
জীবনে এমন সময় আসে যখন আপনাকে একইসঙ্গে একাধিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই সিদ্ধান্তগুলো আপনার কর্মজীবন বা ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনিবার্য এবং এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু আপনি কি জানেন যে এটি আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে? হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়েছেন। সিদ্ধান্ত নিতে নিতে আপনার মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে। মনের এই অবস্থার জন্য একটি পরিভাষাও রয়েছে- একে বলা হয় ডিসিশন ফ্যাটিগ বা সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি।
ডিসিশন ফ্যাটিগ বা সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তির ৭টি লক্ষণ
ডিসিশন ফ্যাটিগ হলো সেই মানসিক অবসাদ যা সারাদিন ধরে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হলে তৈরি হতে পারে। ডিসিশন ফ্যাটিগের ৭টি সাধারণ লক্ষণ:
* সাধারণ সিদ্ধান্ত নিতেও হিমশিম খাওয়া।
* সিদ্ধান্ত নিতে অস্বাভাবিক বেশি সময় নেওয়া।
* সিদ্ধান্ত নেওয়া পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া।
* বিরক্ত বা অধৈর্য বোধ করা।
* বারবার নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা।
* শুধু সিদ্ধান্তটি শেষ করার জন্য সবচেয়ে সহজ বিকল্পটি বেছে নেওয়া।
* একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মানসিকভাবে ক্লান্ত বোধ করা।
এর মানে এই নয় যে আপনার মস্তিষ্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ‘শেষ হয়ে যাচ্ছে’, বরং বারবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে মনোযোগ ধরে রাখা এবং স্থির থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
ডিসিশন ফ্যাটিগ বা সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তির কিছু সম্ভাব্য কারণের মধ্যে রয়েছে:
* ব্যস্ত কর্মদিবস।
* অনেক বেশি দায়িত্ব।
* অবিরাম নোটিফিকেশন এবং তথ্য।
* ঘুমের অভাব।
* মানসিক চাপ।
* অনেক বেশি বিকল্প থাকা।
* পর্যাপ্ত বিরতি না নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া।
* প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিখুঁতভাবে নেওয়ার চেষ্টা করা।
* কাজ, মেসেজ, ইমেল এবং অন্যান্য কাজের মধ্যে নিয়মিত আসা-যাওয়া মানসিক চাপের অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি সম্পর্কে গবেষণা কী বলে
জার্নাল অফ হেলথ সাইকোলজিতে প্রকাশিত ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে, একজন গড় প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন হাজার হাজার সিদ্ধান্ত নেন, যা সহজ থেকে অত্যন্ত জটিল পর্যন্ত হতে পারে। যদিও কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ, কিন্তু ক্রমাগত বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে থাকলে আপনার মানসিক শক্তি নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে সৃষ্ট এই মানসিক ক্লান্তিকে গবেষকরা সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি (decision fatigue) বলে অভিহিত করেছেন। ভারী ব্যায়ামের পরেও আমাদের শারীরিক পেশী ক্লান্ত হয়ে পড়ে; একইভাবে, ক্রমাগত ব্যবহারের পর মস্তিষ্ক তার পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করার ক্ষমতা হারায়।
গবেষণায় বলা হয়েছে যে, যখন মানুষ সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তিতে ভোগে, তখন তারা বেশিরভাগ সময় হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে অথবা পুরোপুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। এমনটা ঘটে কারণ ধীরে ধীরে মনোযোগ এবং আত্ম-নিয়ন্ত্রণের জন্য মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ শক্তি মারাত্মকভাবে হ্রাস পেতে শুরু করে। গবেষকরা তুলে ধরেছেন কীভাবে এই অবস্থা স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রভাবিত করে, যারা সারাদিন রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। এতে আরও বলা হয়েছে যে, যখন চিকিৎসা পেশাজীবীরা সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তিতে ভোগেন, তখন তারা সর্বোত্তম পদ্ধতি অনুসরণ না করে দুর্বল চিকিৎসাগত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বা অনিরাপদ শর্টকাটের ওপর নির্ভর করতে পারেন।
গবেষণার ফলাফলে আরও বলা হয়েছে যে, দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীরাও প্রতিদিনের ক্রমাগত স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের চাপে অভিভূত হয়ে পড়তে পারেন, যা তাদের আত্ম-যত্নের অভাব ঘটাতে পারে। গবেষণার উপসংহারে বলা হয়েছে যে, সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি ভালোভাবে বোঝার জন্য আমাদের মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতা বোঝা অত্যন্ত জরুরি, যাতে আমরা জীবনে আরও নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারি।
কীভাবে মোকাবিলা করবেন
* দিনের যে সময়ে আপনি সবচেয়ে বেশি সজাগ বোধ করেন, সেই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার পরিকল্পনা করুন।
* খাবার বা পোশাকের মতো বারবার করা হয় এমন পছন্দের জন্য সহজ রুটিন তৈরি করুন।
* একটি সংক্ষিপ্ত দৈনিক করণীয় তালিকা রাখুন।
* অপ্রয়োজনীয় কাজগুলো সীমিত করুন।
* নিয়মিত বিরতি নিন।
* পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
* যখন আপনার মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন হয়, তখন আপনার ফোন দূরে রাখুন।
* এটা মেনে নিন যে কিছু সিদ্ধান্ত নিখুঁত না হয়ে শুধু যথেষ্ট ভালো হলেই চলে।
যদি মানসিক ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব বা সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা দীর্ঘস্থায়ী হয় বা আপনার কাজ, সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, তবে একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে এটি নিয়ে আলোচনা করা উচিত, কারণ মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, ঘুমের সমস্যা এবং অন্যান্য অবস্থাও একই ধরনের উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে।
আরটিভি/ এসকেডি

