
প্রায় ১২ কোটি ২৭ লাখ মানুষের দেশ। অথচ সেখানে প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় তিনজনেরই বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি। শুধু তাই নয়, বয়স ১০০ পেরিয়েও বেঁচে আছেন ১ লাখের বেশি মানুষ। শুনতে দীর্ঘায়ুর বড় সাফল্য মনে হলেও এর আড়ালেই তৈরি হচ্ছে নতুন সংকট। কারণ প্রবীণ মানুষের সংখ্যা শুধু বাড়ছেই, অথচ শিশুর জন্মহার কমতে কমতে নেমেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ফলে দিনদিন কমছে কর্মক্ষম মানুষ, বাড়ছে কর্মী সংকট।
আরো বাড়ছে প্রবীণদের পেনশন, চিকিৎসা ও পরিচর্যার খরচ। অর্থাৎ মানুষ বেশি দিন বাঁচছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের দেখভাল ও সেই ব্যয় বহন করার মতো তরুণ মানুষের সংখ্যা কম। আর দীর্ঘায়ুর এই সাফল্যই এখন জাপানের সামনে দাঁড় করিয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ।
জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশটিতে ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা প্রথমবারের মতো ১ লাখ ছাড়িয়েছে। আর টানা ৫৬ বছর ধরে বাড়ছে ১০০ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা। আবার তাদের প্রায় ৮৮ শতাংশই নারী।
কিন্তু জাপানিরা এত দীর্ঘায়ু পাচ্ছেন কীভাবে?
গবেষকদের মতে, এর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। মাছ, শাকসবজি ও তুলনামূলক কম চর্বিযুক্ত খাবার জাপানিদের খাদ্যাভ্যাসের বড় অংশ। হাঁটা, সাইকেল চালানো ও গণপরিবহন ব্যবহারের কারণে দৈনন্দিন জীবনেও শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকেন অনেকে। এর সঙ্গে উন্নত চিকিৎসাসেবা ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যবিমাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে দীর্ঘায়ুতে।
তবে সমস্যা অন্য জায়গায়। মানুষ দীর্ঘদিন বাঁচলেও সেই তুলনায় জন্মায়নি নতুন শিশু। ২০২৫ সালের হিসাবে, দেশটিতে প্রতি ১০০ নারীর বিপরীতে গড়ে জন্মেছে প্রায় ১১৪টি শিশু। অথচ জনসংখ্যা দীর্ঘমেয়াদে একই পর্যায়ে রাখতে প্রায় ২১০টি নতুন শিশুর প্রয়োজন ছিল। আর এই সংকট কতটা গভীর, তা বোঝা যায় আরেকটি হিসাবে। গেলো বছর জাপানে ৯৫ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষ ছিলেন ৮ লাখের বেশি। অথচ একই সময়ে নতুন শিশু জন্মেছে মাত্র ৭ লাখের মতো। অর্থাৎ ১ বছরে যত শিশু জন্মেছে, তার চেয়েও বেশি মানুষ পা রেখেছে ৯৫ বছরে।
কম জন্মহারের পেছনের কারণ
এদিকে কম জন্মহারের পেছনে জানা গেছে বেশ কিছু কারণ। তরুণদের মধ্যে বিয়ে কমে যাওয়া, দেরিতে বিয়ে, অনিশ্চিত চাকরি, স্থবির মজুরি ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টাকে এর জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। সন্তান লালন-পালনের খরচ ও কর্মজীবনের সঙ্গে পরিবার সামলানোর চাপও হয়ে উঠেছে বড় কারণ।
আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জাপানের অর্থনীতিতে। কর্মক্ষম মানুষ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন খাতে দেখা দিচ্ছে শ্রমিক সংকট। একই সঙ্গে কমছে আয়কর ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অবদান রাখা মানুষের সংখ্যা। অথচ প্রবীণ বাড়ায় পেনশন, চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যয় বাড়ছে। ফলে সেই বাড়তি চাপ গিয়ে পড়ছে তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর।
সামনে আরও কঠিন হতে পারে পরিস্থিতি। ২০০৮ সালে জাপানের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ। পূর্বাভাস বলছে, ২০৭০ সালে তা কমে নেমে আসতে পারে প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখে। তখন কমসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষকেই বহন করতে হবে বাড়তে থাকা পেনশন, চিকিৎসা ও বয়স্কদের পরিচর্যার ব্যয়। যা ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আরটিভি/এআর




