
ব্যবসায়িক কাজ, দ্রুত যাতায়াত, পর্যটন কিংবা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য হেলিকপ্টার কেনার আগ্রহ রয়েছে অনেকের। তবে ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার কেনা শুধু বড় অঙ্কের অর্থ খরচের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, পাইলট, বিমা, হ্যাঙ্গার, প্রশিক্ষণ এবং পরিচালনসংক্রান্ত নানা ব্যয়।
হেলিকপ্টারের দাম মডেলভেদে ব্যাপকভাবে ভিন্ন হয়। আসনসংখ্যা, ইঞ্জিনের ধরন, উড্ডয়ন সক্ষমতা, রেঞ্জ, অ্যাভিওনিকস এবং অতিরিক্ত সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করে এর দাম কয়েক লাখ ডলার থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
ব্যক্তিগত ব্যবহারে বহুল পরিচিত হেলিকপ্টারগুলোর একটি হলো Robinson R22। এটি তুলনামূলক ছোট ও হালকা হেলিকপ্টার। প্রশিক্ষণ ও ব্যক্তিগত ব্যবহারে এটি জনপ্রিয়। এতে চার সিলিন্ডারের Lycoming O-360 পিস্টন ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়।

এর চেয়ে বড় Robinson R44 সিরিজে চারজন পর্যন্ত যাত্রী বহনের সুবিধা রয়েছে। R44 Raven II মডেলে Lycoming IO-540 ফুয়েল-ইনজেক্টেড ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। নির্মাতা এটিকে ব্যক্তিগত ব্যবহারসহ বিভিন্ন ধরনের কাজের উপযোগী করে তৈরি করেছে।
অন্যদিকে আরও বড় ও শক্তিশালী Robinson R66 সিরিজে রয়েছে টারবাইন ইঞ্জিন। ফলে ব্যক্তিগত হেলিকপ্টারের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট দাম বলা সম্ভব নয়। মডেল, কনফিগারেশন ও অতিরিক্ত সরঞ্জামের ওপর মোট দাম উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়।
আরও বড় শ্রেণির হেলিকপ্টারের দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত যেতে পারে। যেমন Robinson-এর নতুন R88 মডেলের ঘোষিত প্রারম্ভিক মূল্য প্রায় ৩৩ লাখ মার্কিন ডলার।
এক ঘণ্টায় কত জ্বালানি লাগে?
হেলিকপ্টারের জ্বালানি খরচ নিয়ে প্রচলিত ধারণা হলো, সব ব্যক্তিগত হেলিকপ্টারেই ঘণ্টায় শত শত লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হয়। বাস্তবে বিষয়টি মডেল ও ইঞ্জিনের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন।
ইঞ্জিনের ধরন, উড্ডয়নের ওজন, গতি, উচ্চতা, আবহাওয়া এবং ব্যবহারের ধরন—সবকিছুর ওপর জ্বালানি খরচ নির্ভর করে। ছোট পিস্টন-ইঞ্জিনের হেলিকপ্টার সাধারণত বড় টারবাইন হেলিকপ্টারের তুলনায় কম জ্বালানি ব্যবহার করে।
উদাহরণ হিসেবে Robinson R44-এর ক্ষেত্রে নির্মাতা জ্বালানি দক্ষতাকে এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। এর নকশাও গতি ও জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়টি মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে।
তাই নির্দিষ্ট কোনো মডেল না জেনে ‘প্রতি ঘণ্টায় ৮০০ লিটার’ বা ‘প্রতি কিলোমিটারে ৫ লিটার’—এমন একক হিসাব সব ব্যক্তিগত হেলিকপ্টারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
কেনার পরও রয়েছে বড় খরচ
হেলিকপ্টার কেনার পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ মালিকের অন্যতম বড় ব্যয়ের জায়গা। নির্ধারিত সময় পরপর ইঞ্জিন, রোটর, ট্রান্সমিশন, ফ্লাইট কন্ট্রোল, অ্যাভিওনিকস এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করতে হয়।
এর বাইরে রয়েছে পাইলটের বেতন ও প্রশিক্ষণ, বিমা, হ্যাঙ্গার বা নিরাপদ পার্কিংয়ের খরচ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ পরিবর্তন, ইঞ্জিন ও অন্যান্য বড় কম্পোনেন্টের ওভারহল, জ্বালানি এবং বিমান চলাচলসংক্রান্ত বিভিন্ন ফি ও প্রশাসনিক ব্যয়।
ফলে হেলিকপ্টারের প্রকৃত মালিকানা ব্যয় শুধু কেনার মূল্য দিয়ে হিসাব করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশে কী নিয়ম?
বাংলাদেশে ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (CAAB) বিধি ও অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় হেলিকপ্টার পরিচালনা, রাতের হেলিকপ্টার ফ্লাইট এবং অন্যান্য অপারেশনসংক্রান্ত নির্দেশনা ও নিয়ম মেনে চলতে হয়।
তাই বিদেশ থেকে হেলিকপ্টার কিনে বাংলাদেশে আনার ক্ষেত্রে শুধু বিক্রেতাকে মূল্য পরিশোধ করলেই হবে না। আমদানি, নিবন্ধন, বিমান চলাচলের অনুমোদন, নিরাপত্তা এবং পরিচালনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নিয়মও অনুসরণ করতে হবে।

হেলিকপ্টারের অন্যতম বড় সুবিধা হলো, এটি প্রচলিত উড়োজাহাজের মতো দীর্ঘ রানওয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। উপযুক্ত ও অনুমোদিত স্থানে তুলনামূলক সীমিত জায়গা থেকে উড্ডয়ন ও অবতরণ করা সম্ভব। ফলে দুর্গম এলাকায় যাতায়াত, জরুরি চিকিৎসাসেবা, পর্যটন, শিল্পকারখানা পরিদর্শন, সংবাদ সংগ্রহ, উদ্ধারকাজসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত কাজে হেলিকপ্টারের ব্যবহার রয়েছে।
ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার কেনার আগে প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে, এটি কী কাজে ব্যবহার করা হবে। দুই বা চার আসনের ছোট পিস্টন হেলিকপ্টার ব্যক্তিগত ও প্রশিক্ষণমূলক ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। আবার বেশি যাত্রী, দীর্ঘপথ কিংবা বিশেষ কাজে প্রয়োজন হতে পারে বড় টারবাইন হেলিকপ্টার।
এরপর ক্রয়মূল্যের পাশাপাশি বছরে কত ঘণ্টা উড্ডয়ন করা হবে, প্রতি ঘণ্টায় জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণে কত খরচ হবে, পাইলট ও হ্যাঙ্গারের ব্যয় কত এবং বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণের সময় সম্ভাব্য খরচ কত এসব হিসাব করাও জরুরি।
অর্থাৎ, ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার কেনার ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন শুধু ‘কত টাকা দিয়ে কিনব?’ নয়; বরং ‘কত টাকা খরচ করে নিয়মিত পরিচালনা করতে পারব?’—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আরটিভি/এসকে


