
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, সংস্থা ও জেলা পর্যায়ে বিদ্যমান সব কমিটি পুনর্গঠন ও হালনাগাদের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কমিটিগুলো থেকে আওয়ামীপন্থীদের সরিয়ে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে পুনর্গঠিত কমিটিগুলোতে তিনজন করে গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সদস্য হিসেবে রাখতে বলা হয়েছে, যাদের মধ্যে একজন হবেন নারী।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে গত ১৮ আগস্ট এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি জারি করা হয়েছে।
চিঠিতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, সংস্থা ও জেলা পর্যায়ে গঠিত বিদ্যমান সব কমিটি পুনর্গঠন ও হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে। এছাড়া, জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সভাপতিত্বে ৯৮টি কমিটি পুনর্গঠন করতে বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক আশরাফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকারের কার্যক্রম পরিচালনা ও বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কমিটি রয়েছে। অধিকাংশ কমিটি কয়েক বছর আগে গঠিত হয়েছে। আবার কিছু কিছু কমিটির প্রজ্ঞাপন ও কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে বিদ্যমান সব কমিটি পুনর্গঠন ও হালনাগাদ করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠি পাওয়ার পর অনেক জায়গায় ইতোমধ্যে সরকারি কমিটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই চিঠির ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সচিব ও দুজন জেলা প্রশাসক বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকারি কমিটিতে তাদের মনোভাবের ব্যক্তিদের রাখা হয়েছিল। ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর অনেকে আত্মগোপনে বা দেশের বাইরে চলে গেছেন। কমিটির সভায় তারা থাকতে পারছেন না। আবার কোথাও কোথাও কমিটির বৈঠতে তাদের ডাকা হলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরকারি সূত্রগুলোর ভাষ্য, এসব কারণে পুরোনো কমিটি বহাল রেখে সরকারি কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কাজেই নতুন বাস্তবতায় কমিটিগুলো পুনর্গঠন করে কার্যক্রম সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এসব কমিটিতে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যাদের মনোভাবের সঙ্গে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের মেলে না। তাদেরকেও এখন এসব কমিটি থেকে সরানো হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওই চিঠিতে আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। তাতে বিদ্যমান সব কমিটি পুনর্গঠন এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন জেলা প্রশাসক বলেন, দেশে যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, এসব কমিটিতে তাদের সমর্থকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটাই হয়ে আসছে। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন টানা ক্ষমতায় ছিল। তাই বিভিন্ন কমিটি অনেক দিন পুনর্গঠন করা হয়নি। আগের সরকারের প্রতিনিধিরাও রয়ে গেছেন। এখন সেসব কমিটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন করে গঠিত প্রতিটি কমিটিতে স্থানীয় পর্যায়ের তিনজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত একজন নারী থাকা বাধ্যতামূলক। সংশ্লিষ্ট কমিটির সভাপতি বা আহ্বায়ক এ তিনজনকে মনোনয়ন দেবেন। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব আরও কার্যকর করার কথাও চিঠিতে বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থার বিদ্যমান কমিটিগুলো পুনর্গঠনের সময় সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
আগের সরকারের আমলে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে সরকারি প্রতিনিধির বাইরেও পাঁচজন সদস্য রাখা হতো। তাদের মধ্যে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, একজন সাংবাদিক এবং বাকি তিনজন রাজনৈতিক ব্যক্তি। এবারও সমানসংখ্যক প্রতিনিধি রেখে কমিটি পুনর্গঠন করতে বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠির সঙ্গে সংযুক্ত তালিকায় ৯৮টি কমিটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কমিটির সভাপতি সংশ্লিষ্ট জেলার ডিসিরা। এসব কমিটিও পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি, জেলা কৃষি উন্নয়নবিষয়ক কোর কমিটি, জেলা কৃষি পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটি, ধান সংগ্রহ ও মনিটরিং কমিটি, ফলদ বৃক্ষরোপণ পক্ষ ও ফল প্রদর্শনী উদ্যাপন কমিটি, আম সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ–সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি হিসেবে আছেন ডিসিরা।
জেলা প্রশাসকেরা বীর মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি, ওএমএস ডিলার নিয়োগ-সংক্রান্ত জেলা কমিটির সভাপতি। জেলা যুব উন্নয়ন কমিটি, যুব সংগঠনকে অনুদান দেওয়ার আবেদন যাচাই-বাছাই কমিটি, ক্রীড়াবিদদের ভাতা প্রদান-সংক্রান্ত কমিটি এবং জাতীয় যুব পুরস্কার-সংক্রান্ত জেলা কমিটির সভাপতিও ডিসিরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসব কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন এসব কমিটি পুনর্গঠনে দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, এমন অনেক কমিটি আছে, দীর্ঘদিন সভা অনুষ্ঠিত হয় না। দ্বিতীয়ত, অনেক কমিটি আছে, যেখানে আওয়ামীপন্থীরা রয়ে গেছে। এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হচ্ছে।
আরটিভি/এসএইচএম



