
১৪ জানুয়ারি, ফিফা বিশ্বকাপের অরিজিনাল ট্রফি আবার এসেছে ঢাকায়। এই খবর শুনলেই ২০২২ সালের সেই দিনগুলো মনে পড়ে যায়, যখন স্বপ্ন প্রথমবারের মতো খুব কাছ থেকে দেখা দিয়েছিল।
বাংলাদেশের সমর্থকদের কাছে ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি বরাবরই ছিল দূরের এক অনুভূতি। টেলিভিশনের পর্দা, হাইলাইটস আর বিদেশি শহরের আলোঝলমলে স্টেডিয়ামের মাঝেই তার অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ ছিল। ঢাকায় বসে আমরা ট্রফিটা দেখেছি চায়ের দোকানে, ছাদের ওপর থেকে, কিংবা গাদাগাদি বসার ঘরে যেখানে ছোটবেলায় একটি দল বেছে নিয়ে আজীবনের সমর্থক হয়ে ওঠা হয়। আমাদের কাছে ট্রফি কোনো বস্তু নয়, ছিল একটি ধারণা, একটি স্বপ্ন।
তাই ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের আগে যখন শোনা গেল কোকা-কোলার আয়োজনে ফিফা ট্রফি ট্যুর বাংলাদেশে আসছে, তখন শহরটি নীরব থাকলেও ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় কাঁপছিল। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগেই ঢাকার বিভিন্ন গলিতে ফুটবলের ছাপ পড়তে শুরু করে। পরিচিত দেয়ালগুলো হয়ে ওঠে ক্যানভাস; দৌড়াতে থাকা ফুটবলার, মাথার ওপর উঁচু করে ধরা ট্রফি। এগুলো বিজ্ঞাপন ছিল না; ছিল আসন্ন কিছুর সংকেত।
এই উত্তেজনা আরও গভীর ছিল স্মৃতির কারণে। ২০১৩ সালে ট্রফি প্রথমবার বাংলাদেশে এলেও সেটি ছিল সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত আয়োজন। অনেকেই গল্প শুনেছেন, কিন্তু অনুভব করতে পারেননি। তাই ২০২২ সালে আবার ট্রফি আসার খবর নতুন করে রোমাঞ্চ জাগায়। মনে হয়েছিল, এবার সময় এসেছে।
তারিখ এগোতেই অপেক্ষা বাড়ে। কোকা-কোলার বোতলের ঢাকনা স্ক্যান, কিউআর কোড পাঠানো, কনফার্মেশন মেসেজের জন্য পরীক্ষার ফলের মতো অপেক্ষা সবকিছুর মধ্যেই ছিল একটাই আকাঙ্ক্ষা: কাছ থেকে ট্রফিটাকে দেখা।
যেদিন ট্রফি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামে, সেই ছবি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার চেনা পটভূমিতে সোনালি ট্রফি- দেখে অবিশ্বাস্য লাগছিল। যে দেশ কখনো বিশ্বকাপে খেলেনি, সেই দেশের মাটিতে ট্রফির উপস্থিতি ছিল নীরব কিন্তু গভীর এক অন্তর্ভুক্তি র্যাডিসন ব্লুতে জনসাধারণের জন্য প্রদর্শনীতে দেখা গেল লম্বা লাইন, অদ্ভুত এক শান্ত ধৈর্য। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের জার্সির পাশে অফিস আইডি কার্ড, পাঞ্জাবি। অপরিচিত মানুষ অপরিচিত মানুষের ফোনে ছবি তুলে দিচ্ছে। দশ সেকেন্ডের একটি মুহূর্ত কিন্তু স্মৃতির জন্য আজীবন।
আর সবচেয়ে গভীরভাবে মনে গেঁথে আছে বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামের সেই রাত। ফুটবল আর সংগীত এক হয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টি, দেরি, সন্দেহ সবকিছু ছাপিয়ে হাজারো মানুষ একসঙ্গে গাইছিল। অর্ণব, তাহসান, নেমেসিস, ওয়ারফেজ, নগর বাউল, লালন, মমতাজ সবার কণ্ঠে স্টেডিয়াম হয়ে উঠেছিল এক বিশাল আবেগের জায়গা। ফ্রান্সের ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ক্রিশ্চিয়ান কারেম্বু যখন ট্রফি উঁচু করে ধরেন, মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে গ্যালারি।
কয়েক ঘণ্টার জন্য দেয়ালের গ্রাফিতি, লাইনে দাঁড়ানো মানুষ, সংগীত সবকিছু মিলেছিল এক জায়গায়। তারপর ট্রফি যেমন এসেছিল, তেমনই চলে যায়। ব্যানার নামানো হয়, শহর ফিরে যায় দৈনন্দিনতায়। কিন্তু স্মৃতিটা থেকে যায় ছবিতে, গল্পে, অনুভূতিতে।
এখন আবার ট্রফি ঢাকায় এসেছে, সেই স্মৃতিগুলো নতুন করে ফিরে আসে। ঘটনাপঞ্জি হিসেবে নয়, বরং এক অনুভূতি হিসেবে যখন ঢাকাই ইতিহাসের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
আরটিভি/এসকে


