংক্রিট ক্ষয়ে যাওয়া, পলি জমা এবং বন্যার পানিতে পানি নিষ্কাশন পথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিলেও অনেক মালিকের মেরামতের সামর্থ্য নেই।
নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, নাজুক অবস্থায় থাকা বাঁধগুলো মেরামত করতে প্রায় ২৮০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে। অথচ ২০২৪ সালে একটি গণভোটের মাধ্যমে মেরামত কর্মসূচির জন্য ৪৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার বরাদ্দ আসে। এছাড়া চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থা ক্যালিফোর্নিয়াকে ৬ লাখ ২৯ হাজার ১৯৮ ডলার অনুদান দিয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় এ অর্থ খুবই সামান্য।
জরুরি পরিকল্পনাও অসম্পূর্ণ
নিরীক্ষক আইনপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, উচ্চ ও অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকির বাঁধগুলোর মালিকদের জন্য রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের পরিকল্পনা জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে রাজ্য কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ বন্ধ করে দেওয়ার আইনি ক্ষমতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এদিকে বন্যা মোকাবিলার জরুরি পরিকল্পনাও অসম্পূর্ণ রয়েছে। বাঁধ ভেঙে গেলে মানুষ ও সম্পদ রক্ষায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা উল্লেখ করে ২৪৫টি বাঁধের জরুরি পরিকল্পনা এখনো অনুমোদন করেনি রাজ্যের জরুরি সেবা দপ্তর। বাঁধমালিকেরা প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষ না করায় এসব পরিকল্পনা আটকে আছে। এ ক্ষেত্রে আইনেও নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।
রাজ্যের পানি সম্পদ বিভাগের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা বিভাগের উপপরিচালক লরা হলেন্ডার বলেছেন, নিরীক্ষকের সঙ্গে তাদের বিভাগ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। তবে প্রতিবেদনের কিছু পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশের সঙ্গে তারা একমত নন। তারপরও সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, জননিরাপত্তা রক্ষা তাদের বিভাগের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বন্যার ঝুঁকি কমাতে বাঁধের নিরাপত্তা ও বন্যা প্রতিরোধী বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: এনবিসি নিউজ
আরটিভি/জেএমএ


