ঢাকা শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

অতিরিক্ত গরম চা খেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছেন না তো?

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৪ পিএম
চা পান করুন পরিমিত, তবে অতিরিক্ত গরম অবস্থায় নয়। ছবি: সংগৃহীত

সকালের শুরুতে এক কাপ চা, বিকেলে ক্লান্তি দূর করতে আবারও চায়ের কাপে চুমুক—এমন অভ্যাস অনেকেরই। চা শুধু সতেজতাই আনে না, নিয়মিত চা পানের সঙ্গে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির সুস্থতার সম্পর্কও পাওয়া গেছে গবেষণায়। তবে চা পান করলেই যে উপকার মিলবে, তা নয়। চায়ের ঘনত্ব, পরিমাণ এবং তাপমাত্রার ওপরও নির্ভর করতে পারে এর প্রভাব। বিশেষ করে অতিরিক্ত গরম চা পান করলে বাড়তে পারে স্বাস্থ্যঝুঁকি।

চা পানের অভ্যাস ও হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘জার্নাল অব ইন্টারনাল মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনে লিখেছেন জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ও শিক্ষক লিয়ানা ওয়েন।

গবেষণায় চীনের ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী ৪ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তারা সপ্তাহে কত দিন চা পান করেন, কোন ধরনের চা পছন্দ করেন, চা কতটা কড়া করে তৈরি করেন এবং কী তাপমাত্রায় পান করেন—এসব বিষয়ে তথ্য নেওয়া হয়। প্রায় নয় বছর ধরে তাদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা। এ সময়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালিসংক্রান্ত ১৪ হাজার ৮০০টির বেশি রোগ শনাক্ত হয়। এর মধ্যে ছিল হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়া, মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং হাত-পায়ে রক্ত সরবরাহকারী ধমনির রোগ।

নিয়মিত চা পানে কমতে পারে হৃদরোগের ঝুঁকি

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে অন্তত তিন দিন চা পান করেন, তাদের রক্তনালিসংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ কম। বয়স, ধূমপান, শারীরিক পরিশ্রম, শরীরের ওজন এবং আগে থেকে থাকা রোগের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার পরও এ পার্থক্য দেখা গেছে।

তবে শুধু চা পান করলেই হৃদরোগের ঝুঁকি কমবে, এমন নয়। গবেষণায় ধূমপান না করা, নিয়মিত চা পান করা এবং শারীরিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি সবচেয়ে কম দেখা গেছে।

চায়ের ঘনত্বের সঙ্গেও হৃদরোগের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। মাঝারি মাত্রায় কড়া চা পানকারীদের মধ্যে ঝুঁকি কম দেখা যায়। আবার গ্রিন টির তুলনায় লিকার চা বা ব্ল্যাক টি পানকারীদের ক্ষেত্রে কয়েক ধরনের হৃদরোগের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক বেশি পাওয়া গেছে।

অতিরিক্ত গরম চা বাড়াতে পারে ঝুঁকি

গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্যগুলোর একটি হলো চায়ের তাপমাত্রা। যারা জিভ পুড়ে যাওয়ার মতো অতিরিক্ত গরম চা পান করেন, তাদের রক্তনালিসংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি নিয়মিত চা পান না করা ব্যক্তিদের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি দেখা গেছে।

অন্যদিকে, স্বাভাবিক বা সহনীয় গরম চা পানকারীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত চা পান না করা ব্যক্তিদের তুলনায় এ ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল।

তবে গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গবেষকেরা সরাসরি চায়ের তাপমাত্রা মাপেননি; অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করেছেন। ফলে একজনের কাছে যে চা অতিরিক্ত গরম মনে হয়, অন্যজনের কাছে তা স্বাভাবিক মনে হতে পারে। এ ছাড়া অতিরিক্ত গরম চা পানকারীদের খাদ্যাভ্যাস বা জীবনযাপনের অন্য কোনো বিষয়ও ঝুঁকিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

চা কীভাবে হৃদযন্ত্রের উপকার করে

চায়ের সম্ভাব্য উপকারের পেছনে রয়েছে এর প্রাকৃতিক উপাদান। চায়ে পলিফেনল নামের যৌগ থাকে, যার মধ্যে ফ্ল্যাভোনয়েডও রয়েছে। এসব উপাদানের প্রদাহরোধী ও জারণ প্রতিরোধী গুণ রয়েছে।

এগুলো রক্তনালির ভেতরের কোষকে সুরক্ষা দিতে এবং ধমনির প্রসারণক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। এর ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয় এবং হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ কমতে পারে।

বিভিন্ন গবেষণায় নিয়মিত চা পানের সঙ্গে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রার উন্নতির সম্পর্কও পাওয়া গেছে। এ কারণে চা পানকারীদের মধ্যে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়া ও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার হার তুলনামূলক কম দেখা যায়।

চিনি ছাড়া চা পান করলে বাড়তি সুবিধাও মিলতে পারে। ফলের রস, কোমল পানীয় বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে চা পান করলে শরীরে বাড়তি চিনি প্রবেশের পরিমাণ কমে। এতে ওজন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা হতে পারে।

লিকার চা, নাকি গ্রিন টি—কোনটি ভালো?

