
সোহান এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর সাফল্যের শিখরে, আবার অনেকে আশানুরূপ ফল করতে না পারায় হতাশা জেঁকে বসেছে। এমন সময়ে, বন্ধুদের সাফল্যের উদযাপনে তুলনামূলক খারাপ ফল করা শিক্ষার্থীর মন খারাপ হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু এই মন খারাপের অনুভূতিকে প্রায়শই ‘হিংসা’ বলে ভাবা হয়।
অথচ ফল প্রকাশের দিনে চারদিকে আনন্দের বন্যা, তখন খারাপ ফলাফল করা একজন শিক্ষার্থী নিজের কষ্টের অনুভূতি প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করেন। অনেকে মন খারাপ লুকাতে হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করেন, আবার যারা প্রকাশ করেন, তাদের অনেক সময় ‘হিংসুটে’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
এ অবস্থা যে এই সময়ে তা কিন্তু নয়। অফিস কিংবা বাসা সব জায়গাতেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি আসলে হিংসা নয়।
জনপ্রিয় বলিউড চলচ্চিত্র ‘থ্রি ইউয়টস্’-এর একটি সংলাপ—‘বন্ধু ফেল করলে কষ্ট লাগে, কিন্তু বন্ধু ফার্স্ট হলে আরও বেশি কষ্ট লাগে’—এই সময়টিকে যেন আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলে। কেন হয় এমন?
মনোবিজ্ঞানী নুজহাত রহমান বলেন, যখন একজন শিক্ষার্থীর নিজের ফলাফল ভালো হয় না, তখন সে নিজেই মানসিক কষ্টে থাকে। এই সময় বন্ধুর ভালো ফলাফলে সে খুশি হবে—এমনটা আশা করা বেশি হয়ে যায়। কারণ সে নিজের মন খারাপের অনুভূতি নিয়ে মানসিকভাবে এলোমেলো থাকেন।
নিজের ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণে বন্ধুর আনন্দ দেখে নেতিবাচক অনুভূতি আসা বা খারাপ বোধ হওয়াটা তাই স্বাভাবিক মন খারাপের বহিঃপ্রকাশ। এই অনুভূতি কারো সাথে শেয়ার করা না গেলে একদিকে যেমন বন্ধুর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়, অন্যদিকে নিজেকে নিয়েও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
নুজহাত রহমান জানান, এটিকে হিংসা না বলে বরং ‘মন খারাপের বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে দেখা উচিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয় হীনম্মন্যতা, ভয় ও দুশ্চিন্তা। পরিবার বা আত্মীয়রা ভালো ফল করা বন্ধুর সঙ্গে তুলনা করবেন—এই ভয় কাজ করে। ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা ও নিজেকে অযোগ্য মনে করার প্রবণতাও তৈরি হয়।
দুঃখজনক ভাবে, এ পরিস্থিতিতে অনেক শিক্ষার্থীকেই পরিবার থেকে শুনতে হয়, ‘একই রকম সুযোগ-সুবিধা পেয়ে তোমার বন্ধু ভালো করলো, তুমি পারলে না কেন, কীসের অভাব তোমার?’
এই ধরনের তুলনা ছেলে-মেয়েদের আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে দেয়। তারা ভাবতে শুরু করে, বাবা-মায়ের ভালোবাসা তাদের পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে। নিজেকে মূল্যহীন ভাবার যাত্রা শুরু হয় এখান থেকেই। তাই এই সময়ে বন্ধুর জন্য খুশি হওয়ার চেয়ে বেশি জরুরি নিজেকে মানসিকভাবে সামলে নেওয়া।
মনোবিজ্ঞানী পরামর্শ দিয়েছেন, ভালো ফলাফল করা বন্ধুরা তাদের উদযাপনে মন খারাপ করে থাকা বন্ধুটিকে ডাকতে পারেন, তবে জোরাজুরি করা উচিত নয়। তাকে নিজের কষ্টের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে, বন্ধুটি যেন একেবারে একলা হয়ে না যায়।
এই ধাপে অভিভাবক ও পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখা দরকার, সন্তান আপনার প্রথম প্রায়োরিটি, রেজাল্ট দ্বিতীয় প্রায়োরিটি। প্রতি বছরই এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর অনেক শিক্ষার্থী ব্যর্থতার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। তাই অভিভাবকদের উদ্দেশে নুজহাত রহমান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—সন্তানকে জানিয়ে দিন, জীবনের চেয়ে পরীক্ষার রেজাল্ট বড় নয়। খারাপ সময়ে সন্তানের প্রয়োজন পরিবারের সমর্থন। সন্তানকে জানান যে, আপনার কাছে আপনার সন্তানের গুরুত্ব তার ফলাফলের চেয়ে অনেক বেশি।
আরটিভি/এএইচ




