
সংবিধান মানলে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কোনো নির্বাচন হওয়ার কথা নয় বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। একইসঙ্গে ওই নির্বাচন না হলে সরকার গঠন হলো কীভাবে, সেই প্রশ্ন রেখে বিএনপি সরকারকে সংবিধানের নেশা থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
জামায়াত আমির বলেছেন, আমি বারবার বলি, সংবিধান মানলে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কোনো নির্বাচন হওয়ার কথা নয়। তাহলে ওই নির্বাচন না হলে আপনারা সরকার হলেন কীভাবে? আর আমরা বিরোধীদল হলাম কীভাবে? সংবিধানের এই নেশা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এই সংবিধান শুধু ফ্যাসিবাদের জন্মই দেয়নি, ফ্যাসিবাদকে স্থায়ী রূপ দিতে চেয়েছিল।
রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা তিনি।
বিএনপিকে উদ্দেশ করে ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, আমার প্রশ্ন, আপনারা এখন সংবিধান খুঁজছেন কেন? সংবিধান মেনে সাড়ে ১৫ বছর সরকারের সদয় অনুমতি নিয়ে কিছু মিটিং ও মিছিল করেছেন। কিন্তু ফ্যাসিবাদকে তাড়াতে পারেননি। আমরাও পারিনি, আপনারাও পারেননি। এটাই বাস্তবতা।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দের অনেকেই জেলে ছিলেন। একসঙ্গে অনেকের সঙ্গে ছিলাম। তখন আলোচনা হচ্ছিল, ২০৪১ সালের আগে শেখ হাসিনাকে বিদায় দেওয়া সম্ভব নয়। আমি বলেছিলাম, এতদিন অপেক্ষা করতে হবে না। এরপর তার উত্তরসূরিরা সেই পতাকা বহন করবেন। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। জেলে বসে বিএনপির বন্ধুদের মুখে এসব কথা শুনেছি। আমি বলেছিলাম, আল্লাহর ইচ্ছায় কি পরিবর্তন হতে পারে না? পরিবর্তনের জন্য অনেক চেষ্টাই তো করলাম, কাজে তো লাগল না।
জামায়াত আমির বলেন, নেতৃবৃন্দ ক্ষমতায় গিয়ে অতীতের সবকিছু ভুলে গেলেন। সংবিধান মেনেই তো আন্দোলন হয়েছে, মিছিল হয়েছে, মিটিং হয়েছে। অনুমতি নিয়ে এসব করতে হয়েছে। যদিও সরকার আমাদের কোনো অনুমতি দেয়নি, দিতে চায়নি। সাড়ে ১৫ বছরে মাত্র দুটি মিটিং করার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছিল। তাও কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের মিটিংয়ে আমরা জানিয়ে দিয়েছিলাম, অনুমতি না দিলেও মিটিং করব।
তিনি বলেন, যেসব জায়গায় পরিবর্তন দরকার, সেসব জায়গায় আপনারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রেখেছেন। আবার যেসব জায়গায় নোট অব ডিসেন্ট দেননি, সেগুলোও এখন এড়িয়ে চলছেন। জুলাই জাতীয় সনদের স্বাক্ষর দক্ষিণ প্লাজায় হলো কেন? গণভবনে হলো না কেন? অন্য কোনো জায়গায় হলো না কেন? এর মধ্য দিয়ে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছিল। এই সংসদে বসে জনগণের অধিকার খুন করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও যেন একই প্রক্রিয়া চালু না থাকে, সে জন্যই এই জায়গা নির্বাচন করা হয়েছিল। স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সতর্ক করা হয়েছিল।
ডা. শফিকুর রহমান এরপর বলেন, জনগণের অধিকারের দাবিতে আমরা মাঠে নেমেছি। আমরা কোনো দলীয় দাবি বা ১১-দলীয় জোটের কোনো দাবি নিয়ে মাঠে নামিনি। আমাদের প্রতিটি দাবি জনগণের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। গণভোটে ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। দেশের জনগণ জানিয়ে দিয়েছেন, তারা অতীতের গুনে ধরা, বস্তাপচা রাজনীতি আর দেখতে চান না। তারা পরিবর্তন ও সংস্কার চান।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে একটি সফল গণবিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান অনুষ্ঠিত হয়। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। সরকার কার্যক্রম শুরু করার পরপরই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর অংশীজন ছিলেন। সিভিল সোসাইটির সম্মানিত সদস্যরাও ছিলেন। দীর্ঘ সাত মাসের বেশি সময় ধরে দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিন-রাত আলোচনা করে বেশির ভাগ বিষয়ে একমত হয়ে অল্প কিছু বিষয় বাদে একটি সনদ তৈরি হয়।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার সবারই ছিল। এর ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর অংশীজনেরা স্বাক্ষর করেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তখন স্বাক্ষর করেনি। তবে পরবর্তী সময়ে এনসিপিও স্বাক্ষর করেছে।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে আপনারা শুনেছেন, একই দিনে দুটি ভোট হয়েছে। আমরা কিন্তু একই দিনে ভোট চাইনি। আমাদের স্পষ্ট দাবি ছিল, আগে গণভোট হবে, তারপর সংসদ নির্বাচন হবে। আমাদের আশঙ্কা ছিল, দুটি ভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হলে বিষয় দুটি গুলিয়ে ফেলা হবে। শেষ পর্যন্ত আমাদের আশঙ্কাই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। তারা মূল জায়গা থেকে চাতুর্যের আশ্রয় নিয়েছে।