লিকার চা ও গ্রিন টি—দুটিই একই উদ্ভিদ থেকে তৈরি। তবে চা-পাতা প্রক্রিয়াজাত করার পদ্ধতি আলাদা হওয়ায় এ দুই ধরনের চায়ের উপাদানেও কিছু পার্থক্য থাকে।

আগের বিভিন্ন গবেষণায় দুই ধরনের চায়েরই স্বাস্থ্যগত উপকারের কথা উঠে এসেছে। নতুন গবেষণাতেও গ্রিন টির উপকারিতা দেখা গেছে। তবে লিকার চায়ের ক্ষেত্রে হৃদরোগের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক তুলনামূলক ধারাবাহিকভাবে পাওয়া গেছে।

তবে এ কারণে এক ধরনের চা বাদ দিয়ে অন্যটি পান করার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন চিকিৎসক লিয়ানা ওয়েন। তার মতে, চিনি ছাড়া পান করলে লিকার চা ও গ্রিন টি—দুটিই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।

দিনে কত কাপ চা পান করবেন?

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে প্রায় ছয় থেকে আট কাপ চা পান করেন, তাদের রক্তনালিসংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে কম ছিল। তবে এর চেয়ে বেশি চা পান করলে ঝুঁকি আবার বাড়তে শুরু করে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেকেরই দিনে ছয় থেকে আট কাপ চা পান করা উচিত। গবেষণায় চায়ের কাপের নির্দিষ্ট মাপ নির্ধারণ করা হয়নি। অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চা পানের পরিমাণ হিসাব করা হয়েছে। তাই এই পরিমাণকে সবার জন্য আদর্শ বলা যাবে না।

চা পানের ক্ষেত্রে ক্যাফেইনের পরিমাণও বিবেচনায় রাখা জরুরি। প্রায় ২৪০ মিলিলিটার লিকার চায়ে সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। গ্রিন টিতে এর পরিমাণ কিছুটা কম। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দিনে ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন গ্রহণ সাধারণত ক্ষতিকর নয়। তবে গর্ভবতী নারীদের দিনে ২০০ মিলিগ্রামের মধ্যে ক্যাফেইন গ্রহণ সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। শিশুদের ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পান করা উচিত নয়।

চা পানের সময় যে সতর্কতা জরুরি

চা পানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে তাপমাত্রাকে। মুখ বা গলা পুড়ে যাওয়ার মতো গরম চা পান করা উচিত নয়। কারণ, বারবার অতিরিক্ত গরম পানীয় পান করার সঙ্গে খাদ্যনালির ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তাই চা তৈরির পর কিছুটা ঠান্ডা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করুন। এমন তাপমাত্রায় চা পান করুন, যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চুমুক দেওয়া যায় এবং মুখ বা গলা পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকে।

যাদের ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ কিংবা বুক ধড়ফড় করার প্রবণতা রয়েছে, তাদের ক্যাফেইন গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। আর যারা চা পান করেন না, তাদের শুধু হৃদযন্ত্রের উপকারের আশায় নতুন করে চা পানের অভ্যাস শুরু করার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক লিয়ানা ওয়েন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে শুধু চায়ের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান থেকে দূরে থাকা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। চা পান করতে চাইলে তা যেন হয় পরিমিত ও সহনীয় তাপমাত্রায়।


আরটিভি/জেএমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
প্রতিদিনের ৫ অভ্যাসেই ক্ষতি হচ্ছে মেরুদণ্ডের!
দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করা, অবসর সময়ে সোফায় গা এলিয়ে মুঠোফোন দেখা কিংবা শারীরিক পরিশ্রম না করা—আধুনিক জীবনে এমন অভ্যাস অনেকেরই।
প্রতিদিনের ৫ অভ্যাসেই ক্ষতি হচ্ছে মেরুদণ্ডের!
হাড় মজবুত রাখতে জরুরি তিন পুষ্টি, খাদ্যতালিকায় রাখবেন যেসব খাবার
হাড়ের গঠন ও শক্তি বজায় রাখতে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও পর্যাপ্ত প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব পুষ্টির ঘাটতি হলে হাড় দুর্বল হয়ে যেতে পারে। বাড়তে পারে অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ক্ষয়জনিত রোগের ঝুঁকি।
হাড় মজবুত রাখতে জরুরি তিন পুষ্টি, খাদ্যতালিকায় রাখবেন যেসব খাবার
ওজন কমাতে মাখানা নাকি পপকর্ন, কোনটি বেশি উপকারী
ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন? নাশতায় মাখানা নাকি পপকর্ন কোনটি বেছে নেবেন, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়েন অনেকেই। দুটিই হতে পারে স্বাস্থ্যকর নাশতার বিকল্প।
ওজন কমাতে মাখানা নাকি পপকর্ন, কোনটি বেশি উপকারী
স্মৃতিশক্তি বাড়াতে ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট কি আসলেই কাজে আসে
স্মৃতিশক্তি ধরে রাখা ও আলঝেইমারের ঝুঁকি কমাতে অনেকেই ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন। তবে নতুন এক ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় দেখা গেছে, সাপ্লিমেন্ট গ্রহণে রক্ত ও মস্তিষ্কের তরলে ওমেগা-৩-এর মাত্রা বাড়লেও স্মৃতিশক্তি, চিন্তাশক্তি কিংবা মস্তিষ্কের স্মৃতিসংশ্লিষ্ট অংশের আকারে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
স্মৃতিশক্তি বাড়াতে ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট কি আসলেই কাজে আসে
নারী পাশে থাকলে কম ব্যথা পায় পুরুষ: গবেষণা
ব্যথা সবার জন্যই কষ্টকর।
নারী পাশে থাকলে কম ব্যথা পায় পুরুষ: গবেষণা
আরও পড়ুন
জলবায়ু পরিবর্তনে বছরে ৫ লাখের বেশি মৃত্যু, বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি
অবরুদ্ধ চুয়েট উপাচার্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
কাগজের ঠোঙা, পত্রিকার পাতায় খাবার খেয়ে বাড়ছে যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকি
সাবধান! ভেপ টেনে মৃত্যুকে কাছে ডাকছেন দ্রুত!