
এলপিজির মূল্য ও সংশ্লিষ্ট চার্জ না বাড়িয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত মূল্যে ভোক্তাপর্যায়ে সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করার প্রত্যাশা জানিয়েছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সরকারি ও বেসরকারি এলপিজির মূল্যহার পরিবর্তনসংক্রান্ত গণশুনানির আগে কমিশনের কাছে এ দাবি জানানো হয়।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) এক লিখিত মতামতে বিইআরসির কাছে এ আহ্বান জানায় ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা এই সংগঠনটি।
ক্যাবের মতে, বিদ্যমান নির্ধারিত মূল্যই বাজারে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় নতুন করে মূল্য ও চার্জ বাড়ানো হলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে।
ক্যাবের লিখিত মতামতে বলা হয়, গত ৪ অক্টোবর ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অনেক ভোক্তাকে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার খরচ যুক্ত হলেও সিলিন্ডারের দাম ও পরিবহন খরচের পৃথক হিসাব স্পষ্ট করা হচ্ছে না।
সংগঠনটি বলছে, এ পরিস্থিতি নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নে দুর্বলতা এবং সরবরাহব্যবস্থায় জবাবদিহির ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। তাই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বিবেচনার আগে বাজারে বিদ্যমান মূল্য কার্যকর করা এবং অতিরিক্ত দাম আদায় বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ক্যাবের মতে, পাইপলাইনের গ্যাসসুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোর জন্য এলপিজি রান্নার অপরিহার্য জ্বালানি। খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের ব্যয় মেটানোর পর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে জ্বালানির অতিরিক্ত খরচ বহন করা কঠিন। ফলে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি হলে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে।
লিখিত মতামতে সরবরাহের ঘাটতির অজুহাতে সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রাখা, মজুত থাকা সত্ত্বেও সরবরাহ না করা এবং বাজারে পণ্য সরবরাহ সীমিত করে অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শুধু খুচরা বিক্রেতা নয়, সংশ্লিষ্ট অপারেটর ও পরিবেশকদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে জাহাজভাড়া, ডলারের বিনিময় হার ও অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি তুলে ধরার বিষয়টিও উল্লেখ করেছে ক্যাব। সংগঠনটির দাবি, এসব ব্যয় প্রকৃত লেনদেনের দলিল, নিরীক্ষিত হিসাব ও নিরপেক্ষ কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। একই ব্যয় একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত করা, অযৌক্তিক ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপানো কিংবা অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ রাখা যাবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি ব্যয় কমলে তার সুফলও যথাসময়ে ভোক্তাদের দিতে হবে।
এ ছাড়া মজুতকরণ, বোতলজাতকরণ, ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলার চার্জ নির্ধারণে প্রকৃত পরিচালন ব্যয়, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং বিক্রয়ের পরিমাণ বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে ক্যাব। সরকারি এলপিজির উৎপাদন বা ক্রয়ব্যয় ও বিতরণ ব্যয় পৃথকভাবে মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছ বরাদ্দ ও সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশও করেছে সংগঠনটি।
ক্যাবের সাত দফা সুপারিশে রয়েছে—এলপিজির মূল্য ও সংশ্লিষ্ট চার্জ বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন না করা, নির্ধারিত মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করা, কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া, চার্জ ও কমিশন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা যাচাই, আমদানি ও বিতরণ ব্যয়ের পৃথক হিসাব প্রকাশ, প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রে মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং রসিদ প্রদান নিশ্চিত করা।
পাশাপাশি অতিরিক্ত মূল্য আদায়, সিলিন্ডার না পাওয়া, কম ওজন ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণের সহজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
গণশুনানিতে আবেদনকারীদের প্রস্তাবের পাশাপাশি ভোক্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ক্যাব। চূড়ান্ত মূল্যহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোন ব্যয় গ্রহণ বা বর্জন করা হয়েছে এবং উত্থাপিত আপত্তিগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে, সে বিষয়ে কমিশনের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাও চেয়েছে সংগঠনটি।
ক্যাবের প্রত্যাশা, সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ ও ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে বিইআরসি এলপিজির মূল্য ও সংশ্লিষ্ট চার্জ বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন না করে নির্ধারিত মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
আরটিভি/ এসকেডি



