ঢাকা শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

গুলিতে স্বামী নিহত, সাক্ষী দেওয়ায় মেয়েকে ধর্ষণ করেন আ.লীগের নেতারা

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

জুলাই বিপ্লবে ছাত্রজনতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে শহীদ হন জসিম উদ্দিন। স্বামী হত্যার বিচার চাইতে ট্রাইব্যুনালে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিতে যান স্ত্রী। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মেয়েকে ধর্ষণ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা। ঘটনা জানাজানি হলে অপমানে ও মানসিক ট্রমায় মেয়ে আত্মহত্যা করে।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ স্বামী ও সন্তানহারা রুমা বেগমের জবানবন্দিতে ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা উঠে আসে।

জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস এবং সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।

জবানবন্দিতে রুমা বেগম বলেন, আমি শহীদ জসিম উদ্দিনের স্ত্রী। আমার বর্তমান বয়স আনুমানিক ৪১ বছর। আমার স্বামী মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র ‘পদক্ষেপ’ এনজিওতে ড্রাইভার হিসেবে চাকরি করত। আমার স্বামী ১৮ জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়ে ধাওয়া খেয়ে ফিরে আসেন। ওইদিন তিনি ধানমন্ডির কোনো এক জায়গায় গাড়ি রেখে এসেছিলেন। পরদিন সকালে আমি তাকে বাসা থেকে বের হতে দিচ্ছিলাম না, কারণ তিনি আন্দোলনে গিয়ে আঘাত পান। পরে জুমার নামাজের কথা বলে বাসা থেকে বের হন তিনি। সন্ধ্যা ৭টার দিকে এক প্রতিবেশী ফোন করে জানায় আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ হয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফ্লোরে পড়ে আছে।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, একথা শোনার পর আমি পাশের বাসার ভাড়াটিয়ার থেকে আরও ১০ হাজার টাকা নিই। এরপর আমার চাচা শ্বশুর সালাম গাজীকে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে রওনা হই। পথে পুলিশ আমাদেরকে বাধা দেয়। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পৌঁছে অপারেশন থিয়েটারের সামনে আমার স্বামীকে রক্তাক্ত অবস্থায় একটি ট্রলিতে পড়ে থাকতে দেখি। তখন আমার স্বামীর জ্ঞান ছিল। সে বলেছিলো, গুলিতে তার দুটি আঙ্গুল উড়ে গেছে এবং বুকে একটি গুলি লেগেছে। আমি দেখতে পাই, গুলিটি বুক দিয়ে ঢুকে পেছন দিয়ে বের হয়ে গেছে। আমার স্বামীর বুকের ক্ষতস্থানে এবং পিঠে গুলি বের হওয়ার স্থানে গজ ভরে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে; তাতেও রক্ত বের হচ্ছিলো। আমার স্বামী আরও জানায়, জুম্মার নামাজ পড়ে তিনি আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য মোহাম্মদপুর আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে যায়। সেখানে আমার স্বামী পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন।

জবানবন্দিতে শহিদ জসিমের স্ত্রী বলেন, ডাক্তার জানায় অপারেশন করতে রক্ত লাগবে। আমার স্বামীর জ্ঞান ছিল, তাই তার অপারেশন হয় সবার শেষে। আনুমানিক রাত আড়াইটার সময় অপারেশন শেষে তাকে অবজারবেশন রুমে রাখে। কিন্তু তার শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। ব্যান্ডেজ খুলে দেখি তার দুটি আঙ্গুল নেই এবং সেখানে পচন ধরে গেছে। বিষয়টি ডাক্তারদের জানালে তারা আঙ্গুল কেটে ফেলে। পরে তার বুকে আরেকটি অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পর আমার স্বামীর আর জ্ঞান ফেরেনি। এরপর তাকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়। ২৯ জুলাই সকাল ৯টার দিকে তিনি মারা যান।

জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ছাড়া আমার স্বামীর মরদেহ দিতে না চাইলে আমরা বনানী থানায় যাই। বক্ষব্যাধি হাসপাতালটি মহাখালী এলাকায় অবস্থিত। বনানী থানা ক্লিয়ারেন্স না দিয়ে আমাদেরকে মোহাম্মদপুর থানায় যেতে বলেন। মোহাম্মদপুর থানায় আসলে তারা জানায় আমাদের এখানে কোনো গুলি হয়নি, আপনারা বনানী থানায় যান। এভাবে আমরা ওইদিন সারারাত এবং পরদিন দুপুর পর্যন্ত ২-৩ বার বনানী এবং মোহাম্মদপুর থানায় যাওয়া আসা করি। এরপর দুপুর ৩টার দিকে আমি হাসপাতালের সামনে তিনটি ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে কান্নাকাটি করতে থাকি এবং আমার স্বামীর মরদেহ দিতে অনুরোধ করি। তখন কোলে সাত মাসের একটি বাচ্চা ছিল। এরপর আবার বনানী থানায় গেলে ওসি বলে তার কিছু করার নেই, উপর মহলের হুকুমে ক্লিয়ারেন্স দিতে পারছে না। পরবর্তীতে মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করি। কারণ শর্ত ছিল, মামলা দায়ের না করলে মরদেহ দিবে না। পরে ৩১ জুলাই মরদেহ পাই। এরপর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে মরদেহ দাফন করি।

