
যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো উপসাগরে ২০১০ সালে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম বা বিপি পরিচালিত তেলকূপে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর সামুদ্রিক প্রাণীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্ঘটনার পর উপসাগরের গভীর সমুদ্রের একটি এলাকায় মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যায়। এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এসব প্রাণীর সংখ্যা আগের অবস্থায় ফেরেনি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী পিএনএএসে প্রকাশিত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকেরা জানান, ২০১০ সালের দুর্ঘটনার পর সমুদ্রের ওপরের আলো পৌঁছানো অংশ ও গভীর অন্ধকারের মাঝামাঝি এলাকায় সামুদ্রিক প্রাণীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, তেল ছড়িয়ে পড়ার পরের বছর থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ওই এলাকায় মাছের সংখ্যা কমেছে ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। চিংড়ি ও তিমির গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য ক্রিলসহ খোলসযুক্ত প্রাণীর সংখ্যা কমেছে ৬২ শতাংশ। অন্যদিকে স্কুইড ও অক্টোপাসের মতো বড় প্রাণীর সংখ্যা কমেছে ৫৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
গবেষকেরা সমুদ্রের এই মধ্যবর্তী অঞ্চলকে ‘গোধূলি অঞ্চল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে বিস্তৃত এ এলাকায় অসংখ্য প্রাণী বাস করে। এসব প্রাণী আবার ডলফিন ও তিমির মতো বড় সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য হিসেবে কাজ করে। তবে বিশাল এই বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান এখনো সীমিত।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ও নোভা সাউথইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ট্রেসি সাটন জানান, ২০১০ সালের তেল ছড়িয়ে পড়ার আগে মেক্সিকো উপসাগরের ওই এলাকায় সামুদ্রিক প্রাণীর সংখ্যা নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি।
২০১১ সালে গবেষকেরা বিভিন্ন গভীরতায় ছয় ধরনের জাল এবং শব্দতরঙ্গভিত্তিক যন্ত্র ব্যবহার করে ওই এলাকার সামুদ্রিক প্রাণীর সংখ্যা পরিমাপ করেন। সাড়ে তিন বছর পর একই জায়গায় একই পদ্ধতিতে গবেষণা চালিয়ে তারা দেখেন, প্রাণীর সংখ্যা আগের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে।
সাটন বলেন, প্রথমে তারা তাপমাত্রা, অক্সিজেনের সরবরাহ ও খাদ্যের পরিমাণের মতো প্রাকৃতিক কারণগুলো পরীক্ষা করেন। কিন্তু এসব কারণে প্রাণীর সংখ্যা কমার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ওই সময়ে বড় ধরনের যে ঘটনা ঘটেছিল, তা হলো তেল ছড়িয়ে পড়া। তাই এটিকেই প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ার সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ বলে মনে করছেন তারা।
২০১৫ সালের পরও গবেষকেরা ওই এলাকায় নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করেছেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, সামুদ্রিক প্রাণীর সংখ্যা দীর্ঘ সময় ধরে কমই ছিল। ২০২২ ও ২০২৩ সালে সামান্য বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা গেলেও তা পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল না এবং স্থায়ীও হয়নি।
গবেষকেরা তিন ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে প্রাণীর সংখ্যা কমার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে জালে ধরা প্রাণীর সংখ্যা, শব্দতরঙ্গভিত্তিক যন্ত্রে পাওয়া তথ্য এবং জিনগত বিশ্লেষণ। জিনগত গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্য কমেছে, যা নিজেদের মধ্যে প্রজননের কারণে হতে পারে।
২০১০ সালের ২০ এপ্রিল ডিপওয়াটার হরাইজন তেলখনন স্থাপনায় বিস্ফোরণে ১১ জন কর্মী নিহত হন। এরপর প্রায় পাঁচ মাস ধরে সেখান থেকে তেল ও গ্যাস বের হতে থাকে। গবেষকদের মতে, বিস্ফোরণ ও দূষণের কারণে অনেক সামুদ্রিক প্রাণী তাৎক্ষণিকভাবে মারা যায়। বেঁচে যাওয়া প্রাণীদের ডিমেও দূষিত পদার্থ জমা হতে পারে, যা পরবর্তী প্রজন্মের প্রাণীদের দুর্বল করে দেয়।
গবেষণার সহলেখক ও সাউথ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক রসায়নবিদ ইসাবেল রোমেরো বলেন, ছড়িয়ে পড়া তেল এবং তা পরিষ্কারে ব্যবহৃত রাসায়নিক—দুটিই মাছের ক্ষতি করেছে। তবে ক্ষতির ধরন আলাদা। তেল বেশি বিষাক্ত, আর তেল ছড়িয়ে দেওয়ার রাসায়নিক সেটিকে ছোট ছোট কণায় ভেঙে গভীর পানিতে থাকা প্রাণীদের দূষণের সংস্পর্শ বাড়িয়ে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিজ্ঞান তহবিলের সাবেক পরিচালক ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানী রিটা কোলওয়েল বলেন, তেল পরিষ্কারে ব্যবহৃত রাসায়নিকের বদলে তেল ভেঙে ফেলতে সক্ষম অণুজীবের কার্যক্রম বাড়ায়—এমন উপাদান ব্যবহারের বিষয়টি ভবিষ্যতের দুর্ঘটনায় বিবেচনা করা উচিত।
বিপির মুখপাত্র পল তাকাহাশি বলেন, এ দুর্ঘটনা প্রতিষ্ঠানটিকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে প্রতিষ্ঠানটি নানা পরিবর্তন এনেছে বলেও জানান তিনি।
গবেষকেরা ক্রিলের সংখ্যা ৭২ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য পেয়েছেন। নীলচে-সবুজ আলো ছড়ানো বিশেষ ধরনের ল্যান্টার্নফিশের সংখ্যাও আগের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। মাথায় আলোর অঙ্গ ও শিকার আকর্ষণের জন্য বিশেষ অঙ্গ থাকা ড্রাগনফিশের সংখ্যাও ব্যাপকভাবে কমেছে।
সাটনের মতে, এসব প্রাণী সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি। অনেক সামুদ্রিক প্রাণী এগুলো খেয়ে বেঁচে থাকে। ফলে এদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পুরো সামুদ্রিক পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত নন, এমন সামুদ্রিক বিজ্ঞানীরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। স্ক্রিপস ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফির বিজ্ঞানী ক্যাটলিন ফ্রেজার বলেন, সমুদ্রের গভীর অংশ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান মহাকাশের তুলনায়ও অনেক ক্ষেত্রে কম। এসব অঞ্চলে সরাসরি দেখা কঠিন বলে সেখানে সবকিছু স্বাভাবিক আছে বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু নতুন গবেষণায় গুরুতর ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
২০২৪ সালে ফ্রেজারের প্রকাশিত আরেক গবেষণায় মেক্সিকো উপসাগরের তিমি ও ডলফিনের সংখ্যা কমে যাওয়ার তথ্য উঠে আসে। ওই গবেষণায় কিছু ক্ষেত্রে প্রাণীর সংখ্যা ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞানী বরিস ওয়ার্ম বলেন, একটি খননযন্ত্রের ত্রুটি হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তেল ছড়িয়ে পড়ার ১৩ বছর পরও ক্ষতিগ্রস্ত প্রাণীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে ফিরে না আসা উদ্বেগজনক।
বিজ্ঞানীদের মতে, গভীর সমুদ্রে তেল উত্তোলন ও খনিজ আহরণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করার সময় এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সূত্র: এনবিসি নিউজ
আরটিভি/জেএমএ


