স্কুলের টিফিন এখন আর শুধু খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক শিশুর কাছে এটি এখন তুলনা, প্রতিযোগিতা এবং হাসাহাসির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সহপাঠীর সাজানো টিফিন দেখে নিজের সাধারণ ঘরোয়া খাবার নিয়ে অস্বস্তিতে পড়ছে অনেক শিশু। এর প্রভাব পড়ছে শুধু তাদের মনেই নয়, বাড়ছে অভিভাবকদের ওপরও মানসিক চাপ।
অনেক শিশু এখন বাড়ি ফিরে বাবা-মাকে বলছে, তাদের টিফিন অন্যদের মতো সুন্দর নয়। কেউ কেউ টিফিন না খেয়েই বাড়ি ফিরছে। কারণ সহপাঠীদের সামনে সাধারণ খাবার বের করতে তারা লজ্জা পাচ্ছে। অনেক সময় এই বিষয়টি নিয়ে সহপাঠীদের ঠাট্টা-বিদ্রূপেরও শিকার হতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো টিফিনের ছবি ও ভিডিও দেখার প্রবণতা শিশুদের মধ্যে নতুন ধরনের চাহিদা তৈরি করছে। ফলে সাধারণ রুটি, পরোটা, সবজি বা ঘরোয়া খাবারের বদলে নানা রকম সাজানো খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন অভিভাবকেরা। কর্মব্যস্ততার মধ্যেও অনেক মা-বাবা ভোরে উঠে সন্তানের জন্য আকর্ষণীয় টিফিন তৈরি করছেন। কিন্তু সবার পক্ষে প্রতিদিন সময়, শ্রম ও অতিরিক্ত খরচ করে এমন টিফিন বানানো সম্ভব হয় না। এতে অনেকেই মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা সহপাঠীদের মতো হতে চায়। অন্যদের মতো কিছু না থাকলে তারা নিজেকে পিছিয়ে পড়া মনে করে। এই মানসিকতা থেকেই টিফিন নিয়ে অস্বস্তি, অভিমান বা রাগের মতো আচরণ দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় শিশুদের মনে হয় সুন্দর টিফিন মানেই বেশি গ্রহণযোগ্যতা। তাই টিফিনের বাক্সও ধীরে ধীরে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠছে। এর ফলে খাবারের পুষ্টিগুণের চেয়ে বাহ্যিক সাজসজ্জাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে এই সমস্যার সমাধানও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই বোঝাতে হবে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা সবকিছু বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়। একই সঙ্গে পরিবারে কী সম্ভব আর কী সম্ভব নয়, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে।
অভিভাবকদের প্রতি পরামর্শ, সন্তানের সব চাওয়া সঙ্গে সঙ্গে পূরণ না করে নির্দিষ্ট দিনে বিশেষ টিফিনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি ঘরোয়া ও পুষ্টিকর খাবারকেই গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনে সেই খাবারও একটু সুন্দরভাবে সাজিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিফিনের আসল উদ্দেশ্য হলো শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা, অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা নয়। তাই টিফিন নিয়ে অকারণ চাপ না বাড়িয়ে, শিশুর মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আরটিভি/জেএমএ