জবানবন্দিতে রুমা বেগম আরও বলেন, আমার মেয়ে লামিয়ার ফোনে দেখতে পায় খুনি হাসিনা ৫ আগস্ট পালিয়ে গেছে। এর কিছুদিন পর আমি ঢাকায় আসি। তখন ফেসবুক, ইউটিউব, পত্র-পত্রিকা, ভাইরাল হওয়া ভিডিও এবং স্থানীয় লোকমুখে জানতে পারি, শেখ হাসিনা, মেয়র তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানকদের নির্দেশে পুলিশ কমিশনার হাবিব, প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, বিপ্লব কুমার সরকার, রওশানুল হক সৈকতদের সহায়তায় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী শেখ বজলুর রহমান, আজিজুল হক রানা, এম এ সাত্তার, তোফায়েল সিদ্দিকি তুহিন, ইসমাইল হোসেনসহ আরও অনেকে আমার আমার স্বামী হত্যার সঙ্গে জড়িত। আমি ১৫ বছর ধরে মোহাম্মদপুর শেখেরটেক এলাকায় ভাড়া থাকি। আমি এদেরকে আগে থেকেই চিনি।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। আমি তাকে জবানবন্দি দিতে ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ ঢাকায় আসি। আমার বড় মেয়ে লামিয়া তখন দুমকি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিল। তাই তাকে বাড়িতে রেখে আসি। ১৮ মার্চ মেয়ে বাবার কবর জিয়ারত করে আসার পথে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়। আমি এই ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী দিতে আসার কারণে তারা আমার মেয়েকে ধর্ষণ করে। এ খবর সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার পর মেয়ে মানসিক ট্রমায় আক্রান্ত হয়ে আত্মহত্যা করে। আমি আমার স্বামীর হত্যার বিচার চাই।

আরটিভি/এসএস

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
অপ্রতীম হত্যা মামলায় চার্জশিট দাখিল, চার আসামির মধ্যে দুইজন কিশোর
গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকালে অপ্রতীমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়সংলগ্ন সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন বনে যায় তুহিন। সেখানে অপ্রতীমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে সে বাধা দেয়।
অপ্রতীম হত্যা মামলায় চার্জশিট দাখিল, চার আসামির মধ্যে দুইজন কিশোর
সাংবাদিক আলিফ হত্যা মামলায় আরও এক সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার
নেত্রকোণার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির ওরফে আলিফ হত্যা মামলায় আশিকুর রহমান প্রাঙ্গন (২১) নামে আরও এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি-১৪, ময়মনসিংহ।
সাংবাদিক আলিফ হত্যা মামলায় আরও এক সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশ্নফাঁস, বিএআরসির সহকারী পরিচালক গ্রেপ্তার
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় করা মামলায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সহকারী পরিচালক সোহাগ ফকিরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশ্নফাঁস, বিএআরসির সহকারী পরিচালক গ্রেপ্তার
ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের এমডি দিলীপ আগারওয়ালা গ্রেপ্তার
ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগারওয়ালাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের এমডি দিলীপ আগারওয়ালা গ্রেপ্তার
বিশ্বজিৎ হত্যা মামলা: ৮ ডিসেম্বর আপিলের চূড়ান্ত শুনানি
২০১২ সালে পুরান ঢাকার দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল শুনানি আগামী ৮ ডিসেম্বর।
বিশ্বজিৎ হত্যা মামলা: ৮ ডিসেম্বর আপিলের চূড়ান্ত শুনানি
আরও পড়ুন
শতশত মরদেহের ভেতর থেকে পোশাক দেখেই ছেলেকে চিনেছিলেন মা
‘ভয় পাইছে, ভয় পাইছে’ বলতেই পলককে থামালেন ট্রাইব্যুনাল
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে বিস্ফোরণ, মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য
কাদেরসহ শীর্ষ ৭ নেতার ফাঁসির রায়, আদালতের সামনেই ককটেল বিস্ফোরণ