জামায়াতের আমির বলেন, বিএনপির দাবি ছিল একই দিনে ভোট হোক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই অযৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে একই দিনে ভোটের ব্যবস্থা করল। তারা এটিকে অভিনন্দন জানাল। অন্তত একবার হলেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চাইলেন। আমরাও চেয়েছি। জনগণ জানে এবং বলে, বিএনপি আসলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়নি। তারা দেশে-বিদেশে তাদের লোকদেরকে নির্দেশনা দিয়েছিল ‘না’ ভোট দেওয়ার জন্য।
তিনি বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষার কাছে তারা মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছে। ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। দেশের জনগণ জানিয়ে দিয়েছেন, তারা অতীতের গুনে ধরা, বস্তাপচা রাজনীতি আর দেখতে চান না। তারা পরিবর্তন ও সংস্কার চান। আমাদের সন্তানেরা এ জন্য জীবনও দিয়েছেন। তারা বলেছিলেন, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। তারা বলেছিলেন, বৈষম্যের বাংলাদেশ আর দেখতে চান না। কিন্তু এখনো জাস্টিস প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বৈষম্য আরও বেড়ে চলেছে।
বিএনপির উদ্দেশে জামায়াত আমির আরও বলেন, জাতির সঙ্গে দেওয়া কথা তো রাখলেন না। এখন নানা কথা বলে বলছেন, সংবিধান সংশোধন কমিটি করেছেন। আসুন, এখানে কথা বলুন। নোট অব ডিসেন্ট থেকে কোনো সমঝোতা করতে হলে আমাদের সঙ্গে এই কমিটিতে বসতে হবে। আমি জানতে চাই, আপনারা ৭০ ভাগ জনগণের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করেছেন। আপনারা কি চান, বিরোধী দলও ধোঁকাবাজি করুক? আমরা এটা মেনে নেব না। জনগণের সঙ্গে দেওয়া ওয়াদার জায়গায় আমরা অটল। মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে বলতে পারি, গণভোট বাস্তবায়নে আপনারা বাধ্য থাকবেন।
তিনি বলেন, আইনজীবী, আইনপ্রণেতা ও সুশীল সমাজের ব্যক্তিরা বলেছেন, এর আগেও বহুবার সংবিধান সংশোধন হয়েছে। কিন্তু আদালতে গিয়ে সেগুলো পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। আমরা প্রক্রিয়ায় যেতেই চাই। আবার একটি সংশোধন করবেন, আরেকটি আদালত সেটিকে একেবারে ধুয়ে-মুছে দেবে। অতীতের ভুলের ধারায় চলতে আমরা অভ্যস্ত নই, রাজিও নই। এ জন্যই আমরা সংস্কার চাই।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের ভালোবাসা আমাদের সঙ্গে আছে। কারণ, আমরা জনগণের জন্য লড়াই করে চলছি। এই লড়াইয়ে ইনশাআল্লাহ আমরা বিজয়ী হব। জনগণের বিজয় হবে। কোনো দলের নয়, কোনো ব্যক্তির নয়, কোনো গোষ্ঠীর নয়, কোনো পরিবারের নয়। এই বিজয় হবে জনগণের বিজয়।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় লাঞ্চ করেন। ভাই, আরেকটু ভালো করে করেন এবং ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেশটাকে সুস্থভাবে চালান। আপনাকে তো জনগণ বলেনি যে ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে লাঞ্চ শেষ করতে হবে। আপনি যেটা উপযুক্ত মনে করেন, সেটাই খান। কোনো সমস্যা নেই। পছন্দ না হলে বাসার খাবার খান, তাতেও কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু জনগণকে দুমুঠো ভাত স্বস্তিতে খেতে দিন। শান্তিতে থাকতে দিন। আপনার লোকেরা মানুষের শান্তি কেড়ে নিয়েছে।
জামায়াত আমির বলেন, আগামী লংমার্চ ইনশাআল্লাহ ঢাকা থেকে শুরু হয়ে কুষ্টিয়ায় গিয়ে শেষ হবে। এই লংমার্চকে ঘিরে যেন কোনো ষড়যন্ত্র করা না হয়। যদি কোনো ষড়যন্ত্র করা হয়, তাহলে মনে রাখবেন, ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে লংমার্চের কাফেলা চট্টগ্রামে গিয়েছিল। সাইনবোর্ডে গিয়ে কেউ কেউ বসে পড়লেও আমরা অনড় ছিলাম যে এই কাফেলা চট্টগ্রাম যাবেই। সবকিছু মোকাবিলা করে সেদিন চট্টগ্রাম গিয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, আমরাও যেহেতু ন্যায়ের পথে আছি, আল্লাহর সাহায্য পাব, ইনশাআল্লাহ। সেই সাহায্য সঙ্গে নিয়ে জনগণের জন্য আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাব। কোনো বাধা আমাদের আটকাতে পারবে না। কোনো ষড়যন্ত্র আমরা মানব না, কোনো ষড়যন্ত্রের কাছে মাথা নত করব না।
আরটিভি/এসএইচএম